সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ      সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল      ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোন পথে?
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:১৯ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মার্কিন অভিযান লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান তেলরাজনীতি, আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও বৈশ্বিক ক্ষমতার সংঘাতের পরিণতি এটি। মাদুরোর রাজনৈতিক পতন, বাস্তব হোক বা প্রতীকী, ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রকাঠামোকে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির নিষ্ঠুর টানাপোড়েনে। কেননা বাইরের শক্তিগুলো সব সময়ই রেজিম চেঞ্জের শূন্যতা দিয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর ইরান ও মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে বসে অপেক্ষা করেনি। একইভাবে, ভেনেজুয়েলার বন্ধু হিসেবে কিউবা, চীন, রাশিয়া ও ইরান রয়েছে; রয়েছে ঐ অঞ্চলে অত্যন্ত সুসংগঠিত গোষ্ঠীগুলোও।

ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক যাত্রাপথ বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় হুগো শাভেজের ১৯৯৯ সালে বলিভারিয়ান বিপ্লবের দিকে। শাভেজ রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এনজিও ও কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে। তাছাড়া তার সময় থেকেই তেলসম্পদকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তায় রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ে। কিন্তু এই সমাজতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রের মডেলটি পশ্চিমা মুক্তবাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য, যে দেশটি ঐতিহাসিকভাবে লাতিন আমেরিকাকে নিজের প্রভাববলয় হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে।

ভেনেজুয়েলা একটি ক্লাসিক রেন্টিয়ার স্টেট, যার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে একক প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুদ, প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল; যা বিশ্বের মোট মজুদের ১৮ শতাংশ, থাকা সত্ত্বেও দেশটি অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে। যেখানে ভেনেজুয়েলার মোট রপ্তানির ৯৫ শতাংশের বেশি আসে তেল থেকে এবং রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ এই একক খাত নির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা কিংবা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে সরাসরি আঘাত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আরোপিত দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা, যার ফলে ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভেনেজুয়েলার জিডিপি প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে যায় এবং একপর্যায়ে দেশটি ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হাইপারইনফ্লেশনের মুখোমুখি হয়।

ওয়াশিংটনের দাবি অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় তাদের লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য যে গণতন্ত্র নয় বরং কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ তা বুঝতে বহির্বিশ্বের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও প্রকৃত সংকট গণতন্ত্র নয়; সংকট হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য একসময় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল, ২০০০ সালে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলার। নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফলে ২০২২ সালে সেই বাণিজ্য কার্যত প্রায় শূন্যে নেমে আসে। এমন প্রেক্ষাপটেই মাদুরো সরকার তেল খাতকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রেখে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত জোট গড়ে তোলে। চীন ভেনিজুয়েলাকে ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ দেয়, যার বড় অংশ তেল দিয়ে পরিশোধ করা হয়েছে। রাশিয়ার রোসনেফ্ট ও ভেনিজুয়েলার পিডিভিএসএ’র যৌথ প্রকল্প, সামরিক সহযোগিতা এবং এস-৩০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানায়। পাশাপাশি ব্রিকস-ঘনিষ্ঠ অবস্থান ডলারনির্ভর বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য ভেনেজুয়েলাকে একটি কৌশলগত অবস্থানে পরিণত করে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে সামরিক বা গোপন অভিযানের মাধ্যমে অপসারণ সুস্পষ্টভাবে অবৈধ। জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ করে এবং অনুচ্ছেদ ২(৭) অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাহস্তক্ষেপের নীতি নিশ্চিত করে। একইভাবে ওএএস চার্টার লাতিন আমেরিকায় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু চিলিতে ১৯৭৩ সালে সালভাদর আয়েন্দে, ইরানে ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক, গুয়াতেমালায় ১৯৫৪ সালে জাকোবো আরবেনজ কিংবা লিবিয়ায় ২০১১ সালে গাদ্দাফির পতন; সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, জাতীয় সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। ভেনেজুয়েলা সেই ধারাবাহিকতারই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার সামনে মূলত তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমত, মার্কিন-সমর্থিত রাজনৈতিক রূপান্তর। এই ক্ষেত্রে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি পশ্চিমাপন্থি সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে। স্বল্পমেয়াদে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক স্বস্তি এলেও, দীর্ঘমেয়াদে তেল খাত বেসরকারিকরণ ও বহুজাতিক কোম্পানির প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপ্রধানের হঠাৎ পতন সামরিক বাহিনী, সমাজতান্ত্রিক শক্তি ও বিরোধী জোটের মধ্যে দ্বন্দ্ব উসকে দিতে পারে। লিবিয়া ও ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ধরনের শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার জন্ম দেয়। তৃতীয়ত, সবচেয়ে কঠিন কিন্তু টেকসই পথ হলো বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সীমিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার। এতে একদিকে সামাজিক নিরাপত্তা বজায় থাকবে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ভেনিজুয়েলা সংকট গোটা লাতিন আমেরিকার জন্যও একটি সতর্কবার্তা। বলিভিয়া, কিউবা কিংবা নিকারাগুয়ার মতো দেশগুলো নতুন করে বুঝতে পারছে, স্বাধীনতার মূল্য কতটা চড়া। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করছে, একবিংশ শতাব্দীতেও শক্তির রাজনীতি রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। মাদুরোর পর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুটি শক্তির সংঘাতে, একদিকে জনগণের সার্বভৌম আকাক্সক্ষা, অন্যদিকে বৈশ্বিক ক্ষমতার কঠোর বাস্তবতা। তেল, রাজনীতি ও পরাশক্তির দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ভেনেজুয়েলা আজ শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং বৈশ্বিক ব্যবস্থার একটি পরীক্ষাক্ষেত্র।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  ভেনেজুয়েলা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close