দেশের অর্থনীতি এ মুহূর্তে যে সংকটের মুখোমুখি, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিনিয়োগের স্থবিরতা। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে, যার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ব্যাংকঋণ প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে। টানা ছয় মাস ধরে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে- যা নতুন শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগের অভাবকেই নির্দেশ করে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে উচ্চ সুদহার ও ব্যাংকিং খাতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া সুদের স্প্রেড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো যেখানে গড়ে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে, সেখানে ঋণ বিতরণ করছে ১২ শতাংশের বেশি সুদে। ফলে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ শতাংশে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাস্তবে কিছু ব্যাংকে এ ব্যবধান ৮ থেকে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনকÑ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে স্প্রেড ১ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে, ভারতে সেখানে তা ৩ শতাংশের নিচে। এ তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে।
উচ্চ সুদের এ চাপ সরাসরি বিনিয়োগ ও উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে যখন অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মুনাফার হার ১০-১১ শতাংশের বেশি নয়, তখন ১৪-১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। ফলে নতুন উদ্যোগ বন্ধ হচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠান আংশিক সক্ষমতায় চলছে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর পরিণতিতে কর্মসংস্থান কমছে, বেকারত্ব বাড়ছে এবং অর্থনীতিতে স্থবিরতা গভীর হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সে সুযোগে কিছু ব্যাংক অতিরিক্ত মুনাফার পথে হাঁটছে। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ রাখছে, যেখানে ১০ শতাংশের বেশি সুদ মিলছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে- যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশই সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয়জনিত। এ অবস্থায় শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বিনিয়োগকে আরও দুর্বল করছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার বদলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ছে।
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এ বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটানো। এ জন্য প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট, বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা। অগ্রাধিকার খাত- বিশেষ করে কৃষি, এসএমই, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গার্মেন্টস ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে সহজ শর্তের ঋণ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কার্যকর ও দৃঢ় ভূমিকা নিতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বিনিয়োগের বিকল্প নেই। উচ্চ সুদের বোঝা কমিয়ে উৎপাদন ও উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি না করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আরও মুখ থুবড়ে পড়বে। দেশের অর্থনীতির সন্ধিক্ষণে শুধু নিয়ন্ত্রিত আর্থিক নীতিমালা গ্রহণযোগ্য নয়, এখন দরকার ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত সুদনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আবারও গতিশীল করার।
কেকে/এমএ