আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা তত বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলা, গুলি, হত্যা, বিস্ফোরণ, মব সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারসহ, পাল্টা সংঘর্ষের একের পর এক ঘটনা নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে।
নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই গুলি করে অন্তত চারটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে নির্বাচনি জনসংযোগে হামলা, গুলি হয়েছে। সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে।
গত শুক্রবার নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ভোলার লালমোহনে জামায়াত বিএনপির কর্মীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে এতে ৩০ জনের ও বেশি আহত হন। একই দিনে হাতিয়ায় বিএনপি ও এনসিপির সংঘর্সে অন্তত ১০ জনের মতো আহত হন। সিলেটের নির্বাচনি পরিবেশ অত্যন্ত উত্তপ্ত। সিলেটে প্রায়ই লুট হওয়া অস্ত্র এবং ভারতীয় সীমান্তু দিয়ে আসা অস্ত্র নিয়ে মহরা দিতে দেখা যায় দুর্বৃত্তদের। সম্প্রতি সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকায় দেখা গেছে এ ঘটনা। এমনকি সেখানে মরণঘাতী অত্যাধুনিক এম-১৬ অস্ত্রও রয়েছে। এ অবস্থায় আগামী জাতীয় নির্বাচনে নাগরিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নাগরিক সমাজ।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগের। গত এক বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালে এক বছরেই সারা দেশে ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩জন নিহত হয়েছে। আর এতে আহত হয়েছে সাড়ে সাত হাজারেও বেশি মানুষ। এসময় মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে অন্তত ১৬৮ জন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন মাত্র এক মাস পরে। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিকল্প নেই।
এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তার শঙ্কা দূর করতে হবে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, ভয়হীন নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। গতকাল ইসির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠক শেষ হয়েছে। সেখানে নির্বাচনের নির্বাচনের নিরাপদ পরিবেশ যাতে বিঘ্নিত না হয় সে বিষয়ে সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে ইসি।
আমরা আশাবাদী তবে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বারবার আশ্বাস দিলেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, প্রার্থীদের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে প্রচারণায় নামা এবং রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে ভয় ও অনিশ্চয়তা এখন নির্বাচনি পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণের অবাধ ও নির্ভীক ভোটাধিকার। কিন্তু যখন ভোটের আগে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্ক ও সহিংসতার ভয় বাসা বাঁধে, তখন সেই গণতন্ত্রই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বন্ধ করা এখন শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশাসন এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার বড় পরীক্ষা।
নির্বাচনের আগে সবচেয়ে জরুরি হলো অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মব সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ অভিযান এবং সব রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যথায়, সহিংসতার কড়াল গ্রাসে নির্বাচনের নিরাপদ পরিবেশ বিঘ্নিত হবে যা দেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করবে যার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ জনগণকেই।
কেকে/ এমএস