শহীদ ওসমান হাদিকে গুলি করার সময়কাল প্রায় মাসখানেকের কাছাকাছি হতে চলেছে। কিন্তু মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। হাদির খুনিদের এখনো ধরতে পারেনি সরকার। বিষয়টি চরম হতাশাজনক, ক্ষোভোদ্রেককারী ও অগ্রহণযোগ্য। ধোঁয়াশা রয়েছে- হাদির খুনিরা কি দেশেই আছে, নাকি সত্যিই ভারতে পালিয়ে গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, খুনিরা নাকি ভারতে পালিয়ে গেছে।
সম্প্রতি ডিএমপি জানিয়েছে, হাদির খুনিরা ভারতে পালিয়ে গেছে। কিন্তু জনপ্রিয় অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের অনেকেই এখনো মনে করেন, খুনিরা এখনো দেশেই আছে। বিষয়টির সত্য-মিথ্যা যাচাই করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, খুনিদের নিখুঁত অবস্থান সম্পর্কে তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তারা এ নিয়ে এখনো কাজ করছে।
এদিকে এরই মধ্যে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে শহীদ হাদির খুনি ফয়সাল সদৃশ এক যুবককে দেখা যায় হাদিকে খুন করা ও পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কথা বলতে। সেখানে সে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে দোষ অন্যদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার বাহানা করছে। সেখানে সে এ-ও দাবি করছে, সে নাকি দুবাইতে আছে। কেউ কেউ বলছে, ভিডিওটি ভুয়া। আবার কেউ কেউ বলছে, ভিডিওটি ভুয়া নয়। ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, তারা ভিডিওটির সঠিকতা যাচাইয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে।
এদিকে র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান রোববার (৪ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘পলাতক আসামিরা দেশে না বিদেশে অবস্থান করছে- তা জানতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও ম্যানুয়াল সোর্স ব্যবহার করা হচ্ছে। অবস্থান নিশ্চিত হওয়া গেলে তাদের গ্রেপ্তার কঠিন হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো আসামি যদি দেশের বাইরে পালিয়েও যায়, সে ক্ষেত্রে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ র্যাবের ডিজির কথায় এটিই স্পষ্ট হয় যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাদির খুনিদের নিখুঁত অবস্থানের ব্যাপারে এখনো যথাযথ তথ্য জানে না। হাদির খুনিদের পালানোসহ সব ব্যর্থতার দায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টা- সর্বোপরি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে কয়েক দফায় শাহবাগ ব্লকেড কর্মসূচি পালন করেছে ইনকিলাব মঞ্চ।
সংগঠনটির কর্মীরা ২ জানুয়ারি তৃতীয় দফায় শাহবাগ ব্লকেড কর্মসূচি পালন করেছে। সেখানে হাদি হত্যায় জড়িত খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। ইনকিলাব মঞ্চ হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন না হলে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করবে সংগঠনটি।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচি থেকে এই ঘোষণা দেন সংগঠনের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। সব মিলিয়ে হাদি হত্যার বিচার নিয়ে জনমনে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। সবার অভিযোগ, এই সরকার শহীদ ওসমান হাদিকে তো সুরক্ষা দিতে পারেনি, তার খুনিদেরও এখনো ধরতে পারছে না।
সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন- তাহলে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী করে? তারা কি অকর্মণ্য, নাকি অদক্ষ? নাকি আওয়ামী সহযোগী? একজন খুনি জ্বলজ্যান্ত মানুষকে গুলি করে নাকের ডগা দিয়ে পালিয়ে যায়, আর গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কোনো খবরই থাকে না এটা কেমন কথা? এদের ওপরই নাকি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব! দেশের মানুষ কি তাহলে এ রকম নিরাপত্তার মধ্যেই আছে? এই কথাগুলোই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের লাখো মানুষের মনে।
আমরা জানি, সাগর-রুনি হত্যার এক যুগ পেরোলেও এখনো কোনো বিচার হয়নি। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সব খুনিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি সরকার। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার তো বিচার করেইনি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বিচার সম্পন্ন করতে পারেনি। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনই এখনো জমা দেওয়া সম্পন্ন হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে ১২৩ বার।
জনমনে আশঙ্কা- হাদির বিচারও কি একই পথে এগোচ্ছে? এই আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়, যখন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, হাদি হত্যার বিচার নিয়ে তাড়াহুড়ো করার কোনো সুযোগ নেই। ৩ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জে এক মতবিনিময় সভা শেষে তিনি বলেন, ‘বিচার এমন একটি বিষয়, যেটি নিয়ে তাড়াহুড়ো করার কোনো সুযোগ নেই। তবে অবশ্যই আমরা তাদের (আসামি) ফেরত আনার চেষ্টা করছি।’
