মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায়। গোলাগুলি, ড্রোন হামলা ও শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে সীমান্তবর্তী জনপদ। সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে একের পর এক আহতের ঘটনা ঘটলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না অন্তর্বর্তী সরকারকে। এতে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত কয়েক দিন ধরে টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় কার্যত আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশেষ করে রাত নামলেই গোলাগুলির শব্দ, আকাশে ড্রোনের আনাগোনা এবং বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
এরই মধ্যে টানা চার দিন ধরে চলমান গোলাগুলির মধ্যে গতকাল রোববার সকালে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বাড়ির উঠানে খেলতে থাকা ১১ বছর বয়সি শিশু হুজাইফা সুলতানা আফনান মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হয়। মাথায় গুলি লাগায় প্রথমে তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সে স্থানীয় হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।
একই সময় সীমান্তের এপারে আরও একাধিক গুলি এসে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে সেনাবাহিনীসহ যৌথবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
এদিকে রাখাইন রাজ্যে এখনো সশস্ত্র সংঘর্ষ চলমান রয়েছে। সেখানে আরাকান আর্মির সঙ্গে আরসা, আরএসও এবং এআরএ নবী হোসেন গ্রুপের মধ্যে চলমান লড়াইয়ের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তে। চলমান সংঘাতের জেরে অনুপ্রবেশের সময় টেকনাফ সীমান্ত থেকে ৫৩ জনকে আটক করা হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ও দুপুরে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিরা মিয়ানমারের নাগরিক এবং সংঘাতে অংশ নেওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য বলে জানা গেছে। আটকরা জানান, আরাকান আর্মির ড্রোন হামলা ও ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণের কারণে যুদ্ধে টিকতে না পেরে তারা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।
গুলিবিদ্ধ শিশুর বাবা জসিম উদ্দিন খোলা কাগজকে বলেন, রোববার সকালে আমার মেয়ে তানজিনা আফরান বাড়ির উঠানে খেলছিল। এ সময় হঠাৎ করে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া একটি গুলি এসে তার মাথায় লাগে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু খোলা কাগজকে বলেন, মিয়ানমার সীমান্তে টানা কয়েকদিন ধরে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনায় সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছে। রোববার সকালে সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এপারে একাধিক গুলি এসে পড়ার বিষয়টি আমরা প্রশাসনকে অবহিত করেছি। সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারসহ সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে হোইয়ক্যাং ইউনিয়নের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল জানান, হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ এলাকার হুজাইফা সুলতানা আফনান নামের এক শিশুর গুলিবিদ্ধের খবর পেয়েছি। গুলিতে গুরুতর আহত শিশুটি মারা যায়নি। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম নেওয়া হচ্ছে।
হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই খোকন কান্তি রুদ্র জানান, মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় ৫৩ জনকে আটক করা হয়েছে তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম জানান, সীমান্তে চলমান গোলাগুলির কারণে এপারে ছোড়া গুলি এসে শিশু আহত হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্ত গোলাগুলির ঘটনায় এপারে ফায়ারের শব্দ আসে, এ ঘটনায় সীমান্তের বাসিন্দাদের সর্তক থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় থাকতে বলা হয়েছে এবং বিজিবির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে থেকেই কিছু রোহিঙ্গা ছিল, কিন্তু ২০১৭ সালের পর থেকে এ সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যায়, যা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী সংকটে পরিণত হয়। যা বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, যেখানে রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, যা মানবিক সংকট তৈরি করেছে এবং কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলে বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। সীমান্ত এখনো কঠোর নজরদারিতে থাকলেও, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে নতুন করে শরণার্থীর আগমন ও প্রত্যাবাসনের জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
কেকে/ এমএস