মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ভোটের রাজনীতিতে ইসলামী জোট
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:২৪ এএম
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধ হচ্ছে।  তাদের অন্যতম জোট হচ্ছে ইসলামী দলের জোটটি। জোটবদ্ধ দলগুলোর আদর্শকে পৃথকভাবে দেখলে দেখা যায় যে, জোটের মধ্যকার একটি ককটেল আদর্শিক জোট তৈরি হচ্ছে। এই বহু আদর্শিক মিশ্রণে জোটের ভেতরে ঘটতে পারে বিস্ফোরণ যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করবে। আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, নবগঠিত জোটটিতে পারস্পারিক বিপরীত আদর্শের নেতাদের সংমিশ্রণ ঘটছে। এসব প্রেক্ষিতে বলা যায়, ফ্যাসিস্টদের পতনের পর যে, গণতেন্ত্রর আশা করা হয়েছিল, তা সফল না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এই রাজনৈতিক মিশ্রণে মহান মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার প্রতিফলন ব্যাহত হবে। সমমনা বারো দল নিয়ে গঠিত হয়েছে ইসলামী রাজনৈতিক জোট। জোটটি সমমনার সমঝোতা হলো তবে এটি আবার  ইসলামপন্থি জোট বা ওয়ানবক্স পলিটিক্স ইত্যাদি নামেও পরিচিত। জোটটি জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, নির্বাচনের পূর্বে গণভোট, সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ বাস্তবায়ন ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিসহ পাঁচ দফা দাবি নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এর নেতৃত্ব দিচ্ছে। জামায়াত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে ইসলামি শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন এই দলের উদ্দেশ্য। দলটি ইকামতে দ্বীন (ইসলাম প্রতিষ্ঠা) নামক মতাদর্শকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। বাংলাদেশের জামায়াত পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী এবং মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড ( ইখওয়ানুল মুসলিমিন)-এর আদর্শ ধারণ করে।

এই জোটের অন্য দলগুলোর মধ্যে একটি হলো, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এটি  ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন, আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী যুব শিবির, ভাসানীর ন্যাপের একাংশের নেতা, তমদ্দুন মজলিসের সংগঠক ভাষাসৈনিক মাসউদ খানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠত হয়। এই দলটির মধ্যকার আদর্শিক মিশ্রণটাও ভজঘট। এই জোটের একটি  দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এর  আগের নাম ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন।  বাংলাদেশের একটি ডানপন্থি রাজনৈতিক দল। চরমোনাই পীর ঐতিহ্যগতভাবে দলের আমির বা প্রধান নেতা হন। দলের প্রতিষ্ঠাতা চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিমের শিকড় দারুল উলুম দেওবন্দে বিশেষত দেওবন্দের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি। দেওবন্দমুখী কওমি মাদ্রাসা ও উলামাদের পাশাপাশি সারাদেশে বিপুলসংখ্যক মুরিদ ও পীরের অনুসারী দলটির সমর্থন-ভিত্তি গঠন করে। দলের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দাওয়াহ, সংগঠন, জ্ঞান আহরণ এবং প্রশিক্ষণ, জনগণের ঐক্য, মানবতার সেবা, সামাজিক ও শিক্ষার সংস্কার ও অর্থনৈতিক মুক্তি, ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি নীতির ভিত্তিতে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণআন্দোলন পরিচালনা। খেলাফত মজলিস চায় বাংলাদেশে ইসলামের আলোকে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। এজন্য ৭ দফা মৌল কর্মসূচি ও ২৫ দফা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে দলটি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের বাবরী মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদ ও মসজিদটি পুনর্নির্মাণের দাবিতে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চ, ১৯৯৪ সালের নাস্তিক-মুরতাদ তাসলিমা নাসরিন বিরোধী আন্দোলন করেছে তারা। তাদের মতে  ১৯৯৯ সালে শান্তিচুক্তির নামে সন্ত্রাসীদের হাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে, তাই তারা করেছে শান্তি চুক্তির প্রতিবাদে লংমার্চসহ বিভিন্ন আন্দোলন।

