হ্যাঁ গো, শুনছ? বউয়ের এমন সুমধুর মিষ্টি ডাক শুনেও রফিক ভয়ে আঁতকে ওঠে। হিসেবের খাতা থেকে মুখ তুলে মোলায়েম কণ্ঠে জানতে চায়- ‘কিছু বলবে?’ রোজিনা অর্থাৎ রফিকের বউ এবার কাছে এসে স্বামীর শরীর ঘেঁষে বসে, তারপর স্বামীর ডান হাতা টেনে নিয়ে আস্তে করে নিজের পেটের ওপর রাখে। রফিক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রোজিনার দিকে। রোজিনা বলে ‘দেখেছ কেমন দুষ্টু হয়েছে? পারলে এখনেই চলে আসে।
রফিক চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস প্রকাশের ভনিতা করে বলে ‘সবে তো ছয় মাস হলো, আরও কয়েকটা মাস অপেক্ষা করতে বল!’ রোজিনা এবার রফিকের কাঁধে মাথা রেখে ‘জান আমার না, খুব ছাগলের মাংস খেতে ইচ্ছা করছে, আনবে তো? রফিক ঠিক এই শঙ্কাটাই করছিল! কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রাগে যেন মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে ‘পেটে কী মানুষের বাচ্চা, নাকি রাক্ষস ঢুকেছে, এত খাই খাই কেন?’ কিন্তু মুখে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে ‘ঠিক আছে, কাল শুক্রবার সকালে গিয়ে আনব।’
হিসেবের টাকা থেকে বাড়তি কিছু টাকা বেরিয়ে যাবে ভেবে রফিক মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠে। ঠিক বুঝতে পারে না, রোজিনা গর্ভবতী হবার পর থেকে হঠাৎ এমন খাই খাই স্বভাবের হয়ে ওঠল কেন? এমনিতে এই টানাপোড়নের জীবনে রফিকের কাছে বাবা হওয়াটা কোনো উৎসব নয়, বরং দাম্পত্য জীবনের একটা অংশমাত্র। তার ওপর সন্তান গর্ভে আসার পর থেকে স্ত্রী রোজিনা অতিমাত্রায় ভোজন রসিক হয়ে ওঠার ব্যাপারটা রফিককে রীতিমতো অস্থির করে তুলছে! যদিও রফিক তার পূর্বের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানে, নারী গর্ভবতী হলে নানান ধরনের মানসিক সংকট তৈরি হয়, যার একটা হচ্ছে, খাদ্য রুচিতে পরিবর্তন, রফিকের স্পষ্ট মনে পড়ে, তার ছোট বেলার কথা, তখন তারা গ্রামের বাড়িতে থাক তো একান্নবর্তী পরিবার ছিল।
রান্না হতো এক হাড়িতে মাটির চুলাতে, হঠাৎ ঘটল এক রহস্যজনক ঘটনা, বাইরে রান্নার জন্য বসানো মাটির চুলা প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে কেউ নিয়ে যাচ্ছে! বাড়িতে শুরু হলো জোড় গুঞ্জন! কেউ বলছে ভূতের কাণ্ড, কেউ বলছে কালো জাদু করার জন্য এমনটা করছে। শেষ একদিন মায়ের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ল, ছোট চাচি, আবিষ্কার হলো তিনি পোয়াতি হয়েছেন, সন্তান গর্ভে আসার পর থেকে তিনি ভাত খেতে পারছেন না মোটেও। তবে চুলার মাটি গিলছেন দেদারসে! ঘটনাটা মনে পড়লেই রফিকের খুব হাসি পেত, কিন্তু আজ আর হাসি পেল না, বরং আপসোস হলো এই ভেবে যে, ‘মা-চাচিদের যুগে নারী গর্ভবর্তী হলে মাটি খেত, আর এই ডিজিটাল যুগে নারীরা গর্ভবতী হলে পোলাও-কোরমা খেতে চায়, তা স্বামীর অর্থনৈতিক অবস্থা যেমনই হোক না কেন!
