নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে সামনে রেখে সংঘটিত হয়েছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান। প্রত্যাশা ছিল- রাজনীতিতে সুবাতাস বইবে, বাড়বে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, কমবে প্রতিহিংসা-বিদ্বেষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রত্যাশা অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার লোভে আবারো রাজনীতি হচ্ছে কলুষিত। রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ছড়ানো হচ্ছে নানা ধরনের কুৎসা, রটানো হচ্ছে নোংরা অপপ্রচার। এমনকি অকথ্য ভাষায় গালাগালিও করা হচ্ছে। এসব অপপ্রচার ও বিদ্বেষ অফলাইনের চেয়ে অনলাইনে বা ডিজিটাল মিডিয়ায় আরও বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে যত দিন যাচ্ছে, রাজনীতিতে নোংরামি ও প্রতিহিংসা ততই বাড়ছে, আর সুস্থ রাজনীতির প্রত্যাশা দিনদিন ফিকে হয়ে আসছে।
গত কয়েক দিনে নানা ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংঘবদ্ধ কিছু চক্র পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের টার্গেট করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে- রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মতে, দলগুলোর উচিত দ্রুত মতপার্থক্য কমিয়ে আনা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগোনো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, রাজনীতি কখনোই বিরোধমুক্ত নয়। গণতান্ত্রিক দেশে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকবে, আর বহু দল থাকার অর্থই বহু মত ও পথের অস্তিত্ব। স্বাভাবিকভাবেই মতের পার্থক্য থাকবে। তিনি বলেন, মতপার্থক্যকে অযথা বড় করে দেখার কিছু নেই। তবে এ মুহূর্তে যে ধরনের মতপার্থক্য দেখা দিচ্ছে, তা না থাকলেই ভালো হতো। এসব মতপার্থক্যের কারণে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে- এমন আশঙ্কা রয়েছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত যত দ্রুত সম্ভব এই পার্থক্যগুলো কমিয়ে আনা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠে অনৈক্যের সুর ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। ভোটের হিসাব-নিকাশ যত সামনে আসছে, বিরোধ ততই প্রকাশ্যে রূপ নিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভোটের অধিকারসহ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে যারা রাজপথে একসঙ্গে ছিলেন, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তারা এখন একে অপরকে নিশানা বানাচ্ছেন। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত সফল গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী সমন্বয়কদের সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও বিরোধের চিত্রও স্পষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও একে অপরকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দিচ্ছে। যদিও স্বৈরাচারী হাসিনাবিরোধী টানা ১৫ বছরের আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াতসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ধরনের অবদান ও ত্যাগ ছিল।
এদিকে এমন বৈরী ও উত্তপ্ত সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে কেউ কেউ বিশেষ ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে- এমন ধারণা অনেকের। ইতোমধ্যে দলের অনেক পলাতক নেতা বিদেশে অবস্থান করে বিভিন্ন মাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছেন।
এরইমধ্যে গত শনিবার সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সব রাজনৈতিক পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেটি যেন কোনোভাবেই মতবিভেদ বা জাতিকে বিভক্ত করার পর্যায়ে না যায়। ৫ আগস্টে আমরা দেখেছি, এর পরিণতি কী হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্ম আশার খোঁজে আছে, আর সব প্রজন্মই একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা নয়। এমন সমালোচনা চাই, যা দেশের সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে।’ দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর কয়েকটি স্থানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, রাজনীতিবিদদের ওপর দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক এবং সব প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব না হলেও রাষ্ট্রকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া তাদের দায়িত্ব।
এ সময় তারেক রহমান জানান, দেশের প্রায় দেড় কোটি কৃষকের জন্য ‘অ্যাগ্রি কার্ড’ চালুর একটি ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা ২০ কোটি মানুষের খাবারের সংস্থান করছে, সেই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো ভেন্যু নেই। তাদের সমস্যাগুলো আমাদেরই জানতে হবে।’ পাশাপাশি নারীশিক্ষায় মা ও দেশের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সরকার গঠন করতে পারলে শিক্ষিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় কমাতে প্রিভেনশন মডেল অনুসরণের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, মানুষকে সচেতন করা গেলে- কোনো খাবার না খেলে কিডনি, হার্ট বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে- তাহলে রাষ্ট্রের ব্যয়ও কমবে, মানুষও সুস্থ থাকবে। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
কেকে/ আরআই