সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      
জীবনানন্দ
গল্প
অন দ্য রোড
সামিরা আজম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:১১ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সবেমাত্র, ছুটির ঘণ্টাটা পড়ল। কতক্ষণ ধরে যে এ শব্দটার জন্য অপেক্ষা করতেছিলাম! পানির টাব থেকে হাতটা দ্রত টেনে তুললাম।। এখানে খালি বোতলগুলো স্তুপ করে রাখা, এগুলা আবার ক্লিন করে বিয়ার ভরতে হবে, তারপর সেগুলো চলে যাবে শহরের বার আর নাইটক্লাবগুলোতে। সেখানে তৃষ্ণার্ত মানুষগুলো গলায় ঢালবে এ পানীয়, তারা এমনভাবে পান করে যেন তাদের তৃষ্ণা কোনোদিনই মেটে না। একটু পরই সেগুলো আবার খালি হয়ে আমার কাছে ফিরে আসবে। আবার ক্লিন করতে হবে।

আমি অস্থির চোখে একটা ন্যাকড়া খুঁজতে লাগলাম। হাত দুটো দীর্ঘক্ষণ পানিতে ভিজে কুঁচকে গেছে। এক এক করে আঙুলগুলো মুছতে গিয়ে আমার নজর পড়ল যেখানে আমার আঙুলে একটা সোনার আংটি থাকার কথা ছিল। সারা জীবন একটা আংটির স্বপ্ন দেখেছি আমি—যে কোনো একটা আংটি হলেই হতো। গয়নার দোকানের জানলায় যেমনটা দেখতাম—টকটকে লাল পাথরের একটা আংটি। ডান হাতের অনামিকায় ওটা পরার খুব শখ ছিল আমার। একবার কিছু টাকা জমিয়ে নিজেকে কথা দিয়েছিলাম যে ওই লাল পাথরের সোনার আংটিটা কিনব। তখন জানতাম না যে বাবা মারা যাবেন, আর জমানো টাকাগুলো মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বাবার শোকে আমি আংটির কথা মাথা থেকেই ঝেড়ে ফেলব।

তবে এখন আমার একটা আংটি আছে : বাগদানের আংটি। একটা সাধারণ হলুদ ব্যান্ড, যেটা আমি আঙুলে পরি। ওটা সে-ই আমাকে দিয়েছিল যখন বলেছিল, ‘তুমি আমার স্ত্রী হবে।’ আমি তখন খুব খুশি হয়েছিলাম—ভাবলাম ওর ঘরনি হব, আর এই আংটিটা পরব। মনে মনে আশা ছিল এই হলুদ ব্যান্ডের সঙ্গে ও আমাকে লাল পাথর বসানো আরও একটা আংটি দেবে। কিন্তু দেয়নি। ও আমার মতোই গরিব, তাই এই আংটি, একটা নীল সিল্কের জামা আর এক শিশি পারফিউম (যা আমি এখনো খুলিনি)—এর বেশি দেওয়ার সাধ্য ওর ছিল না।

আমি পকেট থেকে একটা ছোট চামড়ার ব্যাগ বের করে আংটিটা নিলাম। সাবান আর পানিতে আংটির জেল্লা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এই ভয়ে ওটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। আংটিটা পরে চারপাশ তাকিয়ে দেখলাম এখানে যারা কাজ করে সেই মহিলারা সব চটপট নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেছে। হয়তো তারা এখন কোনো গরম খাবার নিয়ে বসেছে অথবা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। আমার পা দুটো ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাও কারখানার গেটে অপেক্ষা করতে হবে। ও যদি কারখানার ট্রাকে করে আমাকে একটু লিফট দেয়! এ বৃষ্টিভেজা কনকনে রাতে হেঁটে শহরে ফেরার কথা ভাবতেই পারছি না। হ্যাঁ, ও নিশ্চয়ই আমাকে তুলে নেবে, সঙ্গে থাকবে বিয়ারের ক্রেটগুলো। ও আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে তারপর বিয়ার ডেলিভারি করতে বেরোতে পারবে। আমি অপেক্ষা করবই। আমি খুব ক্লান্ত, আজ সকালে অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি।

