মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বেগম জিয়ার উত্তরাধিকার ও আগামীর বাংলাদেশ
রাফসান আহমেদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:৩৫ এএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

শেষ অভিবাদনে ঢাকা শহরে খালেদা জিয়ার জানাজায় জনসমুদ্র কোনো সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রদর্শন নয় বরং এটি এক যৌথ অপরাধবোধ এবং কৃতজ্ঞতার নিঃস্বার্থ বহির্প্রকাশ। ইতিহাস দেখিয়েছে, জনগণ তখনই কারও জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নামে, যখন তারা সেই ব্যক্তির মধ্যে নিজেদের বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। খালেদা জিয়ার জানাজায় যে লাখ লাখ মানুষ শামিল হয়েছে, তাদের বড় অংশই সাধারণ শ্রমজীবী, রিকশাচালক, শ্রমিক এবং ছাত্র। তারা কেন এলো? কারণ তারা দেখেছে, গত ১৭ বছর এই নারী একাই লড়াই করেছেন একটি দানবীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তারা দেখেছে, এ নারী চাইলে রাজকীয় জীবন বেছে নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন এক নির্জন কারাবাস। এই যে নিজেকে ‘জনগণের যন্ত্রণার ভাগিদার’ হিসেবে উৎসর্গ করা- মূলত এটাই তার মাহাত্ম্যের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি মরার আগে প্রমাণ করে গেছেন যে, বুর্জোয়া শাসকের তকমা ঝেড়ে ফেলে কীভাবে জনগণের হৃদয়ের রানী হওয়া যায়। খালেদা জিয়ার জীবনকে যদি একটি কবিতার সঙ্গে তুলনা করি, তবে তিনি হলেন সেই নীল পদ্ম, যা ক্রমাগত নর্দমার ওপর ফুটে থেকেও নিজের সুগন্ধ আর সৌন্দর্য হারাননি। তার শাসনামলের কাদা তার গায়ে লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু তার শেষের দিনগুলোর ত্যাগের বৃষ্টি সেই কাদাকে ধুয়ে সাফ করে দিয়েছে।

তিনি এখন এক বিমূর্ত মহাকাব্য। তার মৃত্যু মানে একটি দেহের অবসান নয়, বরং এটি একটি ব্যবস্থার ওপর জনগণের চূড়ান্ত অনাস্থার স্বাক্ষর। তার মাহাত্ম্য এখানেই যে, তিনি তার অনুপস্থিতি দিয়েও এই রাষ্ট্রকে কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। খেয়াল করলে পাঠক বুঝতে পারবেন, রাজনীতিতে ‘আপসহীন’ শব্দটি প্রায়শই সস্তা অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এটি ছিল এক অস্তিত্ববাদী সত্য। বিগত দেড় দশকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার তাকে বারবার প্রস্তাব দিয়েছিল প্রধানত, পুতুল বিরোধী দল হওয়ার। বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার কিংবা মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পাওয়ার। কিন্তু তিনি প্রতিটি প্রস্তাবকে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিয়েছেন।

দর্শনের চোখে এই জেদটি হলো শোষিত শ্রেণির আত্মমর্যাদার প্রতিফলন। তিনি জানতেন যে, তিনি যদি নতি স্বীকার করেন, তবে পুরো জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। তার এই ‘না’ বলতে পারার সক্ষমতা ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক কবিতা। স্লো-পয়জনিংয়ের শিকার হয়েও, বিদেশে চিকিৎসার অধিকার কেড়ে নেওয়ার পরেও তিনি যেভাবে মাটির কাছাকাছি থেকেছেন, তা প্রমাণ করে যে তার কাছে ক্ষমতা নয়, বরং মাটি ও মানুষের সঙ্গে নাড়ির টানই ছিল মুখ্য। তার এই একগুঁয়েমিই তাকে ইতিহাসের পাতায় এক ‘লৌহমানবী’র অমরত্ব দান করেছে। বেগম খালেদা জিয়া সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, কিন্তু তার জীবন ছিল এক বিরাট দ্বান্দ্বিক সংগ্রাম। তিনি শাসক হিসেবে ভুল করেছেন, কিন্তু ভিক্টিম হিসেবে তিনি হয়ে উঠেছেন অপরাজেয়। ইতিহাসের বিচারে তিনি সেই বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি জুলুমের আগুনে পুড়ে নিজেকে এমনভাবে সোনা করেছেন যে, তার সমালোচনা করতে গেলে এখন কলম থমকে যায়। তার মাহাত্ম্য কোনো দল বা মতাদর্শের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তার মাহাত্ম্য হলো বাংলাদেশের মানুষের আত্মসম্মান আর প্রতিরোধের ইতিহাসে। বেগম খালেদা জিয়া চিনিয়ে গেছেন, রাজনীতি মানে কেবল টিকে থাকা নয়। রাজনীতি মানে ‘না’ বলতে শেখা। আগামীর রাজনৈতিক শক্তিকে মনে রাখতে হবে- ফ্যাসিবাদ কেবল একজনের পতন নয়, বরং একটি ব্যবস্থার নাম। কোনো ‘পুতুল বিরোধী দল’ হওয়া চলবে না। ক্ষমতার ছোটখাটো উচ্ছিষ্টের জন্য জনগণের ম্যান্ডেটকে বিক্রি করা হবে এক নির্লিপ্ত  বিশ্বাসঘাতকতা। যদি রাষ্ট্রের কাঠামো গণতান্ত্রিক না হয়, তবে সেই ব্যবস্থাকে বয়কট করাই হবে খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার বহন করার প্রথম শর্ত।

