সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল      ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      ব্যাংককের বারে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৭ জন      একদিনের সফরে বরিশালের পথে প্রধানমন্ত্রী      রাজধানীতে জলাবদ্ধতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মানুষ চলে যায়, স্পর্শ থেকে যায়
ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:১৭ এএম

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘটনা নয়, ইতিহাসের কোনো অধ্যায়েও লেখা থাকে না—তবু সেগুলো স্মৃতির গোপন কুঠুরিতে স্থায়ী আসন গড়ে নেয়। জীবনের ব্যস্ততা, সময়ের স্রোত কিংবা অভিজ্ঞতার ভার কিছুই সেগুলোকে মুছে দিতে পারে না। বরং বছর যত গড়ায়, স্মৃতিগুলো ততই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, দূরের কোনো আলো যেন হঠাৎ কুয়াশা ভেদ করে হৃদয়ের দরজায় এসে কড়া নাড়ে। তখন আমরা বুঝতে পারি, মানুষের জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিষয়টি হয়তো স্মৃতিই। 

আমার ছাত্রজীবনের এমনই এক দুপুর আজও জীবন্ত, আজও আলো ছড়ায়। সেদিন আমার জন্য কোনো বিশেষ আয়োজন ছিল না, কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আমার জন্য নির্ধারিত ছিল না। আমি ছিলাম শুধু এক কিশোর, এক বিশাল জনসমাবেশের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা। রাজনীতির গভীরতা তখনো আমার অজানা, নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও আমি ছিলাম অনিশ্চিত। অথচ জীবন নিঃশব্দে আমার সামনে এনে রেখেছিল একটি ক্ষুদ্র মুহূর্ত—যা পরবর্তীকালে আমার স্মৃতির প্রদীপ হয়ে জ্বলবে। 

৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের সংবাদ শুনে, সেই বহুদিন চাপা পড়ে থাকা মুহূর্তটি নতুন আলোয় ফিরে আসে। এক সময় যা ছিল সাধারণ, আজ তা অদ্ভুত এক নীরব বেদনায় ভরে ওঠে। উপলব্ধি করিয়ে দেয় মানুষের জীবন কত ক্ষণস্থায়ী, আর স্মৃতি কত দীর্ঘজীবী। আমরা চলে যাই, আমাদের পদচিহ্ন মুছে যায়; কিন্তু একটুখানি স্পর্শ, সামান্য সৌজন্য, মানবিক উষ্ণতার একটি ক্ষুদ্র টুকরো, সময় নামের দীর্ঘ নদীতে ভেসে থাকে বহুদিন। 

ছাত্রজীবনের সেই দুপুর আজ আবার দাঁড়িয়ে যায় চোখের সামনে, আর তার চলে যাওয়া সেই স্মৃতিকে রাঙিয়ে দেয় আরও গভীর বিষাদে যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে : মুহূর্ত ছোট হতে পারে, কিন্তু অনুভূতি কখনোই ছোট নয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে ঘিরে সময়টা ছিল পরিবর্তনের অস্থির প্রভাত। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ একটি স্বৈরশাসনের পতন দেখেছে। সর্বত্র অপেক্ষা নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের, দীর্ঘ রাতের পর আলোর। গ্রাম থেকে শহর, চায়ের দোকান, বাজারের মোড়, কলেজের বারান্দা, একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল : এবার কি সত্যিই পরিবর্তন আসবে? 

লফামারীর বড় মাঠও সেই জাতীয় স্পন্দনে মুখর ছিল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সেখানে আয়োজন করেছিল জনসভা, প্রধান বক্তা বেগম খালেদা জিয়া। সে সময় তিনি ছিলেন সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের মুখ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক, মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। মাঠের এক পাশে মঞ্চ, তার সামনে সারি সারি করে বসানো হয়েছিল নীলফামারী সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। আমরা ছিলাম সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ অংশ—তবু আনুষ্ঠানিকতার ভারে নয়, উত্তেজনায় আমাদের বুক ধুকধুক করছিল। আমি বসেছিলাম একেবারে সামনের সারিতে এক কৌতূহলী, বিস্ময়ভরা চোখের কিশোর, যার পৃথিবী তখনো অনেকটাই অজানা। 

