মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ      হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      
দেশজুড়ে
আদিতমারীতে ভুয়া দলিলে বিদ্যালয় জাতীয়করণের অভিযোগ
নিয়াজ আহমেদ সিপন, লালমনিরহাট
প্রকাশ: সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:১৪ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় বাবার দেয়া জাল দলিলে বিদ্যালয় জাতীয়করণের অভিযোগ ওঠেছে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আর ভবন থাকলেও ভূমিহীন এ বিদ্যালয়টি নিয়ে বড্ড বিপাকে পড়েছে উপজেলা প্রশাসন। 

জানা গেছে, উপজেলা সদরের ভাদাই ইউনিয়নের বড়াবাড়ি গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে ১৯৮৭ সালে বড়াবাড়ি এমএইচ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এলাকার প্রায়ত আব্দুল বাছেত ৪০ শতাংশ জমি ভুয়া দলিলে দান করে তার ছেলে লুৎফর রহমানকে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ওই জমিতে রাস্তা না থাকার অজুহাতে  স্থানীয় বড়াবাড়ি জামে মসজিদ ও মাদরাসার পরিত্যক্ত জমিতে অস্থায়ী ভিত্তিতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। 

পরবর্তী ১৯৯৭ সালে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য বিদ্যালয়টিতে একটি দ্বিতল ভবন নির্মান করে সরকার। ভবন নির্মাণের সময় জমি সংকুলান না হলে প্রতিবেশি দিনমজুর আব্দুল হামিদের বাড়ি সড়িয়ে বিদ্যালয়ের ভবন নির্মান করা হয়। কথা ছিলো, আব্দুল হামিদকে পাশে দ্বিগুন জমি কিনে দিবেন প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান। দিনমজুর আব্দুল হামিদকে এ প্রতিস্রুতি দিয়ে পাশে মসজিদের জমিতে স্থান্তরিত করা হয়। 

পরবর্তী বিদ্যালয়টি গত ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করে সরকার। জাতীয়করণের সময় প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান তার বাবার দান করা ভুয়া দলিল প্রদর্শন করে বিদ্যালয়টি মোটা অংকে  টাকার বিনিময়ে জাতীয়করণ করেন। তৎকালীন নিরীক্ষণ কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন না করেই জাতীয়করণ করেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। 

এ দিকে আব্দুল হামিদ জমি কিনে দিতে প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানকে চাপ দিলে আজকাল বলে কালবিলম্ব শুরু করেন। এরই মাঝে মসজিদ কমিটি আব্দুল হামিদকে বাড়ি সড়ানোর নোটিশ দিলে বিপদে পড়েন দিনমজুর প্রতিবন্ধি আব্দুল হামিদ। বাধ্য হয়ে বিদ্যালয় অপসারণ করে তার জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন আব্দুল হামিদ। 

অভিযোগের ভিত্তিতে একাধিক বার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। দফায় দফায় পরিদর্শন ও কাগজ পত্র এবং জমি পরিমাপ করে বিদ্যালয়ের নামে কোন জমির অস্তিত্ব পাননি। মসজিদ আর আব্দুল হামিদের ব্যাক্তি মালিকানাধিন জমিতে গড়ে ওঠেছে বিদ্যালয়ের ভবন। ফলে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি উপজেলা প্রশাসন। বর্তমানে বিদ্যালয়টির অস্তিত্ব নিয়ে বড্ড বিপাকে পড়েছে উপজেলা প্রশাসন। 

স্থানীয় বাহার মিয়া বলেন, ‘বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের সময় প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান দ্বিগুণ জমি কিনে দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে আব্দুল হামিদের ৬ শতাংশ জমি দখলে নেন এবং বাড়ি অন্যত্রে সড়ে দেন। মসজিদ আর হামিদের মালিকানাধীন জমিতে সরকার ভবন করলো কিভাবে। দলিল না দেখে সরকার ভবন করল কেন? প্রধান শিক্ষকের প্রতারণার কারণে এ জঠিলতা তৈরি হয়েছে।’

তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান তিনি।  

এলাকার কাজল বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান তার বাবার ভুয়া দলিল দেখিয়ে সরকারের সাথে প্রতারণা করেছে। ৪০ শতাংশের দলিল থাকলেও বাস্তবে আধ শতাংশও জমি নেই। দিনমজুর সরল মানুষ হামিদকে দ্বিগুণ জমিতে দিতে চেয়ে তার বাড়ি সরিয়ে দেয়। এখন বিদ্যালয় যেহেতু সরকারি হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠতা প্রধান শিক্ষক যেহেতু এখনও রয়েছেন। তিনিই তার প্রতিশ্রুতি রাখলেই সমস্যার সমাধান হয়। 

দিনমজুর প্রতিবন্ধি আব্দুল হামিদ বলেন, ‘রিকশা চালিয়ে ৬ শতাংশ জমি কিনে বসবাস করছিলাম। আমাকে দ্বিগুণ জমি দিতে চেয়ে প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান আমার বাড়ি সরিয়ে বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করেন। আমার জমির কিছু অংশে বিদ্যালয়ের ভবন ও কিছু অংশে মাঠ রয়েছে। এখন আশ্রিত জমির জমির মালিক মসজিদ কমিটি আমাকে বাড়ি সরাতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইউএনও স্যার এসে কাগজপত্র দেখে বলেছে, সব ঠিক আছে। কিন্তু বিদ্যালয় তো সরাতে পারি না। বিদ্যালয়ে জমির দলিল ভুয়া হওয়ায় তারা কোন সমাধান দিতে পারে নি। আমার আর কোনো জমি নেই বাড়ি করার। শিক্ষক হয়ে আমার ও সরকারের সাথে এত বড় জালিয়াতি করলো তার কি কোন বিচার হবে না?’

হামিদের স্ত্রী সেলিনা বেগম বলেন, ‘আমাদেরকে সহজ সরল পেয়ে প্রধান শিক্ষক আমাদের সাথে প্রতারণা করে বিদ্যালয় করেছেন আমাদের জমিতে। আমার এখন কোথায় থাকবো? গরিব বলে কি আমরা ন্যায় বিচার পাব না?’ 

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠাকালীন একাধিক সহকারী শিক্ষক বলেন, চাকুরির সুবাদে যোগদানকালীন  বিদ্যালয়ের জন্য জমি কিনতে প্রধান শিক্ষককে আমরা সবাই মোটা অংকে টাকা দিয়েছি। সেই টাকায় নিজের বাড়ি-গাড়ি করলেও বিদ্যালয়ের নামে কোন জমি কিনেন নি। 

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমার বাবা জমির দলিল দিয়েছেন। সেটি যে ভুয়া ছিল বাস্তবে জমি নেই। তা আমি তখন বুঝতে পারি নি। এখন বিদ্যালয় তুলে নিয়ে যাক, আমার তো চাকরি যাবে না। বড় জোর বদলি করে দিবে। আমি চাকরি করতে এসেছি, জমি কিনে দিতে আসিনি। ভুয়া দলিলের যিনি (তার মৃত বাবা) দাতা তাকে বলেন।’

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘সারাদেশে জাতীয়করণ করা অনেক বিদ্যালয়ে এমন জঠিলতা রয়েছে। ভবন করার সময় তারা বাধা দিলে তো বিদ্যালয়টি তখন হত না। তারা তা করেনি। এখন আমাদের কি করার আছে। জাতীয়করণের সময় সরকারি কর্মচারী হয়ে প্রধান শিক্ষক ভুয়া দলিল প্রদর্শন করেন। সেটি অপরাধ হলেও আমাদের কিছু করার নেই।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি কর্মচারী হয়ে প্রধান শিক্ষক যদি ভুয়া দলিল দিয়ে সরকারের সঙ্গে প্রতারণা করে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। নতুন এসেছি, বিষয়টি জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে অবশ্যই পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার বলেন, ‘আমরা দফায় দফায় পরিদর্শন করে সার্ভেয়ার দিয়ে জমি পরিমাপ করেছি। অভিযোগকারী হামিদ আর মসজিদের জমিতে বিদ্যালয় রয়েছে। বিদ্যালয়ের দলিলটির বাস্তবে কোন ভিত্তি পাইনি। বাধ্য হয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে বিষয়টি দেখতে বলা হয়েছে। এটি স্থানীয়ভাবে সমাধান করা দরকার। সরকারি কর্মচারী হয়ে প্রধান শিক্ষক সরকারের সাথে যে প্রতারণা করেছেন, তা খতিয়ে দেখতে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  আদিতমারী   ভুয়া দলিল   বিদ্যালয় জাতীয়করণ   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close