মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
হাদি হত্যার বিচার ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়
মাহতাব ফারাহী
প্রকাশ: রোববার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:৩২ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

একটি রাষ্ট্রকে সভ্য ও গণতান্ত্রিক বলে চিহ্নিত করা যায় তার বিচারব্যবস্থা কতটা ক্রিয়াশীল, স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং কতটা আপসহীন, তার ওপর। সংবিধান, আইন কিংবা প্রতিষ্ঠান যত শক্তিশালীই হোক না কেন, বাস্তবে যদি বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক সমঝোতার কাছে বন্দি হয়ে পড়ে, তবে সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিচয় কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। যেমন শহীদ ওসমান হাদির বিচার এখন পর্যন্ত কাগজপত্রেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। 

হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় আশানুরূপ অগ্রগতি তো নেই-ই, বরং একই সময়ে তার পরিবারের একজন সদস্যের বিদেশে কূটনৈতিক পদে নিয়োগ—এই দুই ঘটনা কাগুজে গণতন্ত্রের পাশাপাশি যুগপৎ রাষ্ট্রের বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। প্রশ্নটি কেবল একটি নিয়োগ নিয়ে নয়; প্রশ্নটি ন্যায়বিচারের ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা এবং নাগরিক আস্থার ভিত্তি নিয়ে।

গবেষণা বলছে, যে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেখানে অপরাধ কেবল বাড়েই না, রাষ্ট্রের ওপর নাগরিক আস্থাও দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। দেশি ও আন্তর্জাতিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা যত দুর্বল হয়, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার তত বাড়ে। কারণ অপরাধীরা জানে—শাস্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ, অথবা পালিয়ে বেড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তাই তারা অপরাধ সংগঠনে উৎসাহিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিচারহীনতার অভিযোগ নতুন নয়। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন কিংবা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকার নজির আছে। হাদি হত্যার বিচারপ্রক্রিয়াও সেই একই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। জানি না, ঠিক কত বছর লাগবে এই বিচার সম্পন্ন করতে। শেষমেশ এটিও কি ফেঁসে যাবে সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের বিচারের মতো?

এভাবে  রাষ্ট্র যদি বছরের পর বছর একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেটি শুধু একটি মামলার ব্যর্থতা নয়Ñসেটি রাষ্ট্রীয় অক্ষমতার প্রকাশ। ওসমান হাদির ভাইকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে চুক্তিভিত্তিক দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাকে কেউ কেউ ‘নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত’ বলে ব্যাখ্যা করতে চাইছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কখনোই রাজনৈতিক ও নৈতিক বিবেচনায় নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে যখন সেই সিদ্ধান্ত সরাসরি একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে নৈতিকভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, সংঘাতপূর্ণ বা স্পর্শকাতর মামলায় রাষ্ট্র যদি ভুক্তভোগী পরিবারের কাউকে বিশেষ সুবিধা দেয়, তখন সেটিকে প্রায়শই ‘কোয়ায়েটিং স্ট্র্যাটেজি’—অর্থাৎ নীরব করার কৌশল হিসেবে দেখা হয়। লাতিন আমেরিকার সামরিক শাসনামল, কিংবা আফ্রিকার কিছু দেশে স্বৈরশাসনের সময় দেখা গেছে—ভুক্তভোগীদের পরিবারকে প্রশাসনিক পদ, ক্ষতিপূরণ বা বিদেশে পাঠানোর মাধ্যমে রাষ্ট্র বিচারের দাবিকে স্তিমিত করার চেষ্টা করেছে। ফলাফল ছিল একটাই: ন্যায়বিচার দীর্ঘদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। আফসোসের বিষয় হচ্ছে, শহীদ ওসমান বিন হাদি আমৃত্যু যেই ন্যায় বিচারের জন্য লড়ে গেছেন ঠিক তার হত্যাকাণ্ডের বিচারও আজ নির্মমভাবে প্রহসনের শিকার হচ্ছে। হাদি বলতেন, রাষ্ট্র যদি নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে অন্তত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তার সেই উচ্চারণ—‘শুধু আমাদের যদি কেউ মেরে ফেলে, তাকে যেন ধরে বিচার করা হয়’—আজ যেন রাষ্ট্র ও পাশাপাশি আমাদের জন্য এক নির্মম বিদ্রুপ। হাদির পরিবারের একজন সদস্যকে কূটনৈতিক পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাদির আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি এমন এক বার্তা দেয়, যেন ন্যায়বিচারের দাবি আর রাষ্ট্রীয় সুবিধা একই পাল্লায় ওজন করা যায়। এই ধারণা শুধু হাদির স্মৃতিকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং ভবিষ্যতে যে কেউ ন্যায়বিচারের জন্য দাঁড়াতে চাইলে তাকেও নিরুৎসাহিত করবে। 

আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো— Justice delayed is justice denied। অর্থাৎ দীর্ঘসূত্রতা কেবল সময়ক্ষেপণ নয়; এটি ভুক্তভোগীর জন্য এক ধরনের দ্বিতীয় শাস্তি। গবেষণায় দেখা যায়, বিচার বিলম্বিত হলে সাক্ষ্য দুর্বল হয়, প্রমাণ নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়। হাদী হত্যার বিচার যখন স্থবির, তখন সেই স্থবিরতার মাঝেই এমন একটি নিয়োগ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে। এটি কি কাকতালীয়? নাকি এটি একটি অদৃশ্য সমঝোতার বহির্প্রকাশ? রাষ্ট্র যদি এ প্রশ্নের পরিষ্কার ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সন্দেহই শক্তিশালী হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকরা আস্থা হারাবে। প্রসঙ্গত বলতে হয়, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্র বা অর্থনীতি নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি নাগরিকের আস্থা। সেই আস্থা গড়ে ওঠে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। যখন নাগরিক দেখে খুনের বিচার হয় না, আর একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সুবিধা অনৈতিকভাবে বণ্টিত হয়—তখন সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, আইন সবার জন্য সমান নয়।  গণতন্ত্রের ইতিহাস বলে, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে নাগরিকরা হয়তো নীরব হয়ে যায়, নয়তো চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। দুটিই রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।

সুতরাং হাদি হত্যার বিচারকে গতিশীল করা, স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা এবং হাদির ভাইকে কূটনৈতিক পদে নিয়োগের সিদ্ধান্তের নৈতিক ব্যাখ্যা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা এখন সময়ের দাবি। এ বিচার ও দাবি উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। নচেৎ ইতিহাস এক দিন লিখবে, এই রাষ্ট্র তার একজন আপসহীন দেশপ্রেমিক সন্তানের রক্তের বিনিময়ে ন্যায়বিচারকে বিসর্জন দিয়েছিল। 

লেখক : সাংবাদিক

কেকে/এজে


আরও সংবাদ   বিষয়:  হাদি হত্যার বিচার   রাষ্ট্রের নৈতিক দায়  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close