সোমবার, ২২ জুন ২০২৬,
৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
শিরোনাম: এমপি আজহারুল ইসলামের পুত্র সজীব ডিবি হেফাজতে      মালয়েশিয়া পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      দলীয় ব্যর্থতায় টি-২০ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হোয়াইটওয়াশ টাইগাররা      সড়ক দুর্ঘটনায় কাতারে পাঁচ বাংলাদেশি নিহত      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু      ডেঙ্গুতে আরও দুইজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২২০      মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী      
জীবনানন্দ
ফুফুর বিয়ে
সামিরা আজ্জাম, অনুবাদ : ফরহাদ নাইয়া
প্রকাশ: রোববার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
সামিরা আজ্জাম। ফাইল ছবি

সামিরা আজ্জাম। ফাইল ছবি

ফিলিস্তিনের আকরে একটি মধ্যবিত্ত খ্রিষ্টান পরিবারে ১৯২৭ সালে জন্ম সামিরা আজ্জামের। মাত্র ১৬ বছর বয়সে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। ‘কোস্টাল গার্ল’ ছদ্মনামে গল্প ও সাহিত্য সমালোচনা লিখতে শুরু করেন ‘ফিলিস্তিন’ পত্রিকায়। শুরুটা এভাবেই।

২১ বছর বয়সে লাখ লাখ ফিলিস্তিনির সঙ্গে নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন আজ্জাম। লেবাননে শুরু হয় তার শরণার্থী জীবন। তারপর এই শরণার্থী জীবনযাপনই হয়ে ওঠে তার লেখার প্রধান বিষয়। ৫০-এর দশকে সামিরা আজ্জাম যখন সাহিত্যিক খ্যাতির চূড়ায়, তখনই ১৯৬৭ সালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

উম্মে ইউসুফ যখন বেড়াতে আসতেন, তখন আমাদের জিভ একটু বেশিই আলগা হয়ে যেত। পাড়া-পড়শীদের হাঁড়ির খবর নিয়ে আমরা তখন মেতে উঠতাম। আসলে উম্মে ইউসুফ হলেন খবরের যন্ত্র; আমাদের মহল্লার প্রতিটি ইঞ্চি থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে তার কষ্টের কোনো শেষ নেই। 

স্বাভাবিকভাবেই, প্রতিবার দেখা হলেই তিনি নতুন কোনো গসিপ নিয়ে হাজির হতেন কখনো নতুন খবর, কখনো আবার পুরনো কাসুন্দি। এমনকি আপনার নিজের সম্পর্কেও তিনি এমন কিছু জানতে পারেন যা হয়তো আপনি নিজেও জানেন না। আর তার খবরের ওপর কোনো সন্দেহ করার উপায় ছিল না; তিনি সবসময় তথ্যের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতেন।

হাতে বানানো সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে কফিতে চুমুক দিলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘আরে বাবা, সে এক এলাহি কাণ্ড হবে রাজকীয় বিয়ে! উম্মে শওকি তো চায় তার মেয়ের বিয়ে নিয়ে যেন সারা শহর ধন্য ধন্য করে। শহরের সেরা দর্জি দিয়ে কনের পোশাক বানানো হচ্ছে, আসবাবপত্রের জন্য কেনা হয়েছে সবচেয়ে দামি কাঠ। 

পারফিউম, ফুল, বিছানার চাদর কত কী! আর করবেই না কেন? তার কি আর কিছুর অভাব আছে? এখন শুধু দেখার বিষয়, ভাইঝির বিয়ের ধুমধামে বেচারি নাজিয়ার জমানো টাকা কতটা টিকে থাকে। আল্লাহ মাসউদ সাহেবের আত্মাকে শান্তি দিন। দেখে মনে হয় আবু শওকি আর তার ছেলেমেয়েরা যেন মাসউদের ওই লাখ লাখ টাকা ভোগ করতেই জন্মেছে। শুধু লোকদেখানো কতগুলো দোয়া পড়া ছাড়া তাদের আর কোনো খরচ নেই। আহারে, মুখে যেন তাদের ননী সরে না, কিন্তু আমি তো জানি ওই উম্মে শওকি আসলে কেমন ধুরন্ধর!’

