টানা তিন মাস ধরে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই অসহনীয় করে তুলছে। শীত মৌসুমে সাধারণত বাজারে খাদ্য সরবরাহ বাড়ে এবং দাম কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নেমে আসে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমেনি; বরং খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা নভেম্বরের তুলনায় সামান্য বেশি। যদিও বছরভিত্তিক হিসাবে এ খাতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ দেখা যায়, তবু সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমেনি। গ্রাম ও শহর- উভয় এলাকাতেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, তবে শহরে এ চাপ তুলনামূলক বেশি।
ডিসেম্বর মাসে শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা শহুরে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মজুরি বৃদ্ধির হার মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলাতে পারছে না। ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
এভাবে মুদ্রাস্ফীতি দারিদ্র্যকে শুধু বাড়াচ্ছে না, দারিদ্র্যকে স্থায়ী করে তুলছে। ডিসেম্বর মাসে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, যেখানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ আয় বাড়ছে ধীরে, কিন্তু ব্যয় বাড়ছে দ্রুত। গত তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সুদের হার বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের শুল্ক ও কর কমানো, আমদানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার মতো বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাজারে তার কাক্সিক্ষত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
চাল, তেল, পেঁয়াজ, ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই রয়ে যায়নি। এই পরিস্থিতিতে কেবল সাময়িক প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি এবং তদারকির ঘাটতি- এই তিনটি বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা কঠিন। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে আরও শক্তিশালী ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। টিসিবি, ওএমএস কিংবা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি- এসব যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরি ও বেতন কাঠামো নিয়মিতভাবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় না করলে মানুষের প্রকৃত আয় রক্ষা করা সম্ভব হবে না। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায় এবং রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন দেশের নীতি-নির্ধারকদের রাজনৈতিক দায়িত্ব। নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের ন্যূনতম জীবনযাত্রার অধিকার রক্ষা করতে হলে এখনই সমন্বিত, দৃঢ় এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
কেকে/এমএ