মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
দাবানল ও বন ধ্বংসে বিশ্ব প্রকৃতি বিপন্ন
মোতাহার হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:২৬ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

প্রাকৃতিক নৈসর্গের উৎস হচ্ছে বৃক্ষ, বনরাজি। কিন্তু আগুন, বনের ওপর মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা, দারিদ্র্যতা, উন্নয়নের  নামে বন নিধনসহ বহুমুখী কারণে প্রাকৃতিক নৈসর্গের উৎসে টান পড়ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের দেশে দেশে প্রাকৃতিক নৈসর্গিক উৎসের ধ্বংস প্রক্রিয়ায় গাছের আহাজরি আগুনের স্ফুলিঙ্গের লেলিহান শিখায় বাতাসকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করলেও বন রক্ষায় মানুষ নির্বিকার, নির্বিকার, প্রশাসন, সরকার। বন ধ্বংসের ভয়াবহ তথ্য দেশি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয় প্রায়শই। ইউরোপের দেশে দেশে, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গ্রীষ্মে, তীব্র প্রবাহে বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড, দাবানলের ঘটনা ঘটে।

এমনই একটি সংবাদ দ্য গার্ডিয়ানসহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। তাতে বলা হয়, ২০২৫ সালে দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দাবানলে গ্রাস হয়েছিল। এতে বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়েছে, স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিমান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মৌসুমের মুখে পড়ে বলিভিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ নিয়ে ‘আমাদের যা আছে তা রক্ষা করতে না পারায় আমরা অসহায় ও ক্ষুব্ধ বোধ করেছি,’ বলেন ইসাবেল সুরুবি পেসোয়া। আগুন ও তার আগের খরার কারণে বলিভিয়ার পূর্বাঞ্চলের নিম্নভূমিতে গ্রামের পানির ঝরনা শুকিয়ে গেলে তখন ওই এলাকার মানুষকে নিকটবর্তী শহরে চলে যেতে হয়। বড় খামার ও গ্রামগুলোর প্রায়ই ফসল ফলানো বা গবাদিপশু চরানোর জন্য জমি পরিষ্কার করতে আগুন ব্যবহার করে।

অবশ্য পরিবেশ বিজ্ঞানীদের অভিমত, জলবায়ু সংকট ও এল নিনো আবহাওয়া প্রবণতায় সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং দুর্বল পরিবেশগত শাসনব্যবস্থার কারণে আগুনের ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় সহজেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে দাবানল, ধ্বংস করে বন ও তৃণভূমি। আগুন লাগিয়ে শিল্পভিত্তিক বৃহৎ জমি পরিষ্কারও বন উজাড়ের বড় কারণ। যা একই সঙ্গে কমিউনিটি ও বাস্তুতন্ত্রের সহনশীলতাকে দুর্বল করে তোলে।

প্রসঙ্গত: বলিভিয়া ও লাতিন আমেরিকায় বন ধ্বংস একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে বন উজাড় রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ উষ্ণমণ্ডলীয় প্রাথমিক বন হারিয়েছে বিশ্ব যার আয়তন আয়ারল্যান্ডের চেয়েও বড়। বিশ্বের সর্বাধিক বৃহৎ ম্যানগ্রোভ আমাজনে বন উজাড়ের ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং বৃষ্টিপাত কমছে, যার প্রভাব পড়ছে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর। এর সঙ্গে আগুন যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয় পানি দূষণ। আর ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট ও সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি, এমনকি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়।

বলিভিয়ার পরিবেশবাদী ইভান আর্নাল্ড বলেন, ‘হাজার হাজার হেক্টর পোড়া জমির মাঝখানে বাস করলে সেটি যে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ হবে না, তা বলাইবাহুল্য।’ ২০২৪ সালে খরা ও আগুনের পর বলিভিয়ায় ভারি বৃষ্টি নামে, যা শহর প্লাবিত করে এবং ফসল নষ্ট করে। দেশের উষ্ণমণ্ডলীয় শুষ্ক বনাঞ্চলের সুরুবি কমিউনিটিতে চাষাবাদের মৌসুম ব্যাহত হয়, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়ে। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ল্যাবের সহপরিচালক পিটার পোটাপভ বলেন: ‘এই ধারা চলতে থাকলে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চল স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন মুক্ত হবে যা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও তীব্র করবে এবং আরও চরম আগুন সৃষ্টি করবে।’

