রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: শেষ ওভারের নাটকীয়তায় জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে সিরিজ টাইগারদের      হামে প্রাণ গেল আরও চার শিশুর, নতুন আক্রান্ত ১০৫১      ২০২৫ সালে বিএনপির আয় ২২ কোটি      রাতে শিরোপার মহারণে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-স্পেন      শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন      মেসি-ইয়ামালের ‘ফাইনাল শো’, টিকিটের সর্বনিম্ন দাম ৮ লাখ টাকা      ভিসা আবেদনকারীদের জন্য মার্কিন দূতাবাসের জরুরি সতর্কবার্তা      
জীবনানন্দ
কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ
মীন চন্দ্র নাথ
প্রকাশ: রোববার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

একটা মানুষ কতা সহজ ভাষায় লিখলে সেই ভাষাই একদিন কোটি মানুষের নিজের ভাষা হয়ে ওঠে? হুমায়ূন আহমেদের জীবন ও সাহিত্য সেই প্রশ্নের উত্তর। তিনি এমন এক লেখক, যাকে নিয়ে আলোচনা শুরু করলেই বারবার একটি শব্দ ফিরে আসে-জাদু। কেউ বলেন তিনি শব্দের জাদুকর, কেউ বলেন গল্প বলার জাদুকর, আবার কেউ মনে করিয়ে দেন, আক্ষরিক অর্থেও তিনি ছিলেন একজন জাদুকর, হাতের কৌশলে মানুষকে চমকে দেওয়া এক পারফর্মার। এই তিন জাদুই আসলে একই সূত্রে গাঁথা। হুমায়ূন আহমেদের গোটা জীবনটাই ছিল একধরনের মোহ তৈরির কারিগরি, যেখানে বাস্তবতা আর কল্পনার সীমারেখা ক্রমাগত মুছে যেত পাঠকের অগোচরে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় জন্ম নেওয়া কাজল নামের ছেলেটি ছোটবেলায় বিশেষ কৃতী ছাত্র ছিলেন না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর পড়াশোনার প্রতি তার ভেতরে যে আগ্রহ জন্মায়, তা তাকে টেনে নিয়ে যায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের মেধা তালিকার দ্বিতীয় স্থান পর্যন্ত, এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। রসায়নে স্নাতকোত্তর করা এই মানুষটি পরে আমেরিকার নর্থ ডাকোটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিমার বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন এবং দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা শুরু করেন। একজন রসায়নবিদের হাতে বাংলা কথাসাহিত্যের এমন এক বিপ্লব ঘটে যাবে, তা বোধহয় তিনি নিজেও তখন অনুমান করেননি।

১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ মুক্তিযুদ্ধের কারণে যা এক বছর দেরিতে আলোর মুখ দেখে। এই একটি বই-ই বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ। এরপর প্রায় চার দশক ধরে তিনি লিখে গেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, চিত্রনাট্য, গান- দুই শতাধিক গ্রন্থ, যার প্রতিটিই বাংলাদেশে সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৯০ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি একুশে বইমেলায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া লেখক ছিলেন তিনি- এমন ধারাবাহিকতা বাংলা প্রকাশনা- ইতিহাসে বিরল।

হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় কীর্তি সম্ভবত এই যে, তিনি বাংলা উপন্যাসকে পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক এক দীর্ঘ ঐতিহ্যের ছায়া থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূগোল, নিজস্ব ভাষাভঙ্গি আর নিজস্ব মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প শোনাতে শুরু করেন। তার গদ্য জটিল অলংকার এড়িয়ে চলত, বরং কথ্যভাষার সারল্যকে আশ্রয় করত। এই সারল্যই ছিল তার সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র- কননা সহজ ভাষায় লেখা সহজ মনে হলেও, সেই সারল্যের ভেতর দিয়ে গভীরতম মানবিক জটিলতাকে স্পর্শ করা মোটেও সহজ কাজ নয়। মার্কিন লেখক স্টাইনবেকের প্রভাব যার মধ্যে খুঁজে পান সমালোচকেরা, তিনি নিজের চরিত্রদের প্রতি এমন এক মমতা দেখাতেন যে, তার গল্পের ভিলেনরাও পাঠকের কাছে সম্পূর্ণ ঘৃণ্য হয়ে উঠত না। প্রত্যেকের মধ্যেই তিনি এক ধরনের মানবিক দুর্বলতা আর করুণা খুঁজে বের করতেন।

হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, রূপা- এই চরিত্রগুলো এখন আর নিছক সাহিত্যের পাতায় বন্দি নয়। হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ানো হিমু বাংলাদেশের কয়েক প্রজন্মের তরুণের কাছে এক জীবনদর্শনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যুক্তির চেয়ে যুক্তিহীনতাকে বেছে নেওয়া, নিয়মের বদলে খেয়ালকে প্রশ্রয় দেওয়া- হিমু আসলে হুমায়ূন আহমেদেরই এক ছায়া-প্রতিরূপ, যাকে তিনি বাস্তব জীবনে হতে পারেননি, কিন্তু কল্পনায় বারবার হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে মিসির আলির যুক্তিনিষ্ঠ, সংশয়ী চরিত্রটি আবার দেখায়- একই লেখকের কলমে পরস্পরবিরোধী দুটি জীবনদর্শনও কীভাবে সমান বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বাঁচতে পারে।