রাজনৈতিক তত্ত্ব বা মতাদর্শ আমি বুঝতাম না, কিন্তু এটুকু বুঝতাম একজন জাতীয় নেতাকে এত কাছ থেকে দেখা জীবনের একটি মুহূর্ত হয়ে থাকতে পারে। তিনি মঞ্চে উঠলেন—বেগম খালেদা জিয়া। মুহূর্তের মধ্যে যেন মাঠ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার উপস্থিতি ছিল শান্ত অথচ দৃঢ়। তিনি সামনের সারিতে বসা ছাত্রদের দিকে তাকালেন—আমাদের দিকে। তারপর কোনো রাজনৈতিক আড়ম্বর ছাড়াই, নিছক মানুষের উষ্ণতায় এক পা এগিয়ে এলেন। হাত বাড়িয়ে দিলেন ছাত্রদের দিকে। সেই অতি সাধারণ ভঙ্গির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক মানবিক আন্তরিকতা। আমি তার হাত ধরেছিলাম মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য। ক্ষণিকের সেই স্পর্শ—তবু তাতে ছিল এক নিঃশব্দ অনুরণন, যেন সময়ের বুকে আঁকা এক সূক্ষ দাগ, যা বহু বছর পর ফিরে এসে মনে করিয়ে দেবে বৃহৎ ঘটনাই নয়, বরং ছোট ছোট মানবিক মুহূর্তই কখনো কখনো ইতিহাসের সবচেয়ে সত্য রূপ। নিছকই এক কাকতালের বেশি কিছু নয়। কিন্তু সেই কাকতালীয় মুহূর্তটি আমার ভেতরে গভীরভাবে খোদাই হয়ে গেছে। 

পরে বুঝেছি, আমাদের গড়ে তোলে বড় ঘটনাগুলো নয়; বরং ক্ষণিকের মানবিক স্পর্শই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। অসংখ্য ছাত্রের ভিড়ে সেই এক সেকেন্ডের হাত মিলন হয়তো তার কাছে তেমন কিছুই ছিল না। কিন্তু আমার কাছে তা হয়ে উঠেছিল স্মৃতির প্রতীক। সেখানে কোনো রাজনীতি ছিল না, কোনো ঐতিহাসিক গুরুত্বও নং ছিল শুধু একজন মানুষের উষ্ণতা, যিনি মুহূর্তের জন্য একজন কিশোরের সামনে মানুষ হিসেবেই দাঁড়িয়েছিলেন। সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তটি আমার যৌবনের ডায়েরির সবচেয়ে উজ্জ্বল পাতাগুলোর একটি হয়ে রইল। সময় বয়ে গেছে। সেই নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলো, বেগম খালেদা জিয়া হলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। আর আমরা যারা একদিন তার হাত ধরেছিলাম, নিজ নিজ জীবনের স্রোতে ভেসে গেলাম। তিনি ক্ষমতার শীর্ষে উঠলেন, আবার রাজনীতির নির্মম ঢেউয়ে নেমেও গেলেন। সময় প্রতিটি ভাগ্যকেই নতুনভাবে গড়ে তোলে আমাদেরও, তারও। কিন্তু আজ, তার প্রস্থানের পর, সেই হাত মিলনের স্মৃতি বারবার ফিরে আসে। মনে করিয়ে দেয় জীবন কত দ্রুত ফুরিয়ে যায়; ক্ষমতা, পদ, মর্যাদা—সবই সময়ের কাছে তুচ্ছ। টিকে থাকে শুধু স্মৃতি নীরবে জ্বলতে থাকা।

জীবন আশ্চর্যরকম ছোট। এই পৃথিবীতে কাটানো অল্প কয়েকটি দিন আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষা, লড়াই, অহঙ্কার ও রাগের তুলনায় কতই না সামান্য। শেষ পর্যন্ত আমরা বুঝি সব বিভাজন, সংঘাত, অবিচার, নীরব ক্ষোভই অস্থায়ী। আমরা চলে যাই, কিন্তু যে মানবিকতা আমরা ছড়িয়ে দিই, যে মুহূর্তে অন্যের জীবনে স্পর্শ রাখি সেগুলো থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। হয়তো মানবতার আসল শক্তি লুকিয়ে আছে কারও হাত ধরার ক্ষমতায়, বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে উষ্ণতা দেওয়ার সাহসে। একটুখানি সহমর্মিতা পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। কিন্তু আমরা প্রায়ই সে সুযোগ হারাই অহং, ব্যস্ততা আর মতাদর্শের ভারে চাপা পড়ে আমাদের সবচেয়ে মৌলিক পরিচয় : মানুষ হওয়া। 

বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সেই এক সেকেন্ডের হাত মিলন ছিল তেমনই এক মানবিক মুহূর্ত। কোনো রাজনৈতিক ভার নেই, কোনো ইতিহাসের দাবি নেই—শুধু একজন মানুষের উষ্ণতা, এক কিশোরের জীবনে সৌজন্যের ক্ষুদ্র স্পর্শ। কী আশ্চর্য, এত ছোট একটি মুহূর্ত সময় আর মৃত্যুর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও বেঁচে আছে। মনে হয়, সেই ক্ষণিক স্পর্শ আমার ভেতরে এক কোমলতার বীজ বপন করেছিল, যা আজও জীবিত। তার প্রস্থানের পর স্মৃতিটি আরও গভীর হয়ে ফিরে আসে। তখন মনে হয় জীবন আসলে স্মৃতিরই আরেক নাম। ক্ষমতা মুছে যায়, উপাধি হারিয়ে যায়, কিন্তু মানুষ আমাদের জীবনে কীভাবে স্পর্শ রেখে যায়—সেটাই থেকে যায়।

লেখক : আইনজীবী ও গবেষক

কেকে/এজে


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close