সকালে আসার পথে কত কিছু যে দেখলাম : বন্ধ জানালার বাড়িঘর, আধো-ঘুমে বিভোর মানুষেরা কাজে যাচ্ছে। দেখলাম মহিলারা ডিম আর দুধ বিক্রি করছে, বাড়ির চিমনি দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। আর আমি শুধু হাঁটলাম। এতটা পথ হেঁটে এখানে আসতে হয়েছে যে মনে হয় কারখানার মালিক দুনিয়ার শেষ প্রান্তে এ ফ্যাক্টরি বানিয়েছেন। ছোটবেলায় দেখা সেই ট্রেনের কথা মনে পড়ল, যেটাকে দেখে সবসময় মনে হতো ওটা অসীম কোনো সফরে যাচ্ছে, একদম পৃথিবীর শেষ সীমানায়। আমি কারখানার অন্য মহিলাদের সঙ্গেই পৌঁছালাম, কিন্তু আমাকে বাড়ি থেকে বেরোতে হয়েছিল ওদের অন্তত এক ঘণ্টা আগে। আমার বাড়ি শহরের অনেক পুরোনো এক এলাকায়। সেখানেই আমার জন্ম, সেখানেই বড় হওয়া, আর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত ওখানেই থাকব।

হ্যাঁ, আমার বিয়ে হচ্ছে! আমার হাতে আংটি আছে, আর আমার ভালোবাসার মানুষটা আমাকে তার নিজের ঘরে নিয়ে যাবে। আমি তখন রানীর মতো থাকব—আর কোনোদিন বোতল ধুতে হবে না, মোরগ ডাকার আগে ঘুম থেকে উঠতে হবে না, আর কারখানায় আসা-যাওয়ার পথে পা ফেটে রক্ত ঝরবে না। আমার মানুষটা গরিব হতে পারে, কিন্তু সে খুব শক্তপোক্ত আর দয়ালু। ওর পাশে থাকলে আমাকেও শক্তিশালী দেখাবে, তখন আর নিজেকে ছোট মনে হবে না। এখন ওই দামী পারফিউম মাখা সুবেশা মহিলারা পাশ দিয়ে গেলে যেমনটা লাগে, তেমন আর লাগবে না। ও যে নীল জামাটা আমাকে দিয়েছে সেটা খুব সুন্দর, বলেছে আরও একটা কিনে দেবে। আর ও—ও খুব সুন্দর আর হ্যান্ডসাম, ফ্যাক্টরির মেয়েরা অন্তত তাই বলে। অনেকে তো হিংসাও করত, আবার কেউ কেউ শুভকামনা জানিয়েছিল : ‘যাক, অন্তত এই খাটুনি থেকে তোর মুক্তি মিলবে,’ এনগেজমেন্টের দিন বলেছিল ওরা।

এক ধূর্ত মেয়ে তো বলেই বসল যে আমি খুব চতুর শিকারি, কারখানায় ঢোকার দুই মাসের মাথায় একজন কর্মীকে পটিয়ে ফেলেছি! আমি সেটা শুনেছিলাম, কিন্তু ওর ওপর রাগ করিনি। হয়তো ও নিজেও চাইছিল এমন কেউ আসুক যে ওর কাঁধ থেকে জীবনের ভার একটু কমাবে। ওর এই চাওয়াটা কি খুব অন্যায়? আমরা কেন ওই বিলাসী মহিলাদের মতো হতে পারি না যারা বারান্দায় বসে কফি আর গালগল্পে মেতে থাকে? যারা চিকচিক করা আংটি পরা ফর্সা হাত দিয়ে কফির কাপ মুখে তোলে, আর আমরা যখন পুরনো জামা পরে হেঁটে যাই, তখন আমাদের দেখে হাসাহাসি করে?

