আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বেড়ে চলেছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। ভোটের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই খুনোখুনি, দখল ও চাঁদাবাজিসহ অপরাধ যেন থামছেই না। ফলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তথ্যমতে- হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশের থানা-ফাঁড়ি ও অন্যান্য নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি লুট করে দুর্বৃত্তরা। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতাদের বাসা থেকে লাইসেন্স করা অস্ত্রও লুট হয়েছে। এই অস্ত্রগুলো পরবর্তীতে হাতবদল হয়ে পেশাদার অপরাধী, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী গ্রুপ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের হাতে চলে যায়।
আর এসব লুট হওয়া অস্ত্র বর্তমানে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং হত্যাকাণ্ডে নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন সন্ত্রাসীদের হাতে এসব অস্ত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যেতে পারে।
তথ্য বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ লুট হয়। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর যৌথ অভিযান শুরু হলেও এখনো পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র। এ ছাড়া গুলিরও ৩০ শতাংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধারবিহীন অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে পিস্তল, রিভলভার, এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল ও শটগান।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম, যশোর, কক্সবাজার, খুলনা, পাবনা, গাজীপুর ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। প্রার্থীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে একধরনের উদ্বেগ।
গোপালগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানীর একটি ভিডিও থেকে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। গত ৭ জানুয়ারি কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মতবিনিময়কালে এই প্রার্থীকে গায়ে থাকা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট প্রদর্শন করতে দেখা যায়। চাদর সরিয়ে পাঞ্জাবির বোতাম খুলে ভেতরে পরা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখিয়ে এস এম জিলানী বলেন, ‘আমাদের জীবনের হুমকি আছে, এটা সত্য। দেখেন, এখনো বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে আছি। জানি না কখন কী হয়, তাই সতর্ক থাকি।’
বিদ্যমান বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে ইতিমধ্যে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ২০ জন নেতা।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘লুণ্ঠিত অস্ত্রের বড় অংশই উদ্ধার হয়েছে। এখনো যেসব অস্ত্র উদ্ধারের বাইরে রয়েছে, সেগুলো উদ্ধারে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। কারও কাছে অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে কোনো খবর থাকলে তা পুলিশকে জানানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, থানা-ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র যত বেশি সময় উদ্ধারের বাইরে থাকবে, আইনশৃঙ্খলার জন্য চ্যালেঞ্জও তত বাড়বে। এখনো বড়সংখ্যক অস্ত্র-গুলি উদ্ধার হয়নি। লুট হওয়া অস্ত্র গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার না হওয়া জননিরাপত্তা, নাগরিক নিরাপত্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এর এক ধরনের প্রভাব পড়ার যথেষ্ট শঙ্কা আছে। কারণ, টার্গেট কিলিং বা সংঘাত-সহিংসতায় এ ধরনের উপকরণ দিয়ে পরিস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি হয়। এ ধরনের অস্ত্র যত দীর্ঘ সময় উদ্ধারের বাইরে থাকবে ঝুঁকির মাত্রাও তত বাড়বে। তাই অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
উল্লেখ্য তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। পরে ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নতুন বছরেও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার থেমে নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা ধারণা করছেন, এসব অস্ত্রের মধ্যে থানা-ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও রয়েছে।
গত ২ জানুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের এমডি মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় একদল সন্ত্রাসী। চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নির্দেশে তার সহযোগীরা এ ঘটনা ঘটায়।
এর আগের দিন ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং নগর বিএনপির সাবেক সদস্য ছিলেন।
২৯ ডিসেম্বর রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে দুর্বৃত্তরা পারভেজ নামে এক যুবদল কর্মীকে পেটানোর পর ফাঁকা গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। ৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে একই উপজেলার রাউজানে জানে আলম সিকদার নামে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলটি ছিল পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে। একই দিন সন্ধ্যায় যশোরের মণিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক বরফকল ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
গত ৯ ডিসেম্বর কক্সবাজার শহরের বাইপাস সড়কে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা হেলমেট পরে এসে মোহাম্মদ ফারুক নামে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে। পরে ২৮ ডিসেম্বর ভোরে তার মৃত্যু হয়। ২২ ডিসেম্বর খুলনার সোনাডাঙ্গায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রমিক সংগঠনের এক কেন্দ্রীয় নেতা মোতালেব শিকদার গুলিতে নিহত হন।
১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মহানগরের পাঁচলাইশের হামজারবাগ এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের মালিকের কাছে ৮০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। চাঁদা না পেয়ে তারা দিনদুপুরে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঘটনাস্থলে আসা তিন সন্ত্রাসীর দুজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
১৭ ডিসেম্বর পাবনার ঈশ্বরদীতে জমি সংক্রান্ত বিরোধে প্রতিপক্ষের গুলিতে বীরু মণ্ডল নামে এক বিএনপি নেতা নিহত হন। ১৩ নভেম্বর রাতে গাজীপুরের টঙ্গীর আনারকলি রোড এলাকায় এক বিকাশ কর্মীকে গুলি করে ১৪ লাখ টাকা ছিনতাই করা হয়। ১১ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমাকালেঙ্গা সংরক্ষিত বনে দুর্বৃত্তরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে বনপ্রহরীদের ভয় দেখিয়ে ২০-২৫টি গাছ কেটে নিয়ে যায়।
সর্বশেষ রাজধানী ঢাকায় জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রভাবশালী নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বিরসহ দুজনকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। এতে ওই স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত হন। গত বুধবার রাত আটটার দিকে কারওয়ান বাজারে বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের পেছনে এ ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার দুপুরে গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি করে তার মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পান।
কেকে/ এমএস