একটি দাবার বোর্ডে শুধু ঘুঁটিগুলোই নড়ে না, খেলোয়াড়দের হিসাবও বদলায়। ইরান আজ তেমনই এক বোর্ড যেখানে জনগণ একটি ঘুঁটি নয়, বরং নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করতে চাওয়া একটি শক্তি। কিন্তু এই বোর্ডে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের পাশাপাশি বাইরের শক্তির হিসাবও সক্রিয়। ফলে ইরানের চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয় বরং এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিরোধে জড়িত। পারমাণবিক কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার এবং ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কারণে ইরান পশ্চিমা শক্তির চাপের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে, এটি একটি স্বীকৃত বাস্তবতা। এই অর্থনৈতিক চাপের ভেতরেই ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জমিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যখন বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই আন্দোলন কতটা স্বতঃস্ফূর্ত, আর কতটা বৈদেশিকভাবে উৎসাহিত তা নিয়ে প্রশ্ন আসে।
ইরান সরকার দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। এই সহায়তা মূলত মিডিয়া সমর্থন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠ জোরদার করা, এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকে বৈধতা দেওয়া, এই পর্যায়ে সীমাবদ্ধ বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইরানের আন্দোলনগুলো ব্যাপকভাবে কাভারেজ পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সরাসরি সামরিক বা সংগঠিত অর্থনৈতিক সহায়তার প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই, তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন অস্বীকার করার সুযোগও কম। এই আন্দোলনের কারণ একমাত্র বিদেশি প্রভাব নয়, এটি বলা যুক্তিসংগত হবে না। অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণেও এমনটি হয়ে থাকে। নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বেকারত্ব মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতার কারণে এমন আন্দোলন হয়। জনগণের একটি অংশ মনে করে, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারছে না। বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক স্বার্থের ফলে আন্দোলন হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ বৈরিতা এই আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় নিয়ে এসেছে এবং পরোক্ষভাবে আন্দোলনকারীদের মনোবল বাড়িয়েছে।
এই আন্দোলনের ফলে ইরানের সমাজে দ্বিমুখী প্রভাব পড়েছে। জনগণের মধ্যে যেমন রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে। মানুষ রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট আলোচনায় আসছে, যা সরকারকে কিছুটা হলেও চাপের মুখে ফেলছে। তেমনি বিক্ষোভ দমনে কড়াকড়ি ব্যবস্থা নেওয়ায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তার, অর্থনৈতিক অস্থিরতা সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ইরান সরকার এই আন্দোলনকে মূলত বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে তারা নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। তবে শুধু দমননীতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব এই ধারণা ইতিহাসে খুব কম ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে স্বীকার করা এবং বৈদেশিক চাপের পাশাপাশি জনগণের বাস্তব দুর্ভোগকে গুরুত্ব দেওয়া।
ইরানের এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ সংলাপ ও সংস্কার। জনগণের দাবি শুনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া এই ক্ষোভ কমবে না। দ্বিতীয়ত, বিদেশনীতি পুনর্মূল্যায়ন। আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলে নিষেধাজ্ঞার চাপও কিছুটা লাঘব হতে পারে। তৃতীয়ত, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের জীবনের বাস্তব সংকটকে গুরুত্ব দিতে হবে। ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনকে শুধু বিদেশি প্ররোচনা বললে বাস্তবতার একাংশ অস্বীকার করা হয়, আবার শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ বললেও পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। সত্যটি মাঝামাঝি ভেতরের ক্ষোভের ওপর বাইরের রাজনীতি প্রভাব ফেলছে। এই সংকটের সমাধান শক্তিতে নয়, বরং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রচিন্তায়। নয়তো দাবার বোর্ডে ঘুঁটি ভাঙবে, কিন্তু খেলাটি শেষ হবে না।
লেখক : তরুণ কলামিস্ট
কেকে/ আরআই