রাস্তা এখন জনমানবশূন্য। চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। আমার মাথায় জড়ানো পশমি স্কার্ফের ওপর টুপটুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। ওর সেই ট্রাকটা এখনো আসছে না কেন? কেন দেরি হচ্ছে? ও কি তবে আগেই কারখানা থেকে বেরিয়ে গেছে? মানুষের ভিড় আর মেশিনের শোরগোলে আমি কি ওকে চলে যেতে দেখিনি? ভয় হতে শুরু করল। সামনে দীর্ঘ রাস্তা, সেই পুরোনো বাড়ি যেখানে রুপালি চুলের মা আর চুলার ওপর গরম স্যুপ নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। খিদেও লেগেছে খুব, মায়ের জন্য আর ওর জন্য খুব মন কেমন করছে। আমরা তিনজন আগুনের পাশে বসে এমন সব গল্প করব যার সঙ্গে বিয়ারের বোতল বা কারখানার ধোঁয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। ও কি আমাকে না দেখেই চলে গেল?

হঠাৎ গাড়ির শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙল। হয়তো ও-ই আসছে? দূর থেকে দুটি জ্বলজ্বলে আলো দেখা গেল, তারপর ধীরে ধীরে কাছে এল। না, এটা সেই খটখটে আওয়াজ করা বড় ট্রাকটা নয়। এটা বড়লোকের দামি গাড়ি, খুব মসৃণভাবে চলছে। কিন্তু গাড়িটা থামছে না কেন? ও নিশ্চয়ই আমাকে দেখেছে—গাড়ির হেডলাইটের আলো অন্ধকার ভেদ করে আমার ওপর পড়েছিল, আমি তো প্রায় রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়েছিলাম। গাড়িটা যখন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল, আমি চিৎকার করে উঠলাম যাতে ও থামে। আমি দৌড়ে গেলাম, ও দরজা খুলে দিল। কিন্তু আমি গাড়িতে উঠতে যাব, ঠিক তখনই একটা বিশ্রী দৃষ্টি আমাকে থমকে দিল। কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে দুটো কুৎসিত চোখ আমার দিকে চেয়ে আছে। কে এই লোকটা? আমি জানি না! হয়তো উনি ম্যানেজার, যার নামই শুধু শুনেছি। অস্থিরভাবে নড়েচড়ে বসে উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কে এই আপদ?’ আর কিছু না বলে হাতের দামি চুরুটটা নেড়ে আমাকে সরে যেতে ইশারা করলেন। আর আমার সেই ভালোবাসার মানুষটি কী করল? যে আমাকে কাছে টেনে বলেছিল, ‘তুমি আমার স্ত্রী হবে’? সে আমাকে দরজা থেকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে মুখের ওপর ধড়াস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

গাড়িটা চলে গেল, আমাকে ঝড়ের মধ্যে একা ফেলে রেখে। রাগে-ক্ষোভে আমার চোখ দিয়ে গরম জল গড়িয়ে পড়ল, আর একটা তীব্র ঘৃণা আমাকে ঘিরে ধরল। আমার চোখের সামনে সব ছবি যেন বদলে যেতে লাগল। দুনিয়ার সবকিছু এখন অনেক বিশাল, ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে হচ্ছে। ঘরবাড়ি, মানুষ, গাছপালা, গাড়ি—সবই যেন দানবের মতো বিশাল। এমনকি সেই খালি বিয়ারের বোতলগুলোও এখন আমার কাছে দানবের মতো উঁচু মনে হচ্ছে। আর এ বিশাল সব জিনিসের মাঝখানে আমি নিজেকে আর ওকে দেখলাম। আমরা যেন খুব তুচ্ছ দুটো মানুষ, মাটির সঙ্গে মিশে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণী। আমরা যত উঁচুই হই না কেন, সেই ম্যানেজারের আঙুল পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষমতাও আমাদের নেই—যেই আঙুলের এক ইশারায় আমাকে গাড়ি থেকে সরিয়ে ঝড়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া হলো।

মূল : সামিরা আজম 
অনুবাদ : ফরহাদ নাইয়া

কেকে/এজে


আরও সংবাদ   বিষয়:  গল্প   অন দ্য রোড  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close