মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের করনীতি কি ব্যবসাবান্ধব?
আমিনুল হক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:৪২ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ন্যায়বিচার, সততা, উদ্যোগ- সমাজের এই তিনটি স্তম্ভ ভাঙলে রাষ্ট্র কেবল রাজস্ব হারায় না; হারায় আস্থা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ। ইতিহাস ও লোককথায় তাই বারবার একটি সতর্ক বার্তা আসে : ভালো কাজ নিয়ন্ত্রণ করলে ভালো কাজ কমে যায়। আজ বাংলাদেশের করনীতি ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সেই বার্তাই যেন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। একটি পুরোনো গল্প, আজকের জন্যও প্রাসঙ্গিক।

কথিত আছে, ন্যায়পরায়ণ শাসক যুলকারনায়েন (Dhul-Qarnayn) একবার আদালত পরিদর্শনে গিয়ে বিস্মিত হন মানুষ খুব কমই বিচার চাইতে আসে। যেন সমাজে বিরোধ কম নয়, কিন্তু ন্যায়বিচারের দ্বারে আসার আগ্রহও কম। এমন সময় একদিন একজন লোক কাজির (বিচারক) কাছে মামলা নিয়ে হাজির হলো। লোকটি বলল, ‘আমি একজনের কাছ থেকে জমি কিনেছি। ঘরের ভিত্তি খুঁড়তে গিয়ে মাটির নিচে স্বর্ণমুদ্রায় ভর্তি একটি পাত্র পেয়েছি। মনে হলো আগের মালিক হয়তো ভুলে রেখে গেছেন। তাই আমি পাত্রটি ফেরত দিতে চাই।’ কিন্তু জমির আগের মালিক বললেন, ‘আমি জমি বিক্রি করেছি। জমির সঙ্গে যা কিছু সম্পর্কিত, সবই এখন ক্রেতার। আমি এটি নিতে পারি না।’ দুই পক্ষই একে অন্যের হক বাঁচাতে চায়- এমন বিরল সততা দেখে কাজি উভয়কে প্রশংসা করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন ‘তোমাদের কি বিবাহযোগ্য ছেলে-মেয়ে আছে?’ জানা গেল, একজনের ছেলে, অন্যজনের মেয়ে আছে। কাজি প্রস্তাব দিলেন তাদের বিবাহ হোক। উভয় পক্ষই রাজি হলো। রায় দিলেন স্বর্ণের পাত্রটি নবদম্পতির সংসার গঠন ও নতুন ঘর তৈরিতে কাজে লাগবে; সমাজকল্যাণেও কিছু ব্যয় হবে। এ রায় শুনে রাজা মন্তব্য করলেন ‘কিছু অংশ রাজকোষে দিলে ভালো হতো।’ কথা পৌঁছালে কাজি দৃঢ়ভাবে বলেন ‘ন্যায়বিচারের রায় যদি রাজকোষের সুবিধা দেখে বদলানো হয়, তবে তা ন্যায়ের পথে বিচ্যুতি; আল্লাহর কাছে তার জবাবদিহি করতে হবে।’

এই গল্পের শিক্ষা হলো রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে সৎ মানুষ ও সৎ উদ্যোগকে শক্তি দেওয়া তাদের সৎ শ্রমের ফলকে রাষ্ট্রীয় সুবিধার নামে কেটে নেওয়া নয়। বাংলাদেশে বাস্তবতা হলো কর যখন সরকারের ‘ঝুঁকিবিহীন লাভ’, সেখানে এটি উদ্যোক্তার জন্য প্রায়শই তার ব্যবসায়িক ঝুঁকির শাস্তি স্বরূপ। পুঁজি, বাজার, প্রতিযোগিতা, সুদের হার, ডলার-চাপ, কাঁচামালের মূল্য, পরিবহন ব্যয় সব মিলিয়ে উদ্যোক্তা লাভের নিশ্চয়তা নিয়ে মাঠে নামে না; নামে সম্ভাবনা নিয়ে। অথচ করনীতি যদি এমন হয় যে সরকার বিক্রির উপরই নিশ্চিত অংশ তুলে নেয়, তখন সরকারের আয় হয় প্রায় ঝুঁকিহীন- আর উদ্যোক্তার ঝুঁকি থেকেই যায় আগের মতোই। ধরা যাক, কোনো ব্যবসায় মোট কর ভার (সরাসরি ও পরোক্ষ মিলিয়ে) কার্যত ১৫ শতাংশ। বাস্তবে বহু খাতে লাভের মার্জিন অনেক সময় ১৫ শতাংশের কম। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা (SME)-যারা সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করে-তাদের লাভের জায়গা খুব সরু। সেখানে কর-ভার যদি লাভকে ছাড়িয়ে যায়, ফল হয় একটাই নতুন বিনিয়োগ থেমে যায়, ব্যবসা সম্প্রসারণের আগ্রহ কমে যায়। অনেকে আনুষ্ঠানিকভাবে না গিয়ে অনানুষ্ঠানিক পথে চলে ফলত কর্মসংস্থান কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে কর আদায়ের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়।

আরও বড় সমস্যা হলো, কর দেওয়ার পরও যখন মানুষ দেখে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দক্ষতা কম, অপচয় বেশি, সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা দুর্বল তখন করকে ‘সমাজ গড়ার বিনিয়োগ’ না ভেবে ‘শাস্তি’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। অর্থনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস করের হার নয়; করের প্রতি আস্থাহীনতা। করনীতির মূল প্রশ্ন : রাজস্ব বাড়ানো নাকি অর্থনীতি বড় করা? রাষ্ট্রের রাজস্ব দরকার, এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু রাজস্ব বাড়ানোর পথ কি এমন হওয়া উচিত, যাতে যারা কাজ করে, উৎপাদন করে, চাকরি তৈরি করে- তাদেরই সবচেয়ে বেশি নিরুৎসাহিত করা হয়?