আরেকটি দল হলো, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন হলো বাংলাদেশের একটি নিবন্ধিত ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল। দলটির প্রতিষ্ঠা করেন মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী। এই দলের প্রতিষ্ঠা নেতা  স্বৈরাচার এরশাদের পাতানো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন হলো ইসলামপিন্থ রাজনৈতিক দল। আরেকটি হলো জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি বা জাগপা, ১৯৮০ সালে শফিউল আলম প্রধান দলটির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি দায়িত্ব পালন করেন  ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসাবে।  জোটের আরেকটি দল বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি (যার  আগে নাম ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি)। এটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম ইসলামী রাজনৈতিক দল। এই দলটির পাক আমলে লক্ষ্য ছিল, পাকিস্তানকে যে  কোনো মূল্যে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণ০ত করা। বর্তমানেও তারা বাংলাদেশে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্থির করে আছে। তা ছাড়া  জামায়াতে ইসলামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি নামে দলটি গঠন করে। জামায়াতের একটি কৌশল হিসেবে এই দলটি গঠন করা হয়েছে বলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দাবি করেন। বাংলাদেশ লেবার পার্টি (সংক্ষেপে লেবার পার্টি) বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। দলটি ১৯৭৪ সালের ১৭ আগস্ট মাওলানা মতিনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। দলটির ভাবাদর্শ হলো, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, ওমর-ই-সাম্যবাদ।

জোটের অন্যতম আরেকটি দল হলো, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপি। ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারার সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অলি আহমেদ ও বিএনপির অন্য ২৪ জন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য একত্রিত হয়ে এই দল প্রতিষ্ঠা করেন। তবে ২০০৭ সালে আদর্শগত কারণে বিকল্প ধারা আর এলডিপি পৃথক হয়ে যায়। দলটির বর্তমান প্রধান কর্নেল অলি বীর বিক্রম যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বীর বিক্রম উপাধি পেয়েছেন। এই সূর্যসন্তান জামায়াতের সঙ্গে জোট বাধার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মেরুর একত্রীকরণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যা আদৌ কল্পনা করা যায় না। জোটের সবচেয়ে আলোচিত দল হল এনসিপি। জাতীয় নাগরিক পার্টি (সংক্ষেপে এনসিপি) হলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি কর্তৃক বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দল। দলটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্রদের সমন্বয়ে দলটি গঠিত। নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির শীর্ষ নেতাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি হবে পূর্ববঙ্গ গঠন ১৯৪৭ আন্দোলনকে মূল্যায়ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভাবনা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে ধারন ও ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে লক্ষ্য নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয়। দলটির বামপন্থি বা ডানপন্থি রাজনীতির পরিবর্তে মধ্যপন্থি রাজনীতির অনুসারী হওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। দলটি মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করেছে সাম্য, ন্যায়বিচার, সুশাসনকে। দলের উদ্যোক্তাদের মতে রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী চেতনা ধারণ করে। জোটের আরেকটি দল হলো, আমার বাংলাদেশ পার্টি (সংক্ষেপে এবি পার্টি)। দলটি ২ মে ২০২০ সালে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন মূলনীতির ভিত্তিতে অধিকার ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে। এটি মূলত জামায়াতের সংস্কারপন্থিদের নতুন দল। তবে এবারের নির্বাচনে আলোচিত ব্যক্তি হলেনÑ মেজর (অব) আখতারুজ্জামান রঞ্জন। তিনি বরাবরই আলোচিত একটি মুখ, তিনি এবার আত্মপ্রবঞ্চকের মতো কাজটি করেছেন বলে হচ্ছে। আখতারুজ্জামান ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ-২ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, দলের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডের জন্য রঞ্জনকে বিএনপি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি স্বাধীনতা বিরোধীদের মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। অথচ তিনিই আজ জামায়াতে যোগ দিলেন।

এই জোটের আত্মপ্রকাশের পর বোঝা যায়, বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের রাজনৈতিক আদর্শটি তাদের মূল কোনো ভিত্তি হিসাবে ছিল না। তাই  এদেরকে স্বার্থান্বেষী ভাবলে ভুল হবে না। আর এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের জন্য স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। সেই সঙ্গে ভূলুণ্ঠিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও আদর্শ। এত বৈপরিত্য নিয়ে এই জোট আসলে কি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সেটি নিয়ে জনগণ ধোয়াশার মধ্যে আছে বলে মনে হচ্ছে।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  ভোট   রাজনীতি   ইসলামী জোট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close