রাজশাহীর তানোর উপজেলায় ৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরীকে অপহরণের অভিযোগ গ্রাম্য সালিশে মীমাংসা করার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধ আপোষযোগ্য কি না এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কার, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের চকপাড়া এলাকার এক প্রবাসীর ১৩ বছর বয়সী কিশোরী কন্যাকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে।
অভিযুক্ত হিসেবে কলমা ইউনিয়নের অমৃতপুর গ্রামের লিটনের ছেলে এবং বনকেশর ব্রীজঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিপুলের (১৮) নাম উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় কিশোরীর মা বাদী হয়ে তানোর থানায় একটি অপহরণের অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত বিপুল দীর্ঘদিন ধরে কিশোরীকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল এবং সাড়া না পেয়ে বিভিন্ন সময় উত্যক্ত করত। বিষয়টি আগে থেকেই অভিযুক্তের পরিবারকে জানানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৫ জানুয়ারি সকালে শফিকুল ওরফে বাদল নামের এক ব্যক্তির সহযোগিতায় বিপুল কিশোরীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে তারা প্রায় দুই দিন আত্মগোপনে ছিল।
অভিযোগ দায়েরের পর থেকেই মামলা তুলে নিতে কিশোরীর পরিবারকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। এরই ধারাবাহিকতায় (৭ জানুয়ারি) উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা আব্দুর রহিম মোল্লার উদ্যোগে কামারগাঁ ইউনিয়নের শ্রীখণ্ডা গ্রামে তার বাসভবনে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উভয় পরিবারের অভিভাবকদের কাছ থেকে মামলা না করার শর্তে মুচলেকা নিয়ে কিশোরী ও অভিযুক্ত যুবককে নিজ নিজ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগ কি গ্রাম্য সালিশে মীমাংসাযোগ্য? অপহরণের পর কয়েক দিন কিশোরী অভিযুক্তের সঙ্গে থাকার দায়ভার কার?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কিশোরীর এক স্বজন জানায়, তারা পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন এবং সালিশের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করা হয়েছে। তার দাবি, কিশোরীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে, যার দায়ভার কে নেবে? এ ঘটনায় মানবাধিকার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এ ব্যপারে তানোর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘অপহরণের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’
অপরদিকে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম মোল্লা বলেন, ‘এটি আনুষ্ঠানিক সালিশ নয়। দুই শিশুর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে উভয় পরিবারের সম্মতিতে মামলা না করার শর্তে মুচলেকা নিয়ে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
রাজশাহী সহকারী জজ আদালতের এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জানায়, ‘অপহরণ বা অপহরণের চেষ্টা আপোষযোগ্য অপরাধ নয়। এ ধরনের ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি, অন্যথায় সমাজে অপরাধের প্রবণতা বাড়বে।’
এদিকে পুলিশ জানায়, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধ কোন ক্ষমতাবলে মীমাংসা করা হলো তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার ঝড় উঠেছে।’
কেকে/বি