মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নির্বাচিত সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
অর্জিতা সূত্রধর
প্রকাশ: রোববার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:১৫ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে কিছু সূচকে উন্নতির ইঙ্গিত মিললেও বাস্তব অর্থনীতিতে তার প্রতিফলন স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি সরকার জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আগের বছরের তুলনায় এতে সামান্য উন্নতি হলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য ও কর্মসংস্থান চাহিদার তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি যে অপর্যাপ্ত, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে অর্থনীতির এই পরিসংখ্যানের বাইরে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা আরও ভিন্ন কথা বলছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে; সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ ইত্যাদিও বৃদ্ধির খাতায়। সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের। এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ এবং তাদের কাছে দৈনন্দিন ব্যয় সামলানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

দেশের মধ্যে দারিদ্র্যের চিত্রও ভয়াবহ। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশের দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সূচকের ওঠানামার আড়ালে বাস্তবে মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার কেবল কমছে না, বরং রাজস্ব ও কর্মসংস্থান ঘাটতির কারণে ক্রমশ নিচের দিকে ধাবমান। বিশ্বব্যাংক জানায়, দিনদিন দারিদ্র্য আরও বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে আরও নিম্ন আয়ের ঘরে মানুষের সংখ্যা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সুতরাং, কর্মসংস্থান না বাড়লে এবং আয় স্থিতিশীল না হলে দারিদ্র্য কমানোর প্রচেষ্টা যে কাগুজে হিসাবেই আটকে থাকবে, এতে আর সন্দেহ নেই।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে, যা তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সামলাতে সহায়তা করছে, তবে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে কাক্সিক্ষত গতি না এলে একে অর্থনীতির স্থায়ী ভরসা বলা কঠিন। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে সংকটের মূল জায়গাটি আরও গভীরে। বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ সমস্যার সমন্বয়ে দেশীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অথচ তার পরেও, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কিছু ব্যবস্থাপনা সমস্যা এখনো নিস্তেজ হয়ে আছে। ফলস্বরূপ, প্রাইভেট খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম এবং বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে, যা শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি বন্ধ করে দিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডি’স ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে ‘নেগেটিভ আউটলুক’ বা নেতিবাচক পূর্বাভাসের আওতায় রেখেছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে।

বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাতও প্রত্যাশিত শক্তি দেখাতে পারছে না। বৈশ্বিক বাজারে শুল্ক, অন্যান্য বাধা এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসী অবস্থানের কারণে রপ্তানি আয় চাপের মধ্যে রয়েছে। রপ্তানি যখন স্থবির হয়, তখন উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়। আর এই বাস্তবতাই এখন বাংলাদেশ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। অথচ ভেবে দেখলে, এই রপ্তানি খাত আমাদের দেশজ অর্থনীতির প্রাণ। গত বছর রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও তা এখনো লক্ষ্যমাত্রার নিচে আছে এবং ক্রমশ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপও বাড়ছে। নতুন বছরেও রপ্তানি খাত তার কাক্সিক্ষত গতি অর্জন করতে পারছে না।
 
বৈশ্বিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা রপ্তানি আয়কে চাপে রাখছে। একই সঙ্গে রপ্তানির পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতের বাইরে নতুন রপ্তানি খাত গড়ে না উঠলে বৈদেশিক আয়ের প্রবাহ দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চিত থেকে যাবে। বৈদেশিক বাণিজ্যে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকায় রপ্তানি খাতের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য এক জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। 

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের আমদানি খাতও বর্তমানে অর্থনীতির ওপর স্পষ্ট চাপ সৃষ্টি করছে। শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও খাদ্যপণ্যে উচ্চ নির্ভরতার কারণে আমদানির পরিমাণ এখনো বড়; অথচ রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গতি সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ অব্যাহত রয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য, বিনিময় হার অস্থিরতা এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এই চাপ আরও বাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আমদানি সচল রেখে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং রপ্তানি আয়ের মধ্যে আমদানি ব্যয়ের ভারসাম্য আনয়নে ভবিষ্যৎ সরকারকে বেশ বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।

দেশের অর্থনীতির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্ব আহরণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আদায়ের হার এখনো তুলনামূলকভাবে কম। আবার, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের সংকট। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ হার কমছে, কিছু খাতে চাকরি হারানোর প্রবণতা বাড়ছে; সেই সাথে তরুণদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না বললেই চলে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, কর্মসংস্থান হার নেমে এসেছে ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশে, যা ভবিষ্যৎ জনশক্তি ব্যবস্থাপনার জন্য বেশ উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতির সংখ্যার বাইরে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা। শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়। রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করা, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কার্যকর নীতি গ্রহণই হতে হবে সরকারের মূল লক্ষ্য।

নতুন সরকারের জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, সেগুলো নিঃসন্দেহে বহুস্তরীয় ও জটিল। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, নবনির্বাচিত সরকারকে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ সংকোচন, আমদামি-রপ্তানি চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ হ্রাস, দারিদ্র্য ও জ্বালানি-পরিবেশগত ঝুঁকি সব একসঙ্গে সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তবে যথার্থ নীতিমালা প্রণয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন, শক্তিশালী প্রশাসন গঠন ও সুষ্ঠু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সবকিছু যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব। বিশেষ করে যদি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে এটি দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটি ঐতিহাসিক সময় হতে পারে। 

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের উন্নয়ন আর কোনো একক খাতের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। যেহেতু অর্থনীতির প্রতিটি খাত পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, সেহেতু কোনো একটি খাতে দুর্বলতা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে তা পুরো ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে। ফলে নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে নীতিগত ঘোষণার চেয়ে বাস্তব বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর ও ধারাবাহিক হয় তার ওপর। এই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।

আমাদের দেশের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ফাঁক অর্থনীতির কার্যকারিতাকে বারবার দুর্বল করে দেয়। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কাগজে-কলমে সংস্কারের ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন সীমিত। প্রশাসনিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং দায়িত্ব নির্ধারণে অস্পষ্টতা বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বাজেট বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সংকুচিত করছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটাতে কেবল নতুন নীতি নয়, বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকর সংস্কার জরুরি। 

সুতরাং, পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, বরং তার সঠিকভাবে বাস্তবায়নই এখন মূল পরীক্ষা। দেশের আগামী সরকার যদি শক্ত হাতে এই কঠিন পরীক্ষা মোকাবিলা করে উত্তীর্ণ না হতে পারে, তবে উন্নয়ন শব্দটি কেবল পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়েই থেকে যাবে।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close