তবে সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই বিচারকাজ সম্পন্ন হবে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, বিচারকাজ সম্পন্ন মানে কি কেবল চার্জশিট দিয়ে রায় ঘোষণা করা? রায় কার্যকর কি করতে পারবে সরকার? আসামিদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা না গেলে এমন চার্জশিট দাখিল করে বিচারকার্য শেষ করার বাস্তবে কোনো মূল্য নেই।
আসামিরা যদি সত্যিই ভারতে পালিয়ে যায়, তাদের ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা কতটুকু? আসলেই কি কোনো সম্ভাবনা আছে? ভারত কি খুনিদের ফেরত দেবে? আমার মনে হয়, ভারত হাদির খুনিদের বাংলাদেশে ফেরত দেবে না। ভারত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মতো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফেরত দিচ্ছে না। হাদির খুনিদের কী করে ফেরত দেবে? হাদির খুনিরা তো আওয়ামী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীরই সদস্য।
সবাই জানে, হাসিনা ও ভারতের গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়। হাসিনা যে খুন, গুপ্তহত্যা, অগ্নিসংযোগসহ দেশকে অস্থিতিশীল করার নির্দেশনা নিজেই দিয়েছেন, তা তার ফাঁস হওয়া ফোনালাপ থেকেই জানা যায়। জুলাই বিপ্লবীসহ বিএনপি-জামায়াতের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া ও খুন করার নির্দেশনা দিয়ে এক ফোনালাপে তিনি বলেছিলেন- ‘ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তোমাদের বাড়িঘরে যারা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, তাদের বাড়িঘর নেই? সব কথা কি বলে দিতে হয়? আমার তো সারা বাংলাদেশে ২২৭টি মার্ডার কেস। আমি বলছি, সবাই তালিকা কর। তোমরাও তালিকা কর। ২২৭ মার্ডারের লাইসেন্স পেয়ে গেছি। এক মামলায় যে শাস্তি, সোয়া দুইশ মামলায় একই শাস্তি। তাই না? ঠিক আছে, সেই শাস্তি নেব। তার আগে সোয়া দুইশ হিসাব করে নেব।’
এদিকে তার গুণধর আমেরিকান নাগরিক পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় নির্বাচন বানচালের হুমকি দিয়ে ১৬ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন- ‘আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা না তুললে আমরা কোনো নির্বাচন হতে দেব না। আমরা আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেব না। আমাদের প্রতিবাদ আরও জোরদার হবে এবং প্রয়োজনে আমরা সবই করব। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিছু না করলে নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশে সহিংসতা ছড়াতে পারে, সংঘর্ষ অনিবার্য।’
এ ছাড়া সম্প্রতি ভারতের এক প্রভাবশালী গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয় হুমকি দিয়ে বলেন যে, সহিংস উপায়ে যে কোনো মূল্যে নির্বাচনকে বানচাল করবে তারা। জয় সাক্ষাৎকারে বলেন- ‘এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য হলো- নির্বাচন বন্ধ করা। আওয়ামী লীগ নির্বাচন বন্ধ করতে আন্দোলনে নামবে, এবং সেই আন্দোলন ঢাকায় সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।’ মাতা-পুত্রের সন্ত্রাসী হামলা ও টার্গেট কিলিং পরিচালনার নির্দেশনার ফলস্বরূপ দেশ সাম্প্রতিক অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দ্বারপ্রান্তে।
হাদি শহীদ হয়েছেন হাসিনা ও ভারতের টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়ে। দেশে এখানে-সেখানে ভবন, দোকানপাট ও বাসে অগ্নিসংযোগ; গত ২৪ ডিসেম্বর মগবাজার এলাকায় ককটেল হামলায় এক যুবকের খুন হওয়াসহ সম্প্রতি সংঘটিত সহিংস ঘটনাগুলো হাসিনা ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অংশ। কিন্তু এসব মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলাপ ওঠছে।
শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার আশানুরূপ কিছু করতে পারেনি। হাদি হত্যাকাণ্ডের বেলাতেও একই চিত্র। বিচারিক প্রক্রিয়ায় আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। ভবিষ্যতে অগ্রগতি কতখানি হবে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। হয়তো এভাবে দিন যাবে, মাস যাবে, বছর যাবে। হাদির শুভাকাক্সক্ষীরাও বিচার চাইতে চাইতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। মিডিয়া থেকে হাদির আলোচনা হারিয়ে যাবে। নতুন ইস্যু সামনে আসবে। মানুষ তা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। নতুন সরকার আসবে, নতুন নীতি আসবে, নিত্যনতুন বয়ান তৈরি হবে। এসবের ভিড়ে হয়তো ক্ষীণ হয়ে আসবে হাদি হত্যার বিচার। আর শহীদ ওসমান হাদির খুনিরা মুক্ত আকাশে মুক্ত বিহঙ্গের মতো আয়েশি ভঙ্গিতে সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াবে। আমি চাই, আমার এই আশঙ্কা মিথ্যা হোক। তবু বিচার হোক হাদি হত্যার।
কেকে/এমএ