মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষ এখন আর কেবল প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয় এর প্রত্যক্ষ অভিঘাত পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তে। টেকনাফ-হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি, ড্রোন হামলা ও বিস্ফোরণের শব্দে জনজীবন বিপর্যস্ত। সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে ৯ বছর বয়সি এক শিশুর গুলিবিদ্ধ হওয়া শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতীক।
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রথম ও মৌলিক দায়িত্ব তার নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সীমান্তে ধারাবাহিক গোলাগুলির ঘটনায় আহত ও আতঙ্কিত মানুষের আর্তনাদ উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার এখনো পর্যন্ত কার্যকর কূটনৈতিক চাপ, দৃশ্যমান সামরিক প্রতিরোধ কিংবা সীমান্তবাসীর জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো সুস্পষ্ট উদ্যোগ নিতে পারেনি। ফলত ঝুঁকির মূল্য দিচ্ছে নিরীহ সীমান্তবাসী-বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। রাখাইনে আরাকান আর্মিসহ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতের জেরে নতুন করে অনুপ্রবেশের চেষ্টা, ড্রোন হামলা ও ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণ সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ৫৩ জন অনুপ্রবেশকারী আটক হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে-সীমান্ত শুধু নিরাপত্তা নয়, জাতীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ সরকারের প্রতিক্রিয়া সীমিত থেকেছে ‘সতর্ক থাকতে বলা’ বা ‘যোগাযোগ রাখা হচ্ছে’-এমন আশ্বাসমূলক বক্তব্যে।
২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর যে মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে, তা এখনো বহমান। নতুন করে সংঘাত বাড়লে শরণার্থী আগমন ও প্রত্যাবাসন জটিলতা আরও তীব্র হবে। যার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত শাস্তি বহন করতে হবে বাংলাদেশকেই। অর্থনীতির ভাষায়, এটি রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ দিচ্ছে- জীবন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মাধ্যমে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের নীরবতা বা অকার্যকরতা চলতে পারে না। সীমান্তে শক্তিশালী নজরদারি, প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা এবং সীমান্তবাসীর জন্য জরুরি সুরক্ষা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে- বাংলাদেশের ভূখণ্ডে একটিও গুলি গ্রহণযোগ্য নয়।
ঝুঁকি নিলে তার শাস্তি থাকে-এ কথা অর্থনীতিতে যেমন সত্য, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও তেমনই। প্রশ্ন হলো, সেই শাস্তি কি সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার জন্য সরকার নেবে, নাকি আবারও নিরীহ নাগরিকদেরই তা বহন করতে হবে? সীমান্তে এখনি সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে যার খেসারত দিতে হবে মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্তে সাধারণ মানুষকে।
কেকে/ আরআই