মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
এলপিজির অগ্নিমূল্য : দায় কার, সমাধান কোথায়?
হাবিব আল মিসবাহ
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:৩২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

শীতের সকালে চায়ের কেটলিটা চুলায় চড়িয়ে যখন দেখলেন আগুন জ্বলছে না, তখন নাগরিক মধ্যবিত্তের কপালে যে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, তা শুধু রান্নার চিন্তা নয়, তা হলো পকেটের চিন্তা। ২০২৬ সালের শুরুতেই বাংলাদেশ আবারও দেখছে সেই পুরোনো ও তিক্ত চিত্র। তবে এবারের সংকট যেন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। 

এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ধর্মঘটের ডাক, সিলিন্ডার সংকট তৈরি হয়েছে চরম আকার, আর ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, এ সংকট যতটা না ‘সরবরাহের’, তার চেয়ে অনেক বেশি ‘ব্যবস্থাপনার’ এবং ‘বাজার কাঠামোর গভীর দুর্বলতার’। 

কৃত্রিম সংকট নাকি পলিসির সীমাবদ্ধতা? সরকারের জ্বালানি বিভাগ ও উপদেষ্টারা বিভিন্ন বক্তব্যে জোর দিয়ে বলছেন যে, দেশে এলপিজির কোনো ঘাটতি নেই। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে আমদানির পরিমাণ চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট ছিল। তবে জনমনে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, দেশে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ সিলিন্ডারের বিশাল সম্ভার থাকলেও কেন মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার রিফিল হচ্ছে? বাকি বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার কেন অলস পড়ে আছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। 

এখানেই সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘কৃত্রিম সংকট’ হিসেবে অভিহিত করার অবকাশ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের দাবি, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, তাতে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে, খুচরা ও ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে যে কমিশন বা মার্জিন ধরা হয়, তা বর্তমান পরিবহন ব্যয় এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে তৈরি হওয়া বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ‘কোম্পানিগুলো নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি রাখছে, যার চেইন রিঅ্যাকশন পড়ছে খুচরা বাজারে।’ ফলে সরকার, আমদানিকারক কোম্পানি এবং ডিলারদের এ ত্রিভুজমুখী সংকটের বলি হচ্ছেন প্রান্তিক ভোক্তারা। 

বিইআরসি’র ভূমিকা : কার্যকর তদারকির চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয়। কাগজে-কলমে জানুয়ারি মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, রাজধানীসহ দেশের কোথাও এই দামে সিলিন্ডার মেলা ভার। অধিকাংশ জায়গায় সাধারণ মানুষকে ১ হাাজর ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। বিইআরসি’র এ দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন। 

শক্তিশালী এবং মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় নির্ধারিত দামের সুফল সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছাচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, বাজারব্যবস্থার তদারকিতে বড় ধরনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি রয়েছে, যার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র। নিয়ন্ত্রণ সংস্থা যদি শুধু দাম ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং প্রয়োগে ব্যর্থ হয়, তবে সেই নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বাজার কাঠামো ও ‘অলিগোপলি’র ঝুঁকি বাংলাদেশে এলপিজি আমদানির লাইসেন্স অনেক কোম্পানির থাকলেও বর্তমানে গুটিকয়েক বড় কোম্পানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। 

সাম্প্রতিক ডলার সংকট ও এলসি  খোলার জটিলতায় ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলো বাজার থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছে। এর ফলে বাজার কাঠামোতে একটি ‘অলিগোপলি’ বা মুষ্টিমেয় বিক্রেতার প্রভাব তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, যখন একটি অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠানের কবজায় চলে যায়, তখন সেখানে ‘মার্কেট ম্যানিপুলেশন’ বা সিন্ডিকেট করার এক ধরনের স্বাভাবিক সুযোগ তৈরি হয়। সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম অভাব দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়ার এ প্রবণতা সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী করছে কি না, তা অত্যন্ত নিবিড় তদন্ত সাপেক্ষ। তবে বর্তমান ভঙ্গুর বাজারব্যবস্থা যে তাদের সেই অনৈতিক সুযোগ করে দিচ্ছে তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। প্রতিযোগীহীন বাজারে ভোক্তার অধিকার সবসময়ই ঝুঁকিতে থাকে।

পাইপলাইনের গ্যাসের সংকট এলপিজির চাহিদাকে আকাশচুম্বী করেছে। অথচ এ বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে একদল সুযোগ সন্ধানী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠছে। অতীতেও দেখা গেছে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জরিমানা করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, কিন্তু তা সাময়িক উপশম ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারেনি। এলপিজি খাতের পুরো ভ্যালু চেইনে অর্থাৎ ইম্পোর্টার থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে রিটেইলার পর্যন্ত স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। কত টাকায় আমদানি হচ্ছে, কত টাকায় বোতলজাত হচ্ছে এবং ডিলাররা কত টাকায় পাচ্ছে, এ তথ্যগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে উন্মুক্ত না থাকা পর্যন্ত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন। সমাধানের পথ কোন দিকে? ভোক্তা হিসেবে সাধারণ মানুষ আর কতদিন এ দোলাচলে থাকবে? সংকট নিরসনে সরকারকে শুধু সাময়িক ‘জরিমানা’ বা ‘হুমকি’র পথে হাঁটলে চলবে না। একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান এখন সময়ের দাবি। 

খুচরা ব্যবসায়ী ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কমিশন কাঠামো বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিরপেক্ষ কারিগরি কমিটির মাধ্যমে যাচাই করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে হবে। কোম্পানিগুলো ফ্যাক্টরি গেটে ডিলারদের কাছে কত দামে বিক্রি করছে, তার রিয়েল টাইম ডিজিটাল মনিটরিং থাকা জরুরি। সিলিন্ডারে কিউআর কোড বা ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বচ্ছ করা যেতে পারে। বাজার যাতে মুষ্টিমেয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে জিম্মি না থাকে, সেজন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজিএল বা টিসিবির মাধ্যমে সরকারি এলপিজি সরবরাহের পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। 

সরকারি সরবরাহ শক্তিশালী থাকলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো একচেটিয়া সুযোগ নিতে পারবে না। ছোট আমদানিকারকদের এলসি জটিলতা দূর করে বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। গ্যাস সিলিন্ডার এখন আর কোনো বিলাসদ্রব্য নয়, এটি কোটি মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার অংশ। রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো এ বাজারব্যবস্থাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের পকেট কাটার সুযোগ না পায়। চুলা না জ্বলার হাহাকার বন্ধ হোক এবং সিলিন্ডার সংকটের এ দীর্ঘস্থায়ী বেড়াজাল থেকে মানুষ মুক্তি পাক, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close