রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু      রাষ্ট্রপতির শপথ-দায়িত্বভার গ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি      নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা      রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ মির্জা ফখরুলের      প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রী হলেন রশিদুজ্জামান মিল্লাত      কে কোন দায়িত্ব পাচ্ছেন শপথ নেওয়া ছয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী ফাতেমার সংগ্রাম ও অটল নিষ্ঠা
ওমর ফারুক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:১৯ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ফাতেমা বেগমের জন্ম ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। রফিকুল ইসলাম ও মালেকা বেগম দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। কৈশোর পেরোতেই সংসারের নানা দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। একই ইউনিয়নের কৃষক মো. হারুন লাহাড়ির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মেঘনা নদীর চরে কৃষিকাজনির্ভর জীবনে পা রাখেন তিনি। তাদের ঘরে জন্ম নেয় দুই সন্তান- মেয়ে জাকিয়া ইসলাম রিয়া এবং ছেলে মোহাম্মদ রিফাত। ২০০৮ সালে, ছেলের বয়স মাত্র দুবছর থাকা অবস্থায়, স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় তার জীবন একেবারে ভিন্ন মোড় নেয়। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই শিশুসন্তান সঙ্গে নিয়ে তিনি ফিরে যান বাবা-মায়ের আশ্রয়ে। তবে মুদি দোকানি বাবার সীমিত আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়লে, সন্তানদের গ্রামেই রেখে কাজের সন্ধানে তাকে ঢাকায় যেতে হয়। সময় তখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০০৯ সাল। ঢাকায় পা রাখলেন সেই ফাতেমা বেগম। কে জানত সেই ফাতেমা হয়ে উঠবেন একদিন বাংলাদেশের ইতিহাসের রাজনীতির মহাকাব্য আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী? কে ভেবেছিল সেই ফাতেমা নিশ্বাসের মতোও লেগে থাকবেন বেগম জিয়ার সঙ্গে? কে বলতে পারত সেই ফাতেমা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত তার সেবায় মগ্ন থাকবেন? হ্যাঁ, দুই সন্তানের মা, স্বামী হারানো নারী, ভোলার সাধারণ পরিবার থেকে ঢাকায় আসা সেই ফাতেমা কাজ পেয়েছিলেন বেগম জিয়ার গৃহকর্মী হিসেবে। তখন তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী। সেই থেকে কতকাল, কত চড়াই-উতরাই পার হয়েছে কিন্তু ফাতেমা রয়ে গেছে। কত সর্বোচ্চ তাপমাত্রার মরুভূমির ন্যায়‘লাথ ডিজার্ট’-এর মতোও কাল-মাত্রা অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু ফাতেমা থেকে গেছে বেগম জিয়ার পাশে। তিনি শুধু একজন গৃহকর্মী নয় বরং বেগম জিয়ার রক্তের বন্ধন হিসেবে তার পাশে ছিলেন। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এবং যুগের পরও তিনি রয়েছিলেন বেগম জিয়ার সঙ্গে। তিনি শুধুই সাহায্যকারী নয় বরং খালেদা জিয়ার প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যেন ছায়া হয়ে গেছেন। ২০১৪ সালের একপাক্ষিক নির্বাচন। বিএনপির ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি চলছিল। গুলশানের বাসার সামনে প্রশাসন বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করেন ও কর্মসূচিরতে বাধা দেন। পল্টনে জনসভায় যাওয়ার জন্য খালেদা জিয়া বাসা থেকে বের হতে চাইলেও পুলিশ থামিয়ে দিচ্ছিল। চারদিকে নেতাকর্মীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে সব। কিন্তু জানেন আপনি? সে সময় ফাতেমা বেগম ছিলেন খালেদা জিয়ার পাশে। ধাক্কাধাক্কির মধ্যেও তার একমাত্র লক্ষ্য- খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা। কোনো আঁচড় লাগতে দিচ্ছেন না, নিজের শরীরকে বিপদের মধ্যে রেখেও। নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে নজর দিয়ে রাখছেন তার মালিক খালেদা জিয়ার দিকে।

