নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল নিয়েছে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী। বিশেষ করে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা। এ ছাড়া এনসিপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মাঠ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপর চাপ সৃষ্টি বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সধারণত কোনো আপত্তি থাকলে তা নিয়ে প্রার্থীরা আপিল করতে পারেন। সেখানে কেন রিটার্নিং কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়া হবে। এ ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে জোট করার পর হঠাৎ করেই মাঠ প্রশাসনের ওপর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনছেন এনসিপির নেতারা। জামায়াতও একই অভিযোগ তুলছে। যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এটা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অন্তরায়। তারা বলছেন, তফসিল ঘোষণার পর মাঠ প্রশাসন এখন নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে। এ অবস্থায় সুনির্দিষ্ট না বলে ঢালাওভাবে এরকম অভিযোগ তোলা নির্বাচন ব্যাহতেরই পাঁয়তারা।
গত রোববার রংপুরে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) এক প্রার্থীকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে তার মনোনয়নপত্র বাতিলের দাবি জানান এনসিপি সদস্য সচিব আখতার হোসেন। এ ছাড়া কুড়িগ্রাম-৩ আসনে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় তা নিয়ে হট্টগোল করেন দলটির নেতাকর্মীরা। যা মাঠ প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টির নামান্তর।
দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। বর্ধিত সময়ের মধ্যেও যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় গত রোববার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ব্যাপক হট্টগোল করেন তার সমর্থকরা। এমনকি রিটার্নি কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে তার পদত্যাগও দাবি করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের সময় মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরে রোববার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হলেও তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন বাতিল সংক্রান্ত কোনো প্রমাণপত্র জমা দিতে পারেননি। এ কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে মনোনয়নপত্র বাতিলের খবরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন জামায়াতের প্রায় দুই থেকে আড়াইশ নেতাকর্মী ও সমর্থক। এ সময় জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। তারা জেলা প্রশাসকের চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীরা জেলা প্রশাসকের অপসারণের দাবিসহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
রংপুরে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জাপার এক প্রার্থীকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে তার মনোনয়নপত্র বাতিলের দাবি জানান আখতার হোসেন। যদিও জেলা প্রশাসক এ দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে জাপার প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন। এতে আখতার হোসেন অসন্তোষ প্রকাশ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ত্যাগ করেন। এ সময় আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, আইনের প্যাঁচে দোসরদের পুনর্বাসন করার চক্রান্ত চলছে।
এনসিপি নেতাদের বিষাদগার : প্রশাসন বিএনপির দিকে হেলে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য পাচ্ছি, প্রশাসন একটি দলের দিকে হেলে পড়েছে- সেই দলটি হলো বিএনপি।
এদিকে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে যদি প্রশাসনের আচরণ একপাক্ষিক ও পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে এমন নির্বাচন আয়োজনের কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, তিনি আরও বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনের যে ভূমিকা আমরা দেখছি, তা আমাদের বিগত তিনটি নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দেয়। অতীতে নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে লড়াই-সংগ্রাম করেছে, নির্যাতনের শিকার হয়েছে, রক্তক্ষরণ করেছে। অথচ আজ আবারও আমরা একই ধরনের প্রশাসনিক আচরণ দেখতে পাচ্ছি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসন যেভাবে একটি দলকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, সেই আচরণ আমাদের গভীরভাবে আহত করছে। এভাবে যদি একটি দলের পক্ষে প্রশাসন দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সরকারি অর্থ ব্যয় করে এই নির্বাচনের কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।
দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতারা এ অভিমত প্রকাশ করেন। বৈঠকে অভিমত প্রকাশ করা হয় যে, দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। প্রশাসনের মধ্যে কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তা একটি বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করছে বলে বিভিন্ন স্থান থেকে অভিযোগ আসছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো প্রকাশ্য দিবালোকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে।
মানিকগঞ্জে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে হেনস্তা : মানিকগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপি নেতা আতাউর রহমানকে হেনস্তা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় গত রোববার সন্ধ্যায় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার দুপুরে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই অনুষ্ঠিত হয়। যাচাই শেষে সম্মেলনকক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় আতাউর রহমানকে ধাক্কা দিয়ে বের হতে শাসান মানিকগঞ্জ পৌর বিএনপির আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আরিফ হোসেন এবং শিবালয় উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা।
এ বিষয়ে আতাউর রহমানের ভাষ্য, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে বিএনপির প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকেরা আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারেন।
কেকে/ আরআই