উম্মে ইউসুফের কথা থামল যখন তিনি কফির শেষ চুমুকটা দিলেন। তখন আমার মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘নাজিয়ার স্বামী মারা যাওয়ার পর ওর কি আর কোনো বিয়ের সম্বন্ধ আসেনি?’

উম্মে ইউসুফ বিড়ালের মতো গোল গোল করে চোখ মেলে চাইলেন। ‘কী বলছ গো ভাবি? তুমি কি এতই সহজ-সরল? দুনিয়ায় এমন কোনো পুরুষ আছে যে নাজিয়ার অগাধ সম্পত্তির ওপর ভাগ বসাতে চাইবে না? আমি নিজেই তো চারটে সম্বন্ধ নিয়ে গিয়েছিলাম ওর কাছে!’

‘প্রথমজন হলো আমার এক খুড়তুতো ভাই। ভালো চাকরি আছে, নিজের বাড়ি আছে। খানদানি ঘরের সুখে থাকা মানুষ। দ্বিতীয়জন নাম বলছি না বাজারে তার বিশাল প্রভাব, বড় ব্যবসায়ী। তৃতীয়জন হলো আমাদের মহল্লার মুখতার সাঈদ আবু আবদুল্লাহ তাকে তো সবাই চেনো। আর চতুর্থজন? সে তো সাক্ষাৎ ফেরেশতা! টাকা-পয়সার তো কোনো হিসাবই নেই তার।’

‘নাজিয়ার কি কাউকে পছন্দ হলো না?’

“আরে নাজিয়া কী পছন্দ করল না করল, তাতে কার কী আসে যায়? প্রতিবার যখন আমি প্রস্তাব নিয়ে ওর ভাইয়ের কাছে গিয়েছি আগে নাজিয়াকে একটু বুঝিয়ে রাজি করিয়েই গিয়েছিলাম তখন ভাইটি মন দিয়ে সব কথা শুনত, তারপর মাথা নিচু করে গোঁফে তা দিত। ভালো খবর শোনানোর আশা দিয়ে আমাকে বিদায় করত। কিন্তু আমি বাড়ি ফিরতেই শুরু হয়ে যেত তাদের গোপন শলা-পরামর্শ। আর সেই মন্ত্রণাসভার নেত্রী হলো ওই কালসাপ উম্মে শওকি। শেষ পর্যন্ত সেই একই সিদ্ধান্ত আসত : ‘নাজিয়া মাফ চেয়েছে; স্বামী মারা যাওয়ার পর পরপুরুষের দিকে তাকানোর মতো চোখ ওর নেই’।”

‘আমি আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, নাজিয়া যদি এমন কিছু বলেও থাকে তবে সেটা ওর ভাই আর ভাইয়ের বউ শিখিয়ে দিয়েছে। যেন মাসউদের মতো ওই অভদ্র লোকটাকে ও খুব ভালোবাসত! যাই হোক, মৃত মানুষের জন্য দোয়া করা আমাদের কর্তব্য। তোমরা যদি নাজিয়াকে আঠারো বছর আগে দেখতে, যখন মাসউদের সঙ্গে ওর বিয়ে হলো! তখন ও সতেরো বছরের কচি মেয়ে, আর মাসউদ হলো এক থলথলে মেদওয়ালা বুড়ো। তুলা ভর্তি বস্তার মতো শরীর, ঝুলে যাওয়া গাল। কিন্তু তার পকেট ছিল ভারি। অঢেল সম্পত্তি, দোকানপাট, দালানকোঠা কি ছিল না তার? আট বছর ওই বুড়ো হাড়ের সঙ্গে ঘর করল মেয়েটা, কোনো সন্তানও হলো না। তারপর উচ্চরক্তচাপে লোকটা মারা গেল। মাসউদ তার এই কচি বউটার প্রেমে এতই পাগল ছিল যে মৃত্যুর আগে সব সম্পত্তি নাজিয়ার নামে লিখে দিয়েছিল। ওর আত্মীয়স্বজন কানাকড়িও পায়নি।’

