আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে প্রবাসী ভোটারদের জন্য চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালট কার্যক্রম নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানে একাধিক পোস্টাল ব্যালট একত্রে পাওয়া যাওয়ার অভিযোগ শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নির্বাচন কমিশনের টেবিল পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থানরত লাখো ভোটার জাতীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিলেন। সে বাস্তবতায় পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা গণতন্ত্রের পরিসর সম্প্রসারণের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু এই উদ্যোগ যদি অনিয়ম, কারসাজি ও পক্ষপাতের অভিযোগে কলুষিত হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে দুর্বলই করবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে একই বাসা বা একই ব্যক্তির ঠিকানায় শত শত ব্যালট পৌঁছানোর যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য নয়। একজন প্রবাসীর সম্মতি ছাড়া তার ব্যালট অন্য কেউ গ্রহণ করছে এমন অভিযোগ নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভোটাধিকার ব্যক্তিগত ও গোপনীয়; সেখানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ মানেই নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া।
এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ-অস্বীকার সমস্যার সমাধান নয়। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দেশের বাইরে সংগঠন না থাকার দাবি যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে, তেমনি বিএনপিসহ অন্যান্য দলের উত্থাপিত অনিয়মের অভিযোগও হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ এখানে প্রশ্ন কোনো একক দলের নয়; প্রশ্ন হলো পুরো প্রবাসী ভোট ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গ্রহণযোগ্যতা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ এসেছে পোস্টাল ব্যালটে প্রতীকের অবস্থান নিয়ে। কোনো প্রতীক খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়, আবার কোনো প্রতীক সহজেই চোখে পড়ে এ ধরনের নকশাগত বৈষম্য থাকলে তা ভোটার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল শুরু থেকেই এমন একটি ব্যালট নকশা নিশ্চিত করা, যেখানে সব প্রতীক সমানভাবে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবে। এখানে ‘ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ’ রেখে দেওয়া মানেই অযথা বিতর্ককে ডেকে আনা।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট, প্রকাশ্য ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা। প্রবাসীদের কাছে ব্যালট কীভাবে পাঠানো হচ্ছে, কার মাধ্যমে বিতরণ হচ্ছে, ব্যালট সংগ্রহ ও সংরক্ষণের দায় কার, কোথাও একাধিক ব্যালট পাওয়া গেলে তার আইনগত পরিণতি কী এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কারভাবে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। প্রয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মিশনগুলোকেও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে যৌথভাবে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ গত দুই দশকে গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত নির্বাচনের অভাবে গণতান্ত্রিক আস্থার বড় ঘাটতির মধ্য দিয়ে গেছে এ অভিযোগ নতুন নয়। এমন বাস্তবতায় প্রবাসী ভোটের মতো একটি নতুন ব্যবস্থাকে ঘিরে যদি আবারও আস্থার সংকট তৈরি হয়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য সুখকর হবে না।
এখনো সময় আছে। নির্বাচন কমিশন যদি দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে, প্রয়োজনীয় সংশোধন আনে এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা ও সমতার বার্তা স্পষ্টভাবে দেয়, তবে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা বিতর্কের বদলে গণতন্ত্রের একটি শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায়, এই উদ্যোগই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে যার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
কেকে/ এমএস