বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একযোগে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের মতো তিনটি গভীর ও জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে দেশ অগ্রসর হচ্ছে। এই তিনটি প্রক্রিয়া কেবল আলাদা আলাদা চ্যালেঞ্জ নয়; বরং একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই প্রেক্ষাপটে একটি স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও রাজনৈতিকভাবে বৈধ সরকার গঠন এখন আর কেবল রাজনৈতিক প্রশ্ন নয় এটি অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ, সংস্কার ও নীতিগত ধারাবাহিকতার সবচেয়ে বড় বাধা। দীর্ঘদিন ধরে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অভাব দেশের অর্থনীতি ও আর্থিক খাতকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। পুঁজিবাজার কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, ব্যাংকিং খাত অতিরিক্ত ঝুঁকির ভার বহন করছে, আর জনগণের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আস্থাহীনতায় ভুগছে। এই বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি আস্থার পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ছাড়া কঠিন সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা সবকিছুই রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়া এসব সংস্কার টেকসই হয় না- বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। এর মধ্যেই সামনে আসছে এলডিসি থেকে উত্তরণের বাস্তবতা।
২০২৬ সালের নভেম্বরের পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে হারাবে শুল্ক সুবিধা, রপ্তানি ভর্তুকি ও ট্রিপসের বিশেষ সুবিধা। এতে স্বল্পমেয়াদে বড় ধাক্কার আশঙ্কা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। শিল্প খাতের ভ্যালু চেইন উন্নয়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য, মান ও কমপ্লায়েন্স-এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। কিন্তু এসব সংস্কারের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। জবাবদিহির অভাবই আজ অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের মূল সংকট। নির্বাচিত সরকারের দায়বদ্ধতা ছাড়া ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি কিংবা পুঁজিবাজারের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটানো সম্ভব নয়।
একইভাবে সিটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী মাশরুর আরেফিন যে আস্থার সংকটের কথা বলেছেন, তা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি নির্মম চিত্র তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও এখন অপেক্ষায়। তারা বাংলাদেশের সম্ভাবনা দেখছে, কিন্তু রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায়। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে সেই আস্থার ভিত্তি গড়ে তুলতে। নির্বাচনের মাধ্যমে যদি একটি রাজনৈতিকভাবে বৈধ ও দায়বদ্ধ সরকার গঠিত হয়, তবে সংস্কার, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ অনেকটাই সুগম হবে।
অতএব, আসন্ন নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ ও উন্নয়ন অভিযাত্রার দিকনির্দেশক। তিন রূপান্তরের এই সন্ধিক্ষণে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে তার মূল্য দিতে হবে দীর্ঘদিন। সময় এখন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রচিন্তা ও গণতান্ত্রিক প্রত্যয়ের পরীক্ষার।
কেকে/ আরআই