দেশজুড়ে থামছে না হত্যাকাণ্ড। হত্যা যেন দেশের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আইনের শাসনের অনুপস্থিতি হত্যাকারীদের করে তুলছে ভয়-ডরহীন। এ ভয়ংকর প্রবণতায় মানুষ যেমন হয়ে উঠছে অভ্যস্ত একইসঙ্গে আতঙ্কিত। ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্রসংগঠনের সদস্য কিংবা সাধারণ মানুষ- কেউই নিরাপদ নয়। কুপিয়ে হত্যা, প্রকাশ্যে গুলি, ছুরিকাঘাতের পর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংসতা ঘটছে দিনের আলোতে, জনসমাগমের মাঝেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এসব ঘটনার পর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া প্রায়ই বিবৃতিনির্ভর, কার্যকর কোনো প্রতিরোধ চোখে পড়ে না। সম্প্রতি নরসিংদী, যশোর, শরীয়তপুর ও চট্টগ্রামের রাউজানে ধারাবহিক হত্যাকাণ্ডগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অপরাধীরা কার্যত ভয়মুক্ত ও বেপরোয়া। বিশেষ করে রাউজানে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পুনরুত্থান প্রমাণ করে, সহিংসতা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী আবারও সংগঠিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে সেখানে একের পর এক খুন রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরে।
একটি রাষ্ট্রে যখন আইনের শাসন থাকে না তখন ঘাতকরা হয়ে উঠে ভয়-ডরহীন। গত সোমবার রাতে নরসিংদীতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরাপর পথে শরৎ চক্রবর্তী (৪০) নামের এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে ছুরিকাঘাতের শিকার হন খোকন দাস নামের এক ব্যবসায়ী। হামলাকারীদের চিনে ফেললে তার শরীর পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এসব হত্যাকাণ্ড আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। নির্বাচনের নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে দেশজুড়ে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে- ভয়ের পরিবেশে কি অবাধ প্রচারণা ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব? সহিংসতা চলতে থাকলে প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারÑ সবার মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে অনিবার্যভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা বাড়লে তা শুধু ভোটের আগেই সীমাবদ্ধ থাকে না; নির্বাচনপরবর্তী প্রতিশোধ ও সংঘাতও দীর্ঘস্থায়ী হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয়, অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তাÑ দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তখন নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়।
এ অবস্থায় সরকারের করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, সহিংসতার হটস্পটগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে দৃশ্যমান আইনশৃঙ্খলা অভিযান চালাতে হবে এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত করতে নির্বাচনকালীন কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সহিংসতা বন্ধে স্পষ্ট অঙ্গীকার আদায় করতে হবে।
রাষ্ট্র যদি এখনই শক্ত ও নিরপেক্ষ অবস্থান না নেয়, তবে ‘খুনের জনপদ’ এ পরিণত হবে বাংলাদেশ। এটাই হয়ে উঠবে আমাদের নির্বাচনের বাস্তব প্রেক্ষাপট। গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে আগে নাগরিকের জীবন রক্ষা করতে হবে এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। ফলে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে হবে। অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করতে হবে। দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোরারোপ করতে হবে। সীমান্তে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ রোধ করতে হবে, তবেই যে নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি সেটি বাস্তবায়িত হবে।
কেকে/এমএ