‘ওহ্, আর সেই সময় আবু শওকি আর ওর বউয়ের কান্না যদি দেখতে! নিজের ছেলে মরলেও মনে হয় তারা এত কাঁদত না। শহরসুদ্ধ মৌলভি ডেকে কুরআন খতমের ধুম পড়ে গেল। চল্লিশ দিন ধরে চলল শোক পালন! আর নাজিয়া বোকা মেয়েটা যখনই দেখত উম্মে শওকি ডুকরে কাঁদছে বা আবু শওকি বুক চাপড়াচ্ছে, ও নিজেও তাদের সঙ্গে তাল মেলাত। আবু শওকি তার তাসের টুপি নাড়িয়ে নাড়িয়ে মৃত মানুষের গুনাগুন গাইত আর এমনভাবে ফুঁপিয়ে কাঁদত যেন মাসউদ তার কত আপন ছিল!’

‘শোকের দিন শেষ হলে একদিন আবু শওকি তার বোনকে গিয়ে বলল যে মাসউদের বাড়ির দরজা কখনো বন্ধ হবে না। বোন যেন নিজের বাড়িতেই মালকিন হয়ে থাকে। কিন্তু নাজিয়া যেহেতু একা মহিলা, তাই তার নিরাপত্তার দরকার আছে। তা ছাড়া নাজিয়া সুন্দরী আর ধনী, তাই পাপিষ্ঠ লোলুপ দৃষ্টি থেকে তাকে বাঁচাতে হবে। এত বড় বাড়িতে একা থাকলে তো বিষণ্নতায় মরে যাবে! ব্যাস, এই উছিলায় আবু শওকি, উম্মে শওকি আর তাদের পুরো বাহিনী নাজিয়ার দুঃখ ভুলানোর নাম করে ওই বাড়িতে এসে জাঁকিয়ে বসল।’

“তাদের জন্য তো সোনায় সোহাগা! নিজেদের আসবাবপত্র বিক্রি করে, নিজেদের বাড়িটা ভাড়ায় খাটিয়ে তারা নাজিয়ার ঘাড়ে এসে পড়ল ‘সম্মানিত মেহমান’ হয়ে। কিসের মেহমান? নাজিয়া নিজেই এখন মেহমান হয়ে গেছে, আর বাড়ির সব হুকুম চলে উম্মে শওকির। আবু শওকি বোনের সব অর্থকড়ির ভার নিল। জমি কেনা-বেচা, টাকা এদিক-সেদিক করা সব চলল। আর লোক দেখানোর জন্য প্রতি শুক্রবার কবরে গিয়ে কুরআন পড়ানো আর বছরে দুবার মৃত্যুবার্ষিকী পালনের ঘটা তো আছেই! 

এসবই করা হতো যাতে নাজিয়া সবসময় মৃত স্বামীর স্মৃতিতেই ডুবে থাকে এবং দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা মাথায়ও না আনে। এমনকি উম্মে শওকি তো আমার নামে নাজিয়ার কাছে মিথ্যা অপবাদও দিল যে আমি নাকি বলেছি ‘নাজিয়ার টাকা না থাকলে কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাত না’। যদিও কথাটা সত্যি, বর্তমান যুগে প্রথমবার বিয়ে করা মেয়েদেরই পাত্র পাওয়া যায় না, সেখানে বিধবা তো পরের কথা। কিন্তু ওটা কি আর এভাবে বলা ঠিক?”

