বহুমুখী সংকটে জর্জরিত দেশের তৈরি পোশাক খাত নতুন করে আবারও ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক মন্দা, ক্রেতাদেশ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও শ্রম ও নীতিগত চাপের মধ্যেই এবার সুতা আমদানিতে শুল্ক ও বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত শিল্পটিকে কার্যত ‘অস্তিত্ব সংকটের’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতের ওপর সামান্য নীতিগত ভুল সিদ্ধান্তও যে কতটা অর্থনৈতিক অভিঘাত তৈরি করতে পারে, অতীত অভিজ্ঞতা তার প্রমাণ।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর দাবি অনুযায়ী, এমন সংকটময় সময়ে কাঁচামাল আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, রপ্তানি কমবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যে গত ছয় মাসে ব্যবসা কমেছে ১৪ শতাংশ; নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তাদের বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। তাদের বেশিরভাগেরই দাবি নতুন করে শুল্ক আরোপ নয়; বরং সীমিত কিছু সুতাকে বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার প্রস্তাব তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। যেগুলোর শতভাগ সরবরাহ সক্ষমতা দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোর রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী দেশের ভর্তুকিপ্রাপ্ত সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো মারাত্মক চাপে পড়েছে। বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়লে পুরো টেক্সটাইল ভ্যালু চেইনই দুর্বল হয়ে পড়বে এ বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না।
সমস্যা মূলত নীতিগত সমন্বয়ের অভাবে। তৈরি পোশাক খাত ও বস্ত্র খাত- দুটিই দেশের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক খাতকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে অন্য খাতকে দুর্বল করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু নয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পোশাক খাতের সংগঠনগুলো দাবি করছে- এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতিমালা, বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সেফগার্ড চুক্তির শর্ত মানা হয়নি। যদি তা সত্য হয়, তবে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, নীতিগত ও আইনগতভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
এখানে সবচেয়ে জরুরি হলো নীতিগত সমন্বয় ও সমাধান। দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমদানিতে শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে নয়; বরং সরাসরি নগদ সহায়তা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় কমানো, কর রেয়াত ও স্বল্প সুদের ঋণের মতো বাস্তবসম্মত নীতি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পোশাক খাতের কাঁচামাল সরবরাহ যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পথে।
সামনে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত আরও কঠোর হবে। এই বাস্তবতায় টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়, বরং সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি এখন সময়ের দাবি। সরকার যদি দ্রুত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছায়, তবে সংকট এড়ানো সম্ভব। অন্যথায়, নীতিগত জটিলতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেবে যার মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকেই।
কেকে/এমএ