আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ, বিশ্ব রাজনীতির কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, এটি সমসাময়িক বিশ্বের সবচেয়ে বাস্তব, সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটের নাম। এটি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে সরাসরি যুদ্ধের বদলে যুদ্ধ চালানো হয় অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে, যেখানে রক্ত ঝরে প্রান্তিক রাষ্ট্রে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হয় ওয়াশিংটনের কৌশলগত কক্ষে বসে। এই প্রক্সি যুদ্ধের মূল দর্শন হলো- নিজের ক্ষতি কমিয়ে প্রতিপক্ষকে সর্বোচ্চ দুর্বল করা, প্রয়োজন হলে একটি পুরো দেশকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে যে বৈশ্বিক আধিপত্যের কাঠামো গড়ে তুলেছে, তা কেবল সামরিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাকে একত্র করে ওয়াশিংটন তৈরি করেছে এক বিস্তৃত ক্ষমতার বলয়। এই বলয়ের ভেতরে থাকা রাষ্ট্রগুলো পায় নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক সুবিধা ও রাজনৈতিক সমর্থন; আর বলয়ের বাইরে দাঁড়াতে চাইলেই শুরু হয় শাস্তির রাজনীতি- অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ, এমনকি সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র।
বিশ্বজুড়ে আমেরিকার যুদ্ধমনোভাব নতুন কোনো বিষয় নয়। কোল্ড ওয়ারের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশকে ব্যবহার করেছে কৌশলগত দাবার ঘুঁটি হিসেবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ তার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ। “কমিউনিজম ঠেকানোর” অজুহাতে একটি স্বাধীন দেশকে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় এবং একটি প্রজন্মের মানসিক ক্ষত-সবকিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়ে ফিরে যায়। কিন্তু সেই পরাজয় তাদের নীতিতে আত্মসমালোচনার জন্ম দেয়নি; বরং যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছে। সরাসরি যুদ্ধের রাজনৈতিক ও মানবিক মূল্য যখন অত্যধিক হয়ে উঠল, তখনই সামনে এলো প্রক্সি যুদ্ধের কৌশল। এই কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র নিজে সামনে থাকে না, বরং স্থানীয় শক্তি, মিত্র রাষ্ট্র কিংবা বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে। আফগানিস্তান তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মুজাহিদদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করা হয়েছিল। পরে সেই একই ভূখণ্ডে “সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ”-এর নামে দুই দশক ধরে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা হলো। ফলাফল- রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়া, সামাজিক স্থিতিশীলতার অবসান এবং শেষ পর্যন্ত আবারও তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। আফগান জনগণ আজও সেই যুদ্ধের বোঝা বইছে।
ইরাক যুদ্ধ ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অভিযোগ তুলে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে আগ্রাসন চালানো হলো। সরকারকে উৎখাত করা হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হলো। কিন্তু গণতন্ত্র এলো না, স্থিতিশীলতা এলো না। বরং সেই শূন্যতার মধ্যেই জন্ম নিল আইএসের মতো সংগঠন। এই যুদ্ধ শুধু ইরাককেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার রেশ আজও কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের আরেকটি শক্তিশালী অস্ত্র হলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে কিংবা একতরফা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ইরান, কিউবা, ভেনিজুয়েলা-এই দেশগুলো তার জ্বলন্ত উদাহরণ। নিষেধাজ্ঞার নামে মূলত শাস্তি দেওয়া হয় সাধারণ জনগণকে, অথচ দায় চাপানো হয় সরকারের ওপর। এটি এক ধরনের আধুনিক অবরোধ যুদ্ধ, যেখানে বোমা পড়ে না, কিন্তু ক্ষুধা, ওষুধের অভাব আর দারিদ্র্য মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়।
ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি আরও বেশি নগ্ন, আগ্রাসী ও প্রকাশ্য হস্তক্ষেপমূলক রূপ ধারণ করেছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে অস্বীকার করে বিরোধী নেতাকে একতরফাভাবে শাসক হিসেবে ঘোষণা করার চেষ্টা কেবল কূটনৈতিক চাপ নয়, এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আঘাত। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে দেশটির তেল রপ্তানি, বৈদেশিক লেনদেন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়ে। এই অবরোধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে সাধারণ মানুষ- খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতিতে দেশটি ভয়াবহ মানবিক সংকটে নিপতিত হয়। এখানেই থেমে থাকেনি হস্তক্ষেপের মাত্রা। রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দেওয়া, সামরিক বিদ্রোহে পরোক্ষ সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা মিলিয়ে এটি একটি সুস্পষ্ট রেজিম পরিবর্তন কৌশলের উদাহরণ। এসব কর্মকাণ্ড জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন হলেও সেগুলোকে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই দ্বিচারিতা শুধু ভেনিজুয়েলার সংকটকে গভীর করে না, বরং বিশ্বব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতাকেও গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে প্রক্সি যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছে ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ইউক্রেনকে ব্যবহার করছে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে। বিপুল অস্ত্র, অর্থ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া হলেও যুদ্ধের মূল বোঝা বইছে ইউক্রেনের জনগণ। এই যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো, বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ এবং পারমাণবিক স্থিতিশীলতাকেও গভীর সংকটে ফেলেছে। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশ্ববিবেককে আরও নাড়া দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। গাজায় অবরোধ, বেসামরিক হত্যাকাণ্ড এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের পরও ওয়াশিংটনের অবস্থান অপরিবর্তিত। একই চিত্র দেখা যায় লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ায়, যেখানে প্রক্সি শক্তির সংঘাতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। আফ্রিকার বহু দেশও এই প্রক্সি রাজনীতির বাইরে নয়। সেখানে কখনো সন্ত্রাস দমনের নামে, কখনো খনিজ সম্পদের নিরাপত্তার অজুহাতে, আবার কখনো চীনের প্রভাব ঠেকানোর কৌশলে নানা ধরনের নীরব হস্তক্ষেপ চলছে। এসব হস্তক্ষেপ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে- ওয়াশিংটন কি এবার সরাসরি আগ্রাসনের পথে হাঁটবে, নাকি এখানেও প্রক্সি কৌশল প্রয়োগ করবে? আর্কটিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, খনিজ সম্পদ ও সামরিক অবস্থান ভবিষ্যতের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বড় প্রশ্ন উঠে- বিশ্ব ভূরাজনীতির গতিপথ কোন দিকে যাচ্ছে? এন্টি-আমেরিকান জোট কি আরও শক্তিশালী ও সংগঠিত হবে, নাকি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংঘাতে দুর্বল হয়ে পড়বে? চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে একটি বিকল্প শক্তিকেন্দ্র কি সত্যিই গড়ে উঠবে, নাকি অধিকাংশ দেশ ভয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও নিরাপত্তার অজুহাতে আমেরিকার ব্লক পলিটিক্সই মেনে নেবে? ইতিহাস বলে, অতিরিক্ত আধিপত্য শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের জন্ম দেয়। কিন্তু সেই প্রতিরোধ সব সময় ন্যায়বিচার আনে না; কখনো কখনো তা আরও বড় সংঘাতের জন্ম দেয়। আজকের বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত মানবসভ্যতাকে আরও অস্থির, আরও সহিংস ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র। আর সেই মানচিত্রে ‘আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ’ কেবল একটি কৌশল নয়, এটি একটি যুগের নাম- যে যুগের বোঝা বইছে শুধু একটি অঞ্চল নয়, পুরো বিশ্বব্যবস্থা, পুরো মানবসভ্যতা।
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক
কেকে/এজে