আধুনিক অর্থনীতিতে করনীতির লক্ষ্য কেবল টাকা তোলা নয়; লক্ষ্য হলো অর্থনীতির আকার বড় করা, যাতে করের ভিত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে। যে করনীতি ব্যবসাকে ছোট করে, বিনিয়োগকে ধীর করে, কর্মসংস্থানকে সংকুচিত করে, তা শেষ পর্যন্ত রাজস্বকেও কমায়। স্বল্পমেয়াদে আদায় বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি দুর্বল হলে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদেশি অভিজ্ঞতা : ‘চাপ’ নয়, ‘প্রণোদনা’ দিয়ে রাজস্ব টেকসই হয় বিশ্বের বহু দেশ দেখিয়েছে ব্যবসাবান্ধব নীতি মানে কর-শূন্যতা নয়; মানে কর-নীতির স্বচ্ছতা, পূর্বানুমেয়তা, সহজতা এবং ন্যায্যতা।

সিঙ্গাপুর প্রশাসনিক সরলতা, দ্রুত সেবা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও প্রতিযোগিতামূলক কর-কাঠামোর মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) ফ্রি-জোন, দ্রুত লাইসেন্সিং, ব্যবসার ওপর অযথা প্রশাসনিক চাপ কমিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসা টেনে এনেছে। এস্তোনিয়া ডিজিটাল সরকার, সহজ রেজিস্ট্রেশন ও স্বচ্ছ নিয়মের মাধ্যমে প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তা গড়ে তুলেছে। এসব দেশের শিক্ষা একটাই : করব্যবস্থা যত সহজ ও ন্যায্য হয়, কর দেওয়ার প্রবণতা তত বাড়ে, আর অর্থনীতিও তত দ্রুত বাড়ে। বাংলাদেশের করনীতিতে যেদিকে নজর দেওয়া জরুরি সম্পাদকীয় হিসেবে আমরা মনে করি, বাংলাদেশে কর সংস্কারের মূল দিকগুলো হওয়া উচিত কর-হার নয়, কর-ভিত্তি বিস্তৃত করা অল্পসংখ্যক আনুগত্যশীল করদাতার ওপর বারবার চাপ না দিয়ে নতুন করদাতা যুক্ত করা, এটাই টেকসই পথ। ঝগঊ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ‘ঝুঁকিবান্ধব’ করনীতি শুরুতে কম কর-চাপ, সহজ কমপ্লায়েন্স, দ্রুত রিটার্ন প্রসেসিং- এগুলো উদ্যোক্তা বাড়ায়, পরবর্তীতে রাজস্বও বাড়ায়। সেবা ও জবাবদিহি উন্নত না করলে করনীতি বিশ্বাসযোগ্য হয় না, করদাতা যখন দেখবে করের টাকা অপচয় হচ্ছে না, সেবা বাড়ছে- তখন কর দেওয়া ‘বাধ্যবাধকতা’ নয়, ‘অংশীদারত্ব’ হয়ে উঠবে। কর প্রদান ও ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমানো অনলাইন সিস্টেম, এক জানালা সেবা, অডিট/হারাসমেন্ট কমানো, নির্দিষ্ট সময়সীমা- ব্যবসার বাস্তব খরচ কমায়। করনীতির স্থিতিশীলতা বারবার হঠাৎ পরিবর্তন বিনিয়োগকে ভীত করে। বিনিয়োগের শর্ত হলো পূর্বানুমেয়তা। সৎ উদ্যোগকে করনীতির মাধ্যমে শাস্তি দিলে, রাষ্ট্রই হারবে। যুলকারনায়েনের গল্পে কাজির রায় রাজকোষের কথা আগে ভাবেনি; ভেবেছে সমাজের কল্যাণ ও ন্যায়ের কথা। কারণ তিনি জানতেন- ন্যায়বোধ ভেঙে গেলে রাজকোষও টেকে না। আজকের বাংলাদেশেও একই সত্য প্রযোজ্য : উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সমাজকে কেবল রাজস্বের উৎস হিসেবে দেখলে অর্থনীতির প্রাণশক্তি নিস্তেজ হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সৎ উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া, ঝুঁকিগ্রহণকারীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং যারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের সঙ্গে অংশীদার হওয়া। করনীতি যদি সেই অংশীদারত্বের বদলে চাপের ভাষায় কথা বলে, তবে ব্যবসা ছোট হবে আর রাষ্ট্রের স্বপ্নও ছোট হয়ে যাবে।

লেখক : প্রকৌশলী

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাংলাদেশ   করনীতি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close