বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড এখনো একটি বৈধ এবং কার্যকর শাস্তি হিসেবে প্রচলিত। কেউ কেউ এটিকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ প্রতিরোধের একটি কার্যকর উপায় হিসেবে দেখেন, অন্যদিকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমালোচকরা এটিকে মানব মর্যাদা এবং আধুনিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন। এই নিবন্ধে বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুদণ্ডের আইনগত ভিত্তি, কোনো অপরাধে এটি প্রযোজ্য, কীভাবে এটি কার্যকর করা হয়, সাম্প্রতিক প্রবণতা এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিনটি পৃথক অপরাধে তাকে এই দণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। যে ট্রাইব্যুনালে হাসিনার বিচার হয়েছে সেই ট্রাইব্যুনাল হাসিনারই তৈরি করা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এই ট্রাইব্যুনালেই জামায়াতে ইসলামীর নেতাসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। এবং তা কার্যকর করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এই যে মৃত্যুদণ্ড তার আইনি ভিত্তি নিয়ে নানা দিক থেকে আলোচনা চলবে এই প্রবন্ধে।
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের প্রধান আইনগত ভিত্তি হলো দণ্ডবিধি, ১৮৬০। এই আইনের অধীনে বেশ কয়েকটি গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, বিদ্রোহে সহায়তা, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান যার ফলে কারও মৃত্যু ঘটে, হত্যা, শিশু বা মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় সহায়তা, যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দ্বারা হত্যাচেষ্টা, এবং ডাকাতি চলাকালে হত্যা। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ‘মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হবে।’
এ ছাড়াও, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের আইনে মোট ৩৩টি অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়, মৃত্যুদণ্ড কোনো পুরোনো বা অচল আইন নয় বরং এটি দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন আইনে সক্রিয়ভাবে বহাল রয়েছে। প্রয়োগ: মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকরণ ও ডেথ রো-এর চিত্র বাংলাদেশে রাষ্ট্র অনুমোদিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি হলো ফাঁসি।
গত এক দশকে বাংলাদেশে একাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ২০১৩-২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত ৩০টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই হত্যা, সন্ত্রাসবাদ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট যুদ্ধাপরাধের মামলা। একই সঙ্গে, প্রতিবছর নতুন করে বিপুলসংখ্যক মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডেথ রো-এ অপেক্ষমাণ বন্দির সংখ্যা ২,৪০০ জনেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে, সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলেও মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি বাস্তব ও ব্যাপক উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকরা মনে করেন সন্ত্রাসবাদ ও যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর অপরাধ দমনে এটি একটি প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। তবে এর বিপরীতে বেশকিছু শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অনেক অপরাধই অহিংস, অথবা বাস্তবে কেউ নিহত না হলেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ রিমান্ডে নির্যাতন বা জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ডেথ রো-এ দীর্ঘদিন একাকী বন্দিত্বে থাকা বন্দিদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দেশ আইনগতভাবে বা বাস্তবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে।
বিলোপপন্থিদের মতে, একটি ত্রুটিপূর্ণ বিচারব্যবস্থায় রাষ্ট্রকে মানুষের জীবন নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া ন্যায়বিচার ও মানব মর্যাদার পরিপন্থি। বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড একটি স্থির বিষয় নয় বরং এটি আইনগত, নৈতিক এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। চলমান বিতর্কের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমর্থকরা মনে করেন কঠোর শাস্তি অপরাধ দমনে কার্যকর, অন্যদিকে বিরোধীরা মানব মর্যাদা রক্ষার ওপর জোর দেন এবং মৃত্যুদণ্ড সত্যিই অপরাধ কমায় কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ করেন। জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি, রিমান্ডে নির্যাতন, স্বচ্ছতার অভাব ও কারাগারের দুরবস্থার প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করেন।
অপরিবর্তনীয় শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুদণ্ড বিলোপের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর সংস্কারের চাপ বাড়তে পারে। কিছু নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে স্থগিতাদেশ অথবা সম্পূর্ণ বিলোপের আহ্বান জানাচ্ছে। মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থায় গভীরভাবে প্রোথিত। ৩৩টি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ, নিয়মিত মৃত্যুদণ্ডাদেশ এবং বড় ডেথ রো জনসংখ্যার কারণে এটি এখনো একটি শক্তিশালী ও বিতর্কিত শাস্তি হিসেবে বিদ্যমান।
তবে আইনি বাস্তবতার পাশাপাশি মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি গুরুতর প্রশ্নও রয়ে গেছে। মানব জীবনের মূল্য, ভুল রায়ে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি এবং রাষ্ট্রপ্রদত্ত মৃত্যুদণ্ড আদৌ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে কিনা। বাংলাদেশ যখন ক্রমাগত পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড যখন মৃত্যুদণ্ড বিলোপ বা কঠোর সীমাবদ্ধতার দিকে ঝুঁকছে, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশ কি ফাঁসির মঞ্চ ধরে রাখবে, নাকি সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রেও জীবনকে সম্মান জানানো একটি বিচারব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হবে? রাষ্ট্র যেহেতু জীবন দিতে পারে না সে জীবন নেওয়ারও সে অধিকার রাখে না।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস