নবারুণ ভট্টাচার্যকে (২৩ জুন ১৯৪৮-৩১ জুলাই ২০১৪) নিয়ে যা কিছু লেখা হয়েছে, তার প্রায় সবটাই ঘুরেফিরে দুটি প্রশ্নকে ঘিরে ঘুরপাক খেয়েছে। প্রথমত, তিনি আদতে কবি নাকি কথাসাহিত্যিক এই পরিচয়ের টানাপড়েন। দ্বিতীয়ত, বাম রাজনৈতিক বিশ্বাস আর সাহিত্যিক স্বাধীনতার মধ্যে তিনি কীভাবে একটা নিজস্ব ভারসাম্য খুঁজে নিয়েছিলেন। এ দুটো প্রশ্নকে পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যায়, নবারুণের গোটা রচনাসম্ভার আসলে একটামাত্র প্রচেষ্টার বিভিন্ন রূপ আর সেটি হলো প্রতিষ্ঠানের বীপরিতে দাঁড়িয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে লেখবার প্রচেষ্টা।
নবারুণকে নিয়ে গদ্যকার সুমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তার উপলব্ধিতে, ‘নবারুণ বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে এসেছিলেন মূল রাস্তা দিয়ে নয়, উলটোদিক দিয়ে। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’। বইয়ের নাম-পঙ্ক্তিটি আজ প্রবাদের মর্যাদা পেলেও, প্রকাশের সময় আশির দশকের কবিতা-পাঠক্রমে সেটি বিশেষ আলোড়ন তোলেনি। এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে, তারপর ২০১৬ ও ২০১৯ সালে আরও দুটি সংস্করণ। অর্থাৎ প্রথম বিশ বছরে একবারও পুনর্মুদ্রণের প্রয়োজন হয়নি, অথচ পরের কুড়ি বছরে চারবার। এ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, নবারুণের কবিতা তার নিজের সময়ে নয়, বরং একুশ শতকের গোড়ায় ‘হারবার্ট’ ও ‘কাঙাল মালসাট’-এর জনপ্রিয়তার পিঠে চড়ে নতুন পাঠক খুঁজে পেয়েছে।
এই বিলম্বিত স্বীকৃতির একটা কাঠামোগত কারণও আছে, যা সুমন্ত মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে গদ্যকার আর কবির পাঠক-সমাজ অনেকটাই আলাদা; ঔপন্যাসিকের কবিতা পড়ার রেওয়াজ কম। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর কিংবা সমরেশ বসুর কবিতা নিয়ে যেমন কেউ মাথা ঘামায় না, নবারুণও প্রথমে সেই একই উদাসীনতার শিকার হয়েছিলেন। ফারাক এই যে, তিনি নিজে মূলত কবি হিসেবেই যাত্রা শুরু করেছিলেন ষাটের দশকের শেষে, উপন্যাস লেখার বহু আগে থেকে।
নবারুণের কাব্য-বিকাশ বোঝার জন্য সবচেয়ে জরুরি নথি সম্ভবত তার কোনো প্রকাশিত বই নয়, বরং ১৯৬৯ সালের ডায়েরিতে লেখা অগ্রন্থিত পঙ্্ক্তিগুলো। সুমন্ত মুখোপাধ্যায় দুটি নমুনা তুলে দেখিয়েছেন একটি গদ্যছন্দে লেখা কাঁচা পঙ্ক্তি, আরেকটি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ষাটের দশকীয় ঢঙের অনুসারী পদ্য। এ দুই নমুনা থেকেই স্পষ্ট হয়, নবারুণ শূন্য থেকে নিজস্ব ভাষা তৈরি করেননি; বরং সমসময়ের প্রধান স্রোতগুলো-গদ্যকবিতার পরীক্ষা, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ীয় ছন্দ-সচেতনতা তাকেও স্পর্শ করেছিল। কিন্তু তিনি সেখানে থেমে থাকেননি। যে-পথ তিনি শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন, তা আশির দশকের প্রধান কাব্যধারা থেকেও আলাদা এবং প্রথাগত বামপন্থী কবিতা থেকেও ভিন্ন একটি ‘হারিয়ে যাওয়া জাতীয় সড়ক’, যেমনটা সুমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছেন।
বাংলা কবিতায় রাজনীতি ও নন্দনতত্ত্বের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। চারের দশকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কবিতাকে বুদ্ধদেব বসু কটাক্ষ করে বলেছিলেনকর্মী হবে না কবি, সেটা আগে ঠিক করতে হবে; স্লোগান দিয়ে কান্না কবিতা হয় না। ষাট-সত্তর-আশির দশকে সেই সরাসরি রাজনৈতিক কবিতার ধারা বাংলা কবিতা-পাঠকের বালিশের তলা থেকে কার্যত হারিয়েই গিয়েছিল। আশির দশকের প্রধান কবিরা এমন এক কবিতার সন্ধানে ছিলেন, যার ভেতর রাজনৈতিক ইশারা খেলা করবে ঠিকই, কিন্তু কবিকে কেউ সরাসরি রাজনৈতিক কর্মী বলে দাগিয়ে দেবে না।
নবারুণ এ কৌশলী মধ্যপথ নেননি। তিনি নিজেকে বারবার, প্রকাশ্যে, ঘোষণা করেছেন অতি-বামপন্থি রাজনৈতিক বিশ্বাসের অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে। এখানেই তার স্বাতন্ত্র্য আটের দশকের কবিতা যখন রাজনীতিকে ইশারায় মুড়ে রাখছে, নবারুণ তখন সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থান থেকে লিখছেন, অথচ তার কবিতা স্লোগান হয়ে পড়ছে না। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘স্ট্যালিন’ কবিতা যেমন খাঁটি রাজনৈতিক বিশ্বাসের জোরে কবিতা হয়ে উঠেছিল, নবারুণের কবিতাও সেই একই বিশ্বাসের জোরে বহুদূর উড়ে গেছে। তার কবিতার লাইনগুলি, সুমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়, পরিযায়ী পাখি বা শ্রমিকের মতো তিন-চার দশক লম্বা হাঁটতে ক্লান্ত বোধ করেনি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মনোজিৎকুমার দাসের রচনায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নবারুণ নিজেই একবার বলেছিলেন গদ্যের ইস্পাত-কঠিন ভাষা দিয়ে এমন কিছু বলা সম্ভব, যা কবিতায় বলা যায় না। এই উক্তিটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ইঙ্গিত দেয় যে তার কাছে কবিতা ও গদ্য দুটি আলাদা অস্ত্র একই রাজনৈতিক প্রত্যয়ের দুই ভিন্ন প্রকাশরূপ, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক।
গদ্যে অন্তর্ঘাত : হারবার্ট থেকে ফ্যাতাড়ু
নবারুণের গদ্যজীবন শুরু হয় ১৯৬৮ সালে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত ছোটগল্প ‘ভাসান’ দিয়ে, কিন্তু তার প্রকৃত সাহিত্যিক বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৯২-৯৩ সালে ‘হারবার্ট’ উপন্যাস প্রকাশের মধ্যদিয়ে। সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাস তাকে এনে দেয় নরসিংহ দাস (১৯৯৪), বঙ্কিম (১৯৯৬) ও সাহিত্য আকাদেমি (১৯৯৭) পুরস্কার। এরপর ‘কাঙাল মালসাট’ উপন্যাসে তার জনপ্রিয়তায় ঘটে প্রকৃত বিস্ফোরণ। এ দুটি রচনার হাত ধরেই একুশ শতকের নতুন পাঠক ফিরে তাকান তার পুরোনো কবিতার দিকে।
নবারুণের সবচেয়ে স্মরণীয় সৃষ্টি সম্ভবত ‘ফ্যাতাড়ু’ চরিত্রেরা উড়তে-পারা, ‘ফ্যাত ফ্যাত সাঁই সাঁই’ মন্ত্রে ভর করে হানা দেওয়া হতভাগ্য মানুষের প্রতিনিধিরা, যারা কখনো কালোবাজারিদের ভয় দেখায়, কখনো ভণ্ড সাহিত্যিকের মুখোশ খোলে। এ চরিত্ররা সাহিত্যের প্রথাগত নিয়ম ভেঙে ভাষা ব্যবহারে যতটা সাহসী, আচরণে ততটাই নির্ভীক। ‘ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক’ ও ‘ফ্যাতাড়ুর কুম্ভীপাক’ গল্প-সংকলন দুটিতে এই চরিত্রদের বিস্তার ঘটে এবং পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রকার সুমন মুখোপাধ্যায়ের হাতে ‘হারবার্ট’, ‘মহানগর কলকাতা’ ও ‘কাঙাল মালসাট’ ছবিতে এই জগৎ রূপালি পর্দাতেও পৌঁছে যায়।
নবারুণের জীবন ও রচনা মিলিয়ে দেখলে একটি সামঞ্জস্য চোখে পড়ে, যা নিছক কাকতালীয় নয়। বিজন ভট্টাচার্য ও মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র সন্তান হয়েও, এবং ঘোরতর রাজনৈতিক লেখা লিখেও, তিনি কখনো বাম বা ডান কোনো সরকারেরই কাছের মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি। নামি সংবাদপত্র বা জার্নালের জন্য তিনি লেখেননি, অথচ তার বলিষ্ঠ লেখনী তাকে পরিচিতি এনে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকেই। এই বিচ্ছিন্নতা তার কবিতা আর গদ্য দুটোতেই একই সুরে বাজে। যে-কবি আটের দশকের ‘নন্দন-চত্বরে’ ধরা দেননি, সেই একই মানুষ পরবর্তী জীবনে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য-বাজারেও নিজেকে বিক্রি করেননি।
এখানেই তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সাহিত্যিক অবস্থান একসূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। বিশ্বায়ন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিচ্ছেদ তাকে প্রভাবিত করেছিল বলে জানা যায়, অথচ তিনি কখনো মতাদর্শগত হতাশায় নিজের কলম থামাননি। বরং কঠোর বাস্তবতাকেই নিজস্ব আঙ্গিকে লিখে গেছেন আজীবন।
পরিচালক ও নাট্যকার সুমন মুখোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য নবারুণের সাহিত্যিক অবস্থানকে নিখুঁতভাবে ধরে ফেলে নবারুণের লেখায় যে তির্যক রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত এবং অনন্য রচনাশৈলী মিলেছিল, সমকালে তার কোনো জোড়া ছিল না; তিনি নিজেই একটি ধারার জন্ম দিয়েছিলেন, এবং সম্ভবত তার মৃত্যুতেই সেই ধারার সমাপ্তি ঘটেছে।
২০১৪ সালের ৩১ জুলাই অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে তার মৃত্যু হলেও, তার কবিতা ও গদ্য একুশ শতকের নতুন পাঠকের কাছে বরং আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এই বৈপরীত্যই বলে দেয়, নবারুণ ভট্টাচার্য কোনো সময়ের কবি বা ঔপন্যাসিক ছিলেন না তিনি ছিলেন প্রান্তিকতার কবি, যার কণ্ঠস্বর তার নিজের সময়ের চেয়ে পরবর্তী সময়ের পাঠকের কাছেই বেশি অনুরণিত হয়েছে।
কেকে/ এমএস