এরপর শুরু হলো ২০১৮ সালে কারাবাসের দিন। খালেদা জিয়া জেলে থাকলেও ফাতেমা ছিল তার সঙ্গে। চার দেওয়াল, সীমাবদ্ধতা- সবকিছুকে তিনি নীরবভাবে সহ্য করেছিলেন। আপনি দুনিয়ার ইতিহাসে এমন ঐতিহাসিক চরিত্র দেখছেন, শুনছেন, ও খোঁজে পেয়েছেন? একজন গৃহকর্মী তার মালিকের সঙ্গে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছেন শুধু মালিকের সেবা করবে বলে। আহ্! ফাতেমা এসব কেমনে ভুলবে? কীভাবে এ স্মৃতিগুলো ভুলে বেগম জিয়াকে ভুলে থাকবে? আমার লিখতেই হাত কাঁপছে। এই ফাতেমা ভেতর থেকে মরে গেছে এতক্ষণে বেগম জিয়াকে হারিয়ে। হয়তো রাতের তিমির পার করবে চোখের পানি বিসর্জনে নয়তো নিদ্রা আসবে না অক্ষিকোটরে। ২০২১ সালে করোনা মহামারির সময় যখন খালেদা জিয়া আক্রান্ত হন, ফাতেমা তাকে ছেড়ে যাননি। টানা ৫৩দিন হাসপাতালে ভয়-ডরহীন পাশে থেকেছেন। প্রতিটি মুহূর্তে ছিলেন হাসপাতালে, পাশে, এক অদম্য ছায়ার মতো। মানে আপনারা বুঝতেছেন? যেখানে বউ স্বামী থেকে, ছেলে মা থেকে, ভাইবোন থেকে একে অপরের থেকে ছুটে চলে যাচ্ছে সেই কঠিন মুহূর্তে নিজের জীবনের কথা ভুলে গিয়ে খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন। পুরো পৃথিবী যখন নিস্তব্ধ, ভয়ংকর, হাহাকার ও করুণ নিষ্ঠোর পৃথিবীতে পরিণত হলো করোনা ভাইরাসে তখন ফাতেমা ছিলেন অসুস্থ খালেদা জিয়ার পাশে। সব কাজ করে যাচ্ছেন খালেদা জিয়াকে ধরে ধরে। মায়ের মতোও সেবা করে গিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়াকে। হয়তো ছোট বাচ্চার মতোন স্নেহ করেছেন বেগম জিয়াকে। একেবারে নিজের বাচ্চার মতো করে যত্ন করে গিয়েছেন সমস্ত সিচুয়েশনে। ২০২৫ সালের নভেম্বর- খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে লন্ডনের চিকিৎসার জন্য যাত্রা করলেন। ফাতেমা তার সঙ্গে ছিলেন, চার দেওয়ালের বাইরে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে। আন্দোলনে রাস্তায়, লোহার শিকে অবরুদ্ধ কারাগারে, করোনা মহামারিতে হাসপাতালেসহ ওই-ই দূর ভিনদেশে যাওয়ার সময়ও আঠার মতো লেগে ছিলেন ফাতেমা। কথা এমন, বেগম খালেদা জিয়া যেখানে ফাতেমা সেখানে। ফাতেমাকে কারাগারে যখন চেয়েছিল বেগম জিয়া তখন শেখ হাসিনা মক-ট্রল করছিলেন। ‘ওনার নাকি কারাগারেও গৃহকর্মী লাগবে’ বহুত কটু কথা বলছিলেন আরও বেগম জিয়াকে নিয়ে। ফাতেমা ঢাকার রাজপথ থেকে একেবারে লন্ডনের হাসপাতাল পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়ে রয়েছিলেন বেগম জিয়ার পাশে। খালেদা জিয়া চলে গেছেন। তারেক রহমান তার মা হারালেন, বিএনপি হারাল একজন অকল্পনীয় নেতা, দেশের মানুষ হারাল প্রেরণার উৎস ও আপসহীন নেতাকে। জাতি শোকাহত ও ফিনফিনে ব্যথা নিয়ে সময় পার করছে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে। সব স্তরের মানুষ ক্লান্ত হয়ে চোখের জল মুছতেছে বেগম জিয়ার জন্য। আপনি কী চিন্তা করছেন সেই ফাতেমার কী অবস্থা এখন? যিনি বেগম জিয়ার শিরার সঙ্গে বাস করতেন, হৃদয়ের গভীরে থাকতেন, হাত ধরে ধরে পড়ে থাকতেন, এ টু জেড সব ঠিক করে রাখতেন, ভাবছেন কী আপনি ফাতেমার কথা? তার সময় কেমন কাটছে বেগম জিয়াকে ছাড়া? তার বুকে কি পাহাড় সমান ওজন ভার করে নাই? সাগর পরিমাণ পানি ঝরে  নাই চোখ থেকে? ফাতেমা বেগম নিঃসঙ্গ, তার হারানোর বেদনা ব্যক্তিগত। কিন্তু তার ত্যাগ, ধৈর্য ও ভালোবাসা- সবাইকে শিক্ষা দেয়। ইতিহাস হয়তো তাকে নাম ধরে মনে রাখবে না, কিন্তু তার গল্প চিরকাল মানুষের মনে রয়ে যাবে। ফাতেমা রয়ে যাবেন কোটি কোটি বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে। ফাতেমা থাকবেন এক বিশাল উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ইতিহাসে। ফাতেমার মতো গৃহকর্মী কারও কপালে আসবে না এমনকি বেগম খালেদা জিয়ার মতো মালিকও কারও ললাটে ফুটবে না। ফাতেমা আমাদের মতো কোটি মনে ও হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন একজন অবিসংবাদিত নেত্রীর সেবা করে। ফাতেমাকে আমরা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলব না। ফাতেমার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বেগম জিয়ার ছায়াসঙ্গী ও শিরায় মিশে থাকা পরিচারিকা হিসেবে। ফাতেমা উপন্যাসের সেই চরিত্র যাকে ভুলে যাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  খালেদা জিয়া   ছায়াসঙ্গী ফাতেমা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close