উম্মে ইউসুফ উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের চাদরটা জড়িয়ে নিলেন। তারপর বললেন, ‘আজকের মতো এটুকুই, আবু শওকির মেয়ের বিয়েটা আগে মিটুক, তারপর আরও গল্প হবে।’ একটা তীক্ষ্ন হাসি দিয়ে তিনি দ্রুত চলে গেলেন।

পরের কয়েকদিন উম্মে ইউসুফের দেখা মেলেনি। মহল্লার সবাই এখন নাজিয়ার ভাইঝি সোয়াদের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত।
 
আমন্ত্রিত মহিলারা নতুন নতুন পোশাক আর সাজগোজ নিয়ে মেতে আছেন। তবে উম্মে ইউসুফকে কিন্তু দাওয়াত দেওয়া হয়নি। উম্মে শওকি বেশ সতর্ক, তিনি চাননি এই বিয়ের সুযোগে কোনো পুরোনো ঝামেলা মিটুক। কিন্তু দাওয়াত না পেলেও উম্মে ইউসুফ বসে নেই; তিনি এখান থেকে এক টুকরো, ওখান থেকে এক টুকরো করে খবর জোগাড় করছেন যা দিয়ে সামনের পুরো মাস আড্ডা চালানো যাবে!

বিয়ের কিছুদিন আগে একদিন তিনি এসে বললেন, ‘ভালো খবর আছে গো! নাজিয়া বিয়ের জন্য রঙিন জামাকাপড়, নতুন জুতো আর মেকআপ কিনেছে। কালো পোশাক সব তুলে রেখেছে। শুরুটা তো ভালোই হলো একফোঁটা বৃষ্টি দিয়েই তো বর্ষার শুরু!’ সেই পরিচিত হাসি দিয়ে তিনি আবার চম্পট দিলেন। আরেকদিন এসে বললেন, ‘কাল নাজিয়াকে দেখলাম পার্লার থেকে ফিরছে, মুখে চওড়া হাসি। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বেশ হাসিমুখে কথা বলল। উম্মে শওকিকে আমি দেখে নেব, আর মাত্র একটা মাস সময় দাও আমাকে।’

এরপর পাড়ার অন্য মহিলাদের মুখে শুনলাম যে নাজিয়া আর উম্মে ইউসুফের বরফ গলেছে। ভাইয়ের বউ বিয়ের কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগে নাজিয়া মাঝে মাঝেই উম্মে ইউসুফের ঘরে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। আমরাও খেয়াল করলাম নাজিয়ার সাজপোশাক আগের সেই বিচ্ছিরি কালো রঙের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। 

একদিন সন্ধ্যায় উম্মে ইউসুফ তাড়াহুড়া করে এলেন। মা নাজিয়ার কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, ‘আরে ভাবি, সোয়াদের এই বিয়েটাই নাজিয়াকে বদলে দিয়েছে। এখনো লাল-সবুজ রংচঙে জামা পরে, চুলে সুগন্ধি মাখে, নখে নেইলপালিশ পরে। এখন আর মাসউদের কবরের কথা ওর মাথায় নেই। সুবহানাল্লাহ, কী পরিবর্তন! কনের সাজগোজ দেখে নাজিয়ার নিজের মনের সুপ্ত ইচ্ছাগুলো আবার জেগে উঠেছে, যা উম্মে শওকির সব পরিকল্পনার মূলে কুড়াল মারতে চলেছে।’

‘কাল নাজিয়াকে বললাম যে আমার এখন একটাই শখ তোমাকে কনে হিসেবে দেখা। তুমি শুধু একবার মুখ ফুটে বলো, আমি পাত্রের পুরো পল্টন হাজির করে দেব। নাজিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল ‘উম্মে ইউসুফ, তুমি সত্যিই আমার আপনজন। আমার ভালো যাতে হয় তুমি সেটাই করো’।

উম্মে ইউসুফের মুখে একটা ধূর্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘দেখো ভাবি, এটা তো প্রকৃতির নিয়ম, আর নাজিয়াও তো মানুষ। কসম খেয়ে বলছি, যতক্ষণ না নাজিয়ার বিয়ে দিয়ে উম্মে শওকির নাক মাটিতে ঘষছি, ততক্ষণ আমি শান্ত হচ্ছি না।’

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close