মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিশ্বনেতাদের জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর       কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে দুর্ভোগে না পড়ে : সমাজকল্যাণমন্ত্রী      রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ      হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      
দেশজুড়ে
রাখাইন থেকে ছোঁড়া গুলিতে শিশু গুলিবিদ্ধ, টেকনাফজুড়ে আতঙ্ক
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৮:১৮ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

মিয়ানমার রাখাইন সীমান্তে টানা চারদিন ধরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপ ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে ছোড়া গুলিতে টেকনাফের এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। 

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা টেকনাফ-কক্সবাজার হাইওয়ে সড়ক অবরোধ করেন। পরে সেনাবাহিনীসহ যৌথবাহিনীর হস্তক্ষেপে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। একই সময় এপারে আরও একাধিক গুলি এসে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্তে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির বিকট শব্দে এপারের বাড়িঘর কেঁপে উঠছে। এ অবস্থায় টেকনাফজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

রোববার (১১ জানুয়ারি) হোয়াইক্যংয়ের সীমান্তবর্তী তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় বাড়ির উঠানে খেলার সময় মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে শুরুর আহত হন ১১ বছর বয়সী হুজাইফা সুলতানা আফনান। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। শিশুটির চাচা শওকত আলম খোলা কাগজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ


শিশুটি টেকনাফের হোয়াইক্যং ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জসিম উদ্দিনের মেয়ে। সে হোয়াইক্যং লম্বাবিলের হাজ্বী মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

তেচ্ছিব্রিজ এলাকার বাসিন্দা ও গুলিবিদ্ধ শিশুর পিতা জসিম উদ্দিন বলেন, “রোববার সকালে আমার মেয়ে তানজিনা আফরান বাড়ির উঠানে খেলছিল। এ সময় হঠাৎ করে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া একটি গুলি এসে তার মাথায় লাগে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।”

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, “মিয়ানমার সীমান্তে টানা কয়েকদিন ধরে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনায় সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছে। রোববার সকালে সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এপারে একাধিক গুলি এসে পড়ার বিষয়টি আমরা প্রশাসনকে অবহিত করেছি। সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারসহ সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”

ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ


অপরদিকে জানা গেছে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের জেরে যুদ্ধ এলাকা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপের ৫৩ জনকে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত থেকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আটক রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরাকান আর্মি মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল বলে জানা গেছে। 

এ বিষয়ে হোইয়ক্যাং ইউনিয়নের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল জানান, “হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ এলাকার হুজাইফা সুলতানা আফনান নামের এক শিশুর গুলিবিদ্ধের খবর পেয়েছি। গুলিতে গুরুতর আহত শিশুটি মারা যায়নি। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম নেয়া হচ্ছে।”

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম জানান, “সীমান্তে চলমান গোলাগুলির কারণে এপারে ছোড়া গুলি এসে শিশু আহত হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্ত গোলাগুলির ঘটনায় এপারে ফায়ারের শব্দ আসে। এ ঘটনায় সীমান্তের বাসিন্দাদের সর্তক থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় থাকতে বলা হয়েছে এবং বিজিবির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।”

হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা লিয়াকত হোসেন বলেন, “টানা চারদিন ধরে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে ড্রোন হামলা ও গোলাগুলির ঘটনায় আমরা এপারের বাসিন্দারা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। দিন-রাত বিস্ফোরণের শব্দে আমাদের বাড়িঘর কেঁপে উঠছে। রোববার দুপুর পর্যন্তও গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে।”

এদিকে হোয়াইক্যং সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, “গত বুধবার রাত থেকে টানা চার দিন হোয়াইক্যং সীমান্তে ব্যাপক গোলাগুলি ও ড্রোন বিস্ফোরণের শব্দে ঘুমাতে পারিনি। রাখাইনের হোয়াইক্যং সীমান্তের খুব কাছ থেকেই এসব গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসে। রাখাইন থেকে ছোড়া গুলিতে হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় এক শিশু গুরুতর আহত হন।”

ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ


উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ চলছে। সেখানে আরাকান আর্মির সঙ্গে আরসা, আরএসও ও (এআরএ) নবী হোসেন গ্রুপের মধ্যে চলমান গোলাগুলির প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায়। এরই মধ্যে চলমান সংঘাতের জেরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় টেকনাফ সীমান্ত থেকে ৫৩ জনকে আটক করা হয়েছে।

রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে ও দুপুরের সময় টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। আটকরা মিয়ানমারের নাগরি এবং তারা সংঘাতে অংশ নেওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য বলে জানা যায়।

এদিকে আটক ব্যক্তিরা জানান, মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্তে আরাকান আর্মির সঙ্গে কয়েকদিন ধরে চলমান সংঘাতের কারণে সেখানে যুদ্ধে টিকতে না পেরে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে তারা টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়ে। আরাকান আর্মি সংঘর্ষে ড্রোন হামলা ও ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণ করছে।

হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই খোকন কান্তি রুদ্র জানান, “মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় ৫৩ জনকে আটক করা হয়েছে তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রসঙ্গত, গত কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ চলছে। সেখানে আরাকান আর্মির সঙ্গে আরসা, আরএসও ও নবী হোসেন গ্রুপের মধ্যে চলমান গোলাগুলির প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায়। এতে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। 

গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যার দিকে নাফ নদীর হোয়াইক্যং এলাকায় মাছ ধরার সময় জেলে মো. আলমগীর গুলিবিদ্ধ হন। তিনি বর্তমান চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর আগেও একাধিকবার বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর থেকে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে থেকেই কিছু রোহিঙ্গা ছিল, কিন্তু ২০১৭ সালের পর থেকে এই সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যায়, যা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী সংকটে পরিণত হয়।

যা বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে। যেটা মানবিক সংকট তৈরি করেছে এবং কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলে বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। সীমান্ত এখনও কঠোর নজরদারিতে থাকলেও, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে নতুন করে শরণার্থীর আগমন ও প্রত্যাবাসনের জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে, যদিও বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ করছে। 

২০১৭–২০১৮ সালে চাপ ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে, কয়েক লাখ রোহিঙ্গার ঢল নামায় সীমান্ত পুরোপুরি চাপে পড়ে। সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। মানবপাচার, মাদক (ইয়াবা) প্রবেশ বেড়ে যায়। সীমান্ত এলাকায় সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বাড়ে।

২০১৯–২০২০ সালে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে বিজিবি, সেনাবাহিনী, কোস্ট গার্ডের টহল জোরদার। সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, চেকপোস্ট ও ক্যাম্প শক্তিশালী করা হয়। ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান বাড়ে। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধী চক্র সক্রিয় হতে থাকে।

২০২১–২০২২ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গ্রুপ ও সন্ত্রাসী তৎপরতা। খুন, অপহরণ, ডাকাতি বৃদ্ধি। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে শুরু করে। মাঝেমধ্যে গোলাগুলির শব্দ ও গোলা পড়ার ঘটনা ঘটে।

২০২৩ সালে মিয়ানমারে জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী (বিশেষ করে আরাকান আর্মি) সক্রিয়। সীমান্তের ওপারে নিয়মিত সংঘর্ষ, গোলাবর্ষণের শব্দ। কিছু গোলা ও গুলি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে পড়ে। জেলে অপহরণ, সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে ছিল।

বর্তমান সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার আছে, কিন্তু ঝুঁকি পুরোপুরি এখনো কমেনি। সীমান্ত এলাকার মানুষ এখনও আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। 

কেকে/এজে


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close