বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নিহত হওয়ার অভিযোগে দায়ের করা রিপন ফকির হত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়, শেখ রেহানা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আবদুল্লাহ আল মামুনসহ মোট ১০৪ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দিয়েছে পুলিশ।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসআই ফেরদৌস আলী গত জুলাই মাসে বগুড়ার আদালতে এ প্রতিবেদন জমা দেন। আগামী সোমবার (১০ আগস্ট) চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
তবে প্রতিবেদন দাখিলকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল বাছেদ অভিযোগ করেছেন, তার মতামত না নিয়েই পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, এজাহারে তথ্যগত অসংগতি, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এ প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
মামলার অভিযোগ কী ছিল
২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বগুড়া সদর উপজেলার বানদিঘী ফকিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মাবিয়া বেগম সদর থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বগুড়া শহরের ঝাউতলা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় তার স্বামী রিপন ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এজাহারে বলা হয়, মামলার ১ থেকে ১৩ নম্বর আসামির উসকানি ও প্রত্যক্ষ মদদে অন্য আসামিরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। তাদের হাতে লাঠি, ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। মামলার ১৯ নম্বর আসামি, সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম রিপন ফকিরকে গুলি করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
তদন্তে উঠে এল ভিন্ন চিত্র
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলাটি পর্যায়ক্রমে তিনজন কর্মকর্তা তদন্ত করেন। তদন্তে ২২ জন সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজাহারে উল্লেখিত ঘটনার সময় ঝাউতলা এলাকার দোকানপাট ১ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ ছিল। ওই এলাকার তিনজন দোকানকর্মী জানিয়েছেন, তারা কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেননি।
এ ছাড়া বাদীসহ সাতজন সাক্ষী জবানবন্দিতে বলেছেন, ‘রিপন ফকির ৫ আগস্ট গোদারপাড়া এলাকায় পাউরুটি খাওয়ার সময় গলায় আটকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।’
গোদারপাড়া এলাকার কাফেলা কোল্ড স্টোরেজের সামনে চায়ের দোকানদার শামিম প্রামাণিকও তদন্ত কর্মকর্তাকে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তার দাবি, রিপন ফকির তার দোকান থেকে পাউরুটি কিনে খাওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন।
স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন নাজিরুল ইসলাম, যিনি রিপন ফকিরের মরদেহ গোসল করান এবং জানাজার ইমামতি করেন, তিনিও জবানবন্দিতে বলেন, ‘মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন তিনি দেখেননি।’
ময়নাতদন্তেও মেলেনি মৃত্যুর কারণ
আদালতের নির্দেশে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর রিপন ফকিরের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হয়।
২০২৫ সালের ২০ মার্চ শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ থেকে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, মরদেহে পচন ধরায় মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে আরও তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।
ভিডিও বক্তব্যেও ভিন্ন তথ্য
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মরদেহ উত্তোলনের দিন বাদী ও কয়েকজন সাক্ষী সাংবাদিকদের দেওয়া ভিডিও বক্তব্যে বলেন, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন বিকালে গ্রামে আনন্দ মিছিলে অংশ নেওয়ার পর রিপন ফকির গোদারপাড়ায় পাউরুটি খেতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যান।’
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের প্রাথমিক তালিকায় রিপন ফকিরের নাম থাকলেও চূড়ান্ত গেজেটে তার নাম নেই।
বাদীর বক্তব্য
মামলার বাদী ও নিহতের স্ত্রী মাবিয়া বেগম বলেন, ‘ঘটনার পর গ্রামের কয়েকজন তাকে বলেন, মামলা করলে রিপন ফকিরকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতে পারে এবং সরকারি অনুদান পাওয়া যাবে। সেই আশায় তিনি থানায় গিয়ে কাগজে স্বাক্ষর করেন।’
তিনি জানান, পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন।
পিপি ও তদন্ত কর্মকর্তার ভিন্ন অবস্থান
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফেরদৌস আলী বলেন, ‘এজাহারে তথ্যগত ত্রুটি ছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।’
অন্যদিকে জেলা জজ আদালতের পিপি আব্দুল বাছেদ বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যান্য মামলার মতো এ মামলাতেও তার মতামত নেওয়া উচিত ছিল। তার দাবি, তদন্তে বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে, যা আদালতে তুলে ধরা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি প্রমাণিত হয় যে বাদী ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা মামলা করেছেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
আইনজীবীর মত
বগুড়া জেলা আইনজীবী সমিতির এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মামলার সাক্ষীদের জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে রেকর্ড করা হলে তদন্ত আরও শক্তিশালী হতো।’
তার ভাষ্য, তদন্তে যদি অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য বলে প্রতীয়মান হয়ে থাকে, তাহলে শুধু ‘তথ্যগত ত্রুটি’ নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী ‘মিথ্যা’ উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারত।
কেকে/এলএ