রফিক সকাল সকাল রওনা দেয় চৌমুহনী বাজারের দিকে, এইদিক থেকে বাস-টেম্পোতে যাবার কোনো সুযোগ নেই, রিকশাতে গেলে ভাড়া আসবে ৬০ টাকা, আসা-যাওয়া ১২০ টাকা। এই কয়টা টাকা বাঁচাতে রফিক পায়ে হেঁটেই রওনা দেয় বাজারের দিকে। বেতনের টাকায় মাস চলে একেবারে কাটায়-কাটায়। তারপরেও বিপদ-আপদের কথা চিন্তা করে রফিক বেতন থেকে কিছু টাকা লুকিয়ে রাখে, সেই লুকানো টাকা থেকেই পোয়াতি বউয়ের ভুড়ি ভোজের আহার জোগাতে যাচ্ছে রফিক! স্বাভাবিকভাবেই মেজাজটা ভালো নেই।
সকাল হতেই রোদটাও বেশ চড়া হয়ে উঠেছে! এই রোদ মাথায় নিয়ে, পায়ে হেঁটে রফিক যখন চৌমুহনী বাজারে পৌঁছালে তখন বাজারটা বেশ জমে ওঠেছে। বিশেষ করে মাছ, মাংস আর আর মুরগির বাজার। মাছের বাজারটা ফেলেই যেতে হয় মাংসের বাজারে। ক্রেতা-বিক্রেতা মিলিয়ে বেশ জমজমাট! জবাই করা ছাগলগুলো কেউ ছাল ছড়াচ্ছে, আবার একদল উঁচু পাটাতনের ওপর বসে আছে দা-ছুরি নিয়ে, ক্রেতা দেখিয়ে দিচ্ছে, কসাই ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে পাল্লায় তুলছে। রফিক কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করল। তারপর ধীরপায়ে একটা কসাইয়ের দিকে এগিয়ে গেল, দামটা একবার জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থমকে গেল, কেমন জানি লজ্জা লাগছে, মনে হয় এখানে যারা খাসির মাংস কিনতে এসেছে তাদের কারো কাছেই টাকাটা কোনো সমস্যা না! সমস্যা হচ্ছে ভালো মানের মাংস। তারপরেও একবার নিচু স্বরে দামটা জিজ্ঞেস করে নিল এক কসাইয়ের কাছে। কসাই মুখে জমে থাকা পানের পিকগুলো ফেলে, একবার রফিকের দিকে তাকালো, তারপর শানপাথরে একবার ছুরিটা ঘষাঘষি করে বলে ওঠল ‘আগের ধর।’
উত্তর শুনে রফিক বিব্রত হয়ে পড়ে, কখন যে, খাসির মাংস কিনেছে? মনে করতে পারে না। অসহায়ভাবে কসাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সম্ভবত অবস্থা বুঝেই কসাই এবার বলে ওঠে ‘এক নম্বর ১২শ, দুই নম্বর এক হাজার; কনটা লইবেন?’ রফিক এবার আরও গভীর দ্বন্দ্বে পড়ে যায়, বুঝতে পারে না ছাগল তো ছাগলই, সেখানে আবার এক নম্বর দুই নম্বরের কী আছে! রফিক মনে সাহস সঞ্চয় করে কসাইয়ের কাছে জানতে চায় ‘ভাই এক নম্বর দুই নম্বর তো বুঝলাম না?’ কসাই বলে ওঠে ‘নতুন নাহি? এক নম্বর দুই নম্বর চিনে না, এক নম্বর হইলো ভেড়া ছাগল, আর দুই নম্বর হইলো ভেড়ি। হগল জায়গাতেই তো ভেড়ির দাম একটু কম, তয় খাইতে কিন্তু জব্বর মজা! নিজের ঘরেও তো ভেড়ি আছে, বোঝেন নিশ্চয়?’ শেষ কথাগুলো অনেকটা অশ্লীল ইঙ্গিতে বলেছে কসাই।
কথা শুনে রফিক বিরক্ত হয়। মনে মনে একটু হিসেব মিলিয়ে বলে ওঠে ‘ভাই আমারে দুই নম্বর থেকে এক কেজি দেন।’ বাজারে আসার আগে নিয়ত করে ছিল, আধা কেজি কিনবে, কিন্তু বেচা-বিক্রির হালহকিত দেখে সাহসই হলো না, আধা কেজি মাংস চাইতে। অন্যদের দু’চার কেজি ক্রেতার ভিড়ে এক কেজিটাকেই কেমন ফকিন্নি মনে হয় রফিকের কাছে। কসাই এবার নীরবে শানপাথরে ঘষে হাতের ছুরিটা একবার ধার করে, তারপর ঝুলিয়ে রাখা মাংসের উপরের অংশ থেকে এক খাবলা মাংস কাটতে থাকে, কসাইয়ের মাংস কাটা দেখে, রফিক চিৎকার করে বলে ওঠে:‘ ভাই কী দেন? এটা তো ছাগলের যৌনাঙ্গ!’ কসাই এবার মাংস কাটা সাময়িক বন্ধ রেখে রফিকের দিকে চোখ লাল করে তাকায়, তারপর গর্জন করে বলে ওঠে- কী কন না কন! ছাগলের সোনা কী মাংস না? কসাইয়ের কথা শুনে দোকানে বসা অন্য কসাইরাসহ উপস্থিত সকল ক্রেতারাই এক যোগে উচ্চস্বরে হো হো করে হেসে ওঠে। রফিক এবার প্রচণ্ড রাগ, লজ্জা আর অপমানে লাল হয়ে ওঠে। তারপরেও নিজেকে সামলে মাংসের পুঁটলিটা হাতে নিয়ে দ্রুত বাসার দিকে রওনা দেয়।