বেগম খালেদা জিয়া একাই লড়েছেন এক দানবীয় পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। তার ওপর হওয়া অপমান ছিল আসলে এদেশের প্রতিটি নারীর ওপর হওয়া অবমাননার প্রতীক। খালেদা জিয়ার জীবনপাঠ দেখিয়েছে, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ হবে কেবল কোটায় নয়, বরং নেতৃত্বে ও সিদ্ধান্তে। রাষ্ট্রকে হতে হবে এমন এক নিরাপদ চাদর, যেখানে স্লাট-শেমিং বা যৌনবাদী আক্রমণ হবে এক অতীতের দুঃস্বপ্ন। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ লড়াই আমাদের শেখায় নারীর রাজনৈতিক সত্তা কোনো করুণার দান নয়, তা এক অর্জিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এই স্ফুলিঙ্গকেই আগামীর রাষ্ট্রকাঠামোর মশাল বানাতে হবে। সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ বলে যে, নারীর মুক্তি কেবল ক্ষমতায় নয়, বরং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তার অবিচল অবস্থানে। খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন যে, একজন নারী কেবল মমতাময়ী মা বা পত্নী নন, তিনি একটি রাষ্ট্রের প্রতিরোধের প্রধান স্তম্ভ হতে পারেন। তার এই নীরব ধৈর্য এবং আভিজাত্যপূর্ণ সহনশীলতা তাকে বাংলার শোষিত নারী সমাজের কাছে এক বিমূর্ত শক্তির প্রতীকে পরিণত করেছে। সংস্কার মানে কেবল আইন বদলানো নয়, সংস্কার মানে রাষ্ট্রের ধমনী থেকে স্বৈরাচারী রক্ত বের করে দিয়ে সেখানে জনগণের সার্বভৌমত্ব ইনজেক্ট করা।

২০২৬-এর নির্বাচন যেন হয় সেই সার্বভৌমত্বের এক  উৎসব। তিনি নেই, কিন্তু তার অবিচল ছায়া এখন হিমালয়ের মতো এই দেশের গণতন্ত্রের পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটাই তার মাহাত্ম্য, এটাই তার মহাপ্রস্থান। খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন, দেশে থাকা এবং জেলখাটা মানেই হলো- জনগণের হৃদয়ে অমরত্ব লাভ করা। আগামীর নেতৃত্বকে সেই কঠিন মাটির শয্যা বেছে নিতে হবে, যা বেগম খালেদা জিয়া বেছে নিয়েছিলেন তার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত। ২০২৬-এর রাজনৈতিক শক্তি যদি এই শিক্ষা গ্রহণ না করে, তবে ইতিহাসের কাছে তারা আবার অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবে। আমরা যেন ভুলে না যাই খালেদা জিয়ার মাহাত্ম্য তার মুকুটে ছিল না, ছিল তার শৃঙ্খলে। সেই শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তাকেই বানাতে হবে আগামীর বাংলাদেশের সংবিধানের অলিখিত প্রস্তাবনা। তিনি ঘুমিয়ে আছেন শান্তির নিদ্রায়, কিন্তু তার ‘না’ বলার সেই ভয়াল সুন্দর শব্দটা এখনো বাতাসে ভাসছে। সেই শব্দটাই হোক আমাদের আগামীর পথের একমাত্র দিশারি।

লেখক : নৃবিজ্ঞানী ও চলচ্চিত্রকার

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  বেগম জিয়া   উত্তরাধিকার   আগামীর বাংলাদেশ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close