মহাত্মা গান্ধীর চোখে, ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন তা সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।’ একটি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী সরকার ও বিরোধী দল অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। বাংলাদেশে নির্বাচন হলো জনগণের ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া। এখানে জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে বেশ কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রথম জাতীয় নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালে, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। পরে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে গণতন্ত্রের চর্চা যেমন হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দ্বন্দ্বও ছিল। তবুও জনগণ সবসময় আশা করে—ভবিষ্যতে দেশে আরও অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, আর অংশগ্রহণহীন নির্বাচন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক বিভাজন ও সংঘাত বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক চাপ বা সমালোচনা, গণতন্ত্র ও সুশাসনের অবনতি, জনগণের ভোটাধিকার সীমিত হওয়াসহ রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে থাকে। বিগত কয়েকটি অংশগ্রহণহীন নির্বাচন দেশকে আজ চরম সংকটে ফেলে দিয়েছে। গুম, হত্যা, জবাবহীনতা, বিচারব্যবস্থা ধ্বংসসহ দেশের সার্বভৌমত্ব ধ্বংসের পেছনে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকাকে দায়ী করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর তারিখে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে প্রায় ২৫টি রাজনৈতিক দল এবং অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে আগ্রহ প্রদর্শন করে। এ সনদটির উদ্দেশ্য ছিল ‘জুলাই ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের’ পরবর্তী সময়ে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। সনদে দৃঢ়ভাবে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও কর্মকর্তাদের পরিমার্জন করা হবে। এ ছাড়া রয়েছে রাজনৈতিক দল-প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও ভেঙে পড়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সবল করার আহ্বান। বিগত কয়েকদশক ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন ছিল। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছিল যে, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এর ফলে জনগণের অংশগ্রহণ কমে যায় এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।
এ পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, ছাত্র ও তরুণ প্রজন্ম অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘদিন যাবত আন্দোলন করে আসছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিলÑ বৈষম্যহীন দেশ পুনর্গঠন ও দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা, যাতে কোনো দল বা সরকার প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। স্বাধীনতার এই অর্ধশত বছরেও কি আসলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ব্যতীত এককভাবে কোনো দল শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে? বাস্তবতা হচ্ছে এই প্রধান দল দুটি ছাড়া সেভাবে কেউই শক্তিশালী বিরোধী দল হওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি, যেটার প্রমাণ বিগত পনেরো বছর বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা এবং সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল না পাওয়া। তবে প্রশ্ন হলো, আগামীতে তবে কি আমরা শক্তিশালী বিরোধী দল পাব?
আওয়ামী লীগ, যারা ষোলো বছর ক্ষমতায় ছিল এবং এখনো যাদের দেশব্যপী কর্মী ও সমর্থক রয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য যাদের আপাতত কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ছোট পরিসরের দলগুলো যারা রাজনীতিতে সক্রিয় বা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে তাদেরও সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে ও সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ সাধিত হয়। বিশেষ করে নব্য তরুণ দলগুলো এ বিষয়ে কী ভাবছে সেটিও একটি বড় বিষয়। এসব বিষয় বাংলাদেশের বিবদমান বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষকে প্রজ্ঞার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শুধু দেশের জনগণ, ভাবমূর্তি ও স্বার্থের কারণে নয়; নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনেও এটি তাদের ভাবা প্রয়োজন। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে দিকে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
সর্বোপরি, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে এমন নির্বাচন যেখানে সব রাজনৈতিক দল, ভোটার ও নাগরিক সমাজ সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, এবং নির্বাচন হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে। এজন্য রাষ্ট্র, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ রাখা, ইলেকট্রনিক ভোটিং বা ম্যানুয়াল ভোটিং সুরক্ষিত করা, ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ পর্যবেক্ষকদের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার চাওয়াই হওয়া উচিত মূল প্রায়রোটি।
সহনশীল রাজনীতি চর্চা ও সহিংসতা পরিহার করা, ভোটারদের সচেতন করা, গণতন্ত্রে বিশ্বাস স্থাপন এবং একতরফা বর্জন করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার জন্য সব বড় রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ঐক্যের মাধ্যমে সবার একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের করবে বলে আমার বিশ্বাস। ছোটখাটো সমস্যা দূরে রেখে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখতে সব রাজনৈতিক দলকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য, রাজনৈতিক দলের কাছে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশাও রয়েছে অনেক। অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা—এ চেতনাকে সামনে রেখে, সব ছোট-বড়, ডান-বাম, ইসলামিক ভাবধারার দলগুলোর উচিত এ চেতনাকে সম্মান জানিয়ে অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনে অংশ নেওয়া। এতে গণতন্ত্র হবে শক্তিশালী, জনগণের আস্থা ফিরবে এবং বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে। বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে গণতন্ত্রের চর্চা যেমন হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দ্বন্দ্বও ছিল। তবুও জনগণ সবসময় আশা করে—ভবিষ্যতে দেশে আরও অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে।
তাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং উন্নয়নের পথকে সুগম করবে বলে আমার বিশ্বাস। সব উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অস্বস্তি পরাভূত করে ভোটারদের নির্ভয়ে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে এসে অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে মূল্যবান নাগরিক দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল এবং সচেতন জনগণ। এগুলো একসঙ্গে কাজ করলে তবেই দেশে প্রকৃত অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব হবে। নির্বাচন হবে জনগণের, শুধু সরকারের নয়। অর্থাৎ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই একটি স্থায়ী গণতন্ত্র ও জনআস্থার ভিত্তি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা
কেকে/এজে