এই এক কেজি ওজনের মাংসের পোঁটলাটা বড় ভারী মনে হয় রফিকের কাছে! অপ্রত্যাশিতভাবে মাসের খরচ থেকে এক হাজারটা টাকা গচ্চা গেল, সেই সঙ্গে ফ্রিতে মিলল উপহাস। রফিক বাড়ির দিকেই হাঁটছে, তবে চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে, ওই কসাইয়ের দাঁত বের করা হাসি আর কানের কাছে ভাসছে সেই সংলাপ ‘ছাগলের সোনা কী মাংস না?’ রফিক রাগে ক্ষোভে অস্থির হয়ে ওঠে। একবার ইচ্ছা করে ওই কসাইদের মুখের ওপর মাংসের পুঁটলিটা নিক্ষেপে করে, পুঁটলিটা না নিয়েই চলে আসতে, কিন্তু সাহস হয় না। কথায় বলে গরিবের যত রাগ শুধু নিজের ওপর! এই রাগ নিয়েই রফিক ঘরে আসে, বউ তখন চিৎ হয়ে খাটের ওপর শুয়ে আছে।
বউয়ের এমন ভাবলেশহীন আয়েশি শোয়া দেখে রাগটা এবার বউয়ের ওপর গিয়ে পড়ে! গর্জন করে একটা ডাক দেয়, বউ দ্রুত ছুটে আসে, রফিক লক্ষ্য করেন বউয়ের দৃষ্টি তার মুখের দিকে নয় বরং হাতের দিকে! পুঁটলিটা দেখে একটা চওড়া হাসি দিয়ে হাত থেকে পুঁটলিটা নেয়, তারপর দ্রুত রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। রফিকের বড্ড ক্লান্ত লাগে, ফ্যানটা ছেড়ে সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসে। তারপর নিজেকে শান্ত করতে চায়। কিন্তু রাগটা কিছুতেই কমে না!
নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য, রিমোটটা টেনে নিয়ে এবার টিভি অন করে। খবরে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে, এক স্মার্ট তরুণ খবর পড়ছে, এক মন্ত্রী বলছে ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ুক জনগণের কোনো সমস্যা হবে না!’ আরেক মন্ত্রী বলছে ‘গমে পোকা আছে ঠিক, তবে মান খারাপ না।’ খবর দেখে রফিকের মাথা ঠান্ডা হওয়ার বদলে, আরও দ্বিগুণ হারে গরম হয়, ইচ্ছা করে আঁচাড় দিয়ে টিভি ভেঙে দিতে। টিভি বন্ধ করে রিমোট একপাশে ছুঁড়ে মারে। তারপর চোখ বুঁজে নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করে।
এভাবে কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর বউয়ের ডাক শুনে চোখ মেলে, দেখে বউ মুখ ভারী করে সামনে দাঁড়িয়ে আছে, রফিক তাকাতেই গর্জন করে বলে ওঠে ‘চোখ হাতে নিয়ে জিনিস কেন নাকি? মাংসের ভেতর এসব কী? রফিক এবার শান্তভাবে জবাব দেয় ‘ছাগলের সোনা কী মাংস না? রফিকের আকস্মিক জবাবে তার বউ অনেকটা হতবাক হয়ে যায়, মুখ মলিন করে দ্রুত ভেতরের রুমের দিকে চলে যায়। রফিক বুঝতে পারে, এই কথার কোনো জবাব ছিল না রফিকের বউয়ের কাছে। এই প্রথম রফিক বউকে কথা দিয়ে বোকা বানাতে পেরেছে। সে খুশি হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তার মনে কোনো আনন্দের অনুভূতি আসে না, বরং নিজেকে খুব অসহায়-অসহায় লাগে, মনে হয় চিৎকার করে কান্না করতে, কিন্তু তাও পারে না, পারলে হয় তো মনটা একটু হালকা হতো।
কেকে/ এমএস