শুধু উপন্যাসেই থামেননি তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’-এর মতো ধারাবাহিক নাটক টেলিভিশনের পর্দাকেও বদলে দিয়েছিল। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির রায় ঘোষিত হওয়ার পর বাস্তবের ঢাকার রাস্তায় মানুষ মিছিল নিয়ে নেমেছিল, পোস্টার পড়েছিল গলিতে গলিতে- একজন লেখকের কলমের প্রভাব কতা গভীরে পৌঁছাতে পারে, তার এমন উদাহরণ বাংলা সংস্কৃতিতে বিরল। চলচ্চিত্রেও তার হাত সমান পোক্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘আগুনের পরশমণি’ দিয়ে শুরু, এরপর ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’-এর মতো কালজয়ী কাজ, আর ‘শ্যামল ছায়া’ ২০০৬ সালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিল।

তবে হুমায়ূন আহমেদের জীবনের এক কম আলোচিত অথচ চমকপ্রদ দিক হলো, তিনি লেখক হওয়ার আগে থেকেই একজন প্রকৃত জাদুশিল্পী ছিলেন। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় থেকেই জাদুচর্চা শুরু করেন, এবং ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে প্রথম জাদু প্রদর্শনী করেন-অর্থাৎ কথাশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ারও ঢের আগে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ম্যাজিশিয়ান হুমায়ূন’ নামে। বিশ্বখ্যাত জাদুশিল্পী জুয়েল আইচের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব এবং জাদুবিদ্যায় দক্ষতা অর্জনের পথে জুয়েল আইচের সহায়তা ছিল উল্লেখযোগ্য। ক্লোজআপ ম্যাজিকে, বিশেষত হাতসাফাই বা ‘পামিং’-এ তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ- কয়েন অদৃশ্য করে তা কারো কানের ভেতর বা চুলের ভাঁজ থেকে বের করে আনা, মুঠোবদ্ধ হাতের ওপর ছাই ঘষে সেই ছাই আশ্চর্যভাবে হাতের তালুতে ফুটিয়ে তোলা- এসব ছিল তার প্রিয় খেলা।

এই জাদুপ্রীতি তার জীবনযাপনেও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রকাশক মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে মিলে তিনি রসিকতা করে গড়ে তোলেন ‘এইচএম ম্যাজিশিয়ান কোম্পানি’, নুহাশপল্লী বা দখিন হাওয়ায় বিশেষ অতিথি এলেই যারা জাদু প্রদর্শন করত। ছেলের জন্মদিনে চীনা জাদুশিল্পীর ছদ্মবেশ নিয়ে অতিথিদের চমকে দেওয়া, কিংবা নিজের একষট্টিতম জন্মদিনে জুয়েল আইচকে জাদু দেখানো- এসব ঘটনা দেখায়, জাদু তার কাছে কেবল বিনোদন ছিল না, ছিল জীবনযাপনের একটা ধরন। বাস্তবতাকে সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে মানুষকে বিস্ময়ের ভেতর ফেলে দেওয়ার যে আনন্দ, তা তিনি মঞ্চে যেমন খুঁজে পেতেন, তেমনি খুঁজে পেতেন লেখার টেবিলেও। তার কলম আর তার জাদুর তাসের প্যাকেট-দুটোই আসলে একই সত্তার দুই হাতিয়ার।

হুমায়ূন আহমেদকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের বর্ণনায় বারবার উঠে আসে এক প্রাণবন্ত, খেয়ালি, রসবোধসম্পন্ন মানুষের ছবি- যিনি আমেরিকা ভ্রমণের মাঝপথে হঠাৎ দেশি কই মাছের ঝোল খাওয়ার ইচ্ছেয় টিকিট বদলে দেশে ফিরে আসতে পারতেন, যার কথাবার্তা নিয়ে সমসাময়িক লেখকেরাও মুগ্ধ হয়ে বলতেন, এসব সংরক্ষণ করা উচিত। অথচ এই একই মানুষ তার লেখায় বারবার মুখোমুখি হয়েছেন নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু, প্রেমের অপূর্ণতা আর মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব সংগ্রামের। হাস্যরস আর বিষাদ তার গদ্যে পাশাপাশি হাঁটত, কখনো কখনো একই বাক্যে। এই দ্বৈততাই তাকে নিছক জনপ্রিয় লেখকের গণ্ডি পেরিয়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী করে তোলে।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই ক্যান্সারের কাছে হার মেনে তিনি চলে যান। কিন্তু তার তৈরি চরিত্ররা, তার ভাষাভঙ্গি, এমনকি তার সংলাপের ছন্দ আজও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মুখে মুখে ফেরে। হিমুর মতো পোশাক পরে আজও তরুণেরা রাস্তায় নামে, মিসির আলির যুক্তিবাদিতা আজও পাঠকের চিন্তার খোরাক জোগায়। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সাফল্য বোধহয় এখানেই- তার সৃষ্টি যখন তার মৃত্যুর পরও পাঠকের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভাষা হয়ে থেকে যায়।

হুমায়ূন আহমেদ তাই কেবল একজন ঔপন্যাসিক, নাট্যকার বা চলচ্চিত্রকার ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন এক জাদুকর, যার হাতের কলম আর হাতের তাস- দুটো একই উদ্দেশ্যে কাজ করত। মানুষকে খানিকক্ষণের জন্য বাস্তবতার ভার থেকে মুক্তি দিয়ে বিস্ময়ের এক জগতে নিয়ে যাওয়া। সেই বিস্ময় ফুরিয়ে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও গভীর হয়ে বেঁচে আছে- এক অন্তহীন অনুরণনের মতো, যা মেলে ধরে কথার আসল জাদু।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close