প্রথমবারের মতো দেখা গেছে, উষ্ণমণ্ডলীয় প্রাথমিক বন ধ্বংসের প্রধান কারণ ছিল আগুন যা এ ধরনের বাস্তুতন্ত্রে স্বাভাবিক নয় (অস্ট্রেলিয়ার মতো অঞ্চলের বিপরীতে)। এসব বন পৃথিবীর সবচেয়ে জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ কার্বন শোষক। ২০২৪ সালে হারানো উষ্ণমণ্ডলীয় প্রাথমিক বন থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ ভারতের বার্ষিক কার্বন নিঃসরণের চেয়েও বেশি। কানাডা ও রাশিয়ার বোরিয়াল বনেও ভয়াবহ আগুন লাগে, আর বিশ্বজুড়ে গাছপালা হারানোর হার সর্বকালের সর্বোচ্চে পৌঁছায়। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ-এর সহপরিচালক এলিজাবেথ গোল্ডম্যান বলেন, ‘এই তথ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এটা একটি বৈশ্বিক লাল সতর্কতা।’

বিশ্বজুড়ে উদ্ভিদ হারালেও, লাতিন আমেরিকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। ব্রাজিল যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি উষ্ণমণ্ডলীয় প্রাথমিক বন হারিয়েছে। আমাজনে ২০১৬ সালের পর সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে আগুন ও কৃষি সম্প্রসারণ এর মূল কারণ। ২০২৩ সালে সামান্য কমার পর, কলম্বিয়ায় ২০২৪ সালে প্রাথমিক বন ধ্বংস ৫০% বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট কলম্বিয়ার উপদেষ্টা হোয়াকিন কারিসোসা বলেন, ‘বেশিরভাগ বন ধ্বংসের পেছনে রয়েছে আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্র। এটা শুধু কলম্বিয়ার সমস্যা নয়।’ লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোতেও বন উজাড় বেড়েছে। বেলিজ, গায়ানা, গুয়াতেমালা ও মেক্সিকোতে আগুনই ছিল প্রধান কারণ। নিকারাগুয়া ২০২৪ সালে প্রায় ৫% প্রাথমিক বন হারিয়েছে যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ অনুপাত। বলিভিয়ায় প্রাথমিক বন ধ্বংস ২০০% বেড়ে ১৫,০০০ বর্গকিলোমিটারে পৌঁছেছে। দেশটি ব্রাজিলের পর দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। কাজেই ‘এটি ইঙ্গিত দেয় যে বলিভিয়া এখন বৈশ্বিক জলবায়ু ও পরিবেশ সংকটের একটি বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।  শিল্পভিত্তিক কৃষি ও গবাদিপশু খামারের বিস্তার, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং বন সংরক্ষণের চেয়ে জমি রূপান্তরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া রাজনৈতিক কাঠামোসব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

মনে রাখা দরকার ‘আগুন লাগার সময় শুধু প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, অফ-সিজনেই প্রস্তুতি নেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।’ ‘আমরা লড়াই করছি, যেন আবার এই আগুনের যন্ত্রণা পোহাতে না হয়।’ ‘প্রকৃতি যদি একটি ব্যাংক হতো, তবে সেটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য ইতোমধ্যে সবকিছুই করা হতো।’ কিংবা ‘দুর্যোগকে প্রকৃতি বলা হয়, যেন প্রকৃতিই একটা জল্লাদ, শিকার নয়।’ লাতিন আমেরিকার সাহিত্যি এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ১৬ বছর আগের উপরোক্ত উক্তি আজও প্রাসঙ্গিক। এ উক্তি মনে করিয়ে দেয়, আমরা প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েও কিংবা প্রকৃতির গর্ভে বেড়ে উঠেও তার ওপর কী সীমাহীন অত্যাচারই না জারি রেখেছি। প্রত্যাশা থাকবে প্রকৃতির রক্ষক বন রক্ষায় স্থানীয় এবং বৈশ্বিক সম্মিলিত উদ্যোগে আশার আলো দেখবে পৃথিবী, দেখবে মানুষ।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বিসিসিজেএফ

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  দাবানল   বন ধ্বংস  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close