শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: হিমবাহ ধসে নেপালে ভয়াবহ বন্যা, মৃত্যু ছাড়াল ৪৬৯      আত্রাইয়ে পৌঁছেছে সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাতজনের মরদেহ      হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে প্রস্তাব ও ইন্টারপোলে রেড নোটিশের আবেদন      আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন দেখভালের দায়িত্বে ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-হুইপ      সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট      সেপ্টেম্বরে তফসিল, ডিসেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনের প্রথম ধাপ : সিইসি      সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘চিন্তিত’ স্পিকার      
জীবনানন্দ
বিশ্বমানবতার কবি নজরুল
শাহান সাহাবুদ্দিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪০ এএম
কাজী নজরুল ইসলাম। সংগৃহীত ছবি

কাজী নজরুল ইসলাম। সংগৃহীত ছবি

সভ্যতা ও মানুষের ইতিহাসে কোনো কোনো কবিকে তাদের সময়ের হিসেব ধরে দেখলে দেখাটি ত্রুটিপূর্ণ থেকে যায়; সময়েরও ঊর্ধ্বে তারা। যুগ তাদের জন্ম দেয় বটে, কিন্তু তারা পরবর্তী যুগগুলোর বিবেক হয়ে ওঠেন। বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি সভ্যতা এক-একজন কবিকে তার নৈতিক সাহসের প্রতীক হিসেবে বরণ করেছে। 

ইংল্যান্ড পেয়েছে লর্ড বায়রনকে, যিনি স্বাধীনতার জন্য কলম ও জীবন-দুটিই উৎসর্গ করেছিলেন। পার্সি বিশি শেলি মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে কাব্যে রূপ দিয়েছেন। ফ্রান্সে ভিক্টর হুগো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহিত্যকে করেছেন বিবেকের ভাষা। আমেরিকায় ওয়াল্ট হুইটম্যান মানুষের অসীম সম্ভাবনার গান গেয়েছেন। পারস্যে জালালউদ্দিন রুমি প্রেমকে ধর্মেরও ঊর্ধ্বে তুলে বিশ্বমানবতার ভাষা নির্মাণ করেছেন। লাতিন আমেরিকায় পাবলো নেরুদা নিপীড়িত মানুষের কান্নাকে কবিতার মর্যাদা দিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই বিচ্ছিন্ন সব আলোকধারার বহু বৈশিষ্ট্য যেন এক আশ্চর্য সমাবেশে এসে মিলেছে কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিত্ব, দর্শন, কীর্তি ও সৃষ্টিতে।

নজরুল বিদ্রোহের কবি-এই প্রচলিত পরিচয় তার পরিসরকে সংকুচিত করে। তিনি একই সঙ্গে প্রেমের কবি, সাম্যের কবি, সংগীতের সাধক, ধর্মীয় সম্প্রীতির দ্রষ্টা, ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক যোদ্ধা এবং সর্বোপরি মানুষের কবি। তার কাছে মানুষের পরিচয় ধর্মে নয়, বর্ণে নয়, জাতিতে নয়-মানুষে। তার কবিতা ‘মানুষ’-এর সেই মৌলিক মানবতাবাদ এবং কবিতায় উচ্চারিত মানুষের মর্যাদার ঘোষণা আজও আমাদের সভ্যতার অন্যতম জরুরি পাঠ।

আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব অগ্রসর হলেও নৈতিকতায় ততাই বিপন্ন। ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ড, জাতিগত বিদ্বেষ, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘ মিছিল, যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের কান্না, রাষ্ট্রীয় দমননীতি, মতপ্রকাশের সংকোচন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভয়াবহ বিস্তার-এই সবকিছু মিলিয়ে একবিংশ শতাব্দীর মানুষ আবারও এমন এক কণ্ঠস্বর খুঁজছে, যে তাকে বিভাজনের নয়, মিলনের ভাষা শেখাবে। সেই কারণেই নজরুল আজ ইতিহাসের স্মৃতি নন; তিনি সমকালীন প্রয়োজন। তার সৃষ্টি তার মহিমা ঘোষণা করছে এই ব’লে যে, সমকালেও তিনি ভীষণ প্রাসঙ্গিক।

নজরুলের বিদ্রোহ প্রতিহিংসার ভাষা নয়; তার বিদ্রোহ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার শপথ। তার অগ্নি  ধ্বংসের জন্য নয়, পরিশুদ্ধির জন্য। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি ঘোষণা করেন-‘মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত / আমি সেই দিন হব শান্ত...’। এই উচ্চারণ কী রাজনৈতিক বিদ্রোহের আহ্বান? তা নয়। এটি এমন এক নৈতিক অবস্থান, যেখানে কবি নিজের শান্তিকেও শর্তসাপেক্ষ করেছেন-যতদিন পৃথিবীতে অত্যাচার থাকবে, ততদিন তার বিদ্রোহও চলবে। 

বিশ্বসাহিত্যে এই নৈতিক দৃঢ়তার তুলনা খুঁজতে গেলে বায়রনের স্বাধীনতাবাদ, শেলির মুক্তিচেতনা কিংবা ভিক্টর হুগোর মানবিক প্রতিবাদের কথা মনে পড়ে; কিন্তু নজরুলের বিশেষত্ব হলো, তিনি বিদ্রোহকে প্রেম থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। তার হাতে রণতুর্য যেমন আছে, তেমনি আছে বাঁশি; তার কণ্ঠে বজ্র যেমন আছে, তেমনি আছে ভোরের পাখির গান।

এই জায়গাতেই নজরুল বিশ্বসাহিত্যে এক স্বতন্ত্র উচ্চতা অর্জন করেন। রুমি যেমন প্রেমকে আত্মার মুক্তি হিসেবে দেখেছেন, নজরুল প্রেমকে দেখেছেন সামাজিক মুক্তির শক্তি হিসেবেও। শেলি যেমন কল্পনার বিপ্লব ঘটিয়েছেন, নজরুল সেই বিপ্লবকে রক্তমাংসের মানুষের জীবনে নামিয়ে এনেছেন। বায়রন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার গৌরবগাথা লিখেছেন; নজরুল ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্যের প্রশ্নকে অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছেন। তার সাহিত্য তাই কেবল নান্দনিক নয়, নৈতিকও; কেবল কাব্যিক নয়, সভ্যতার আত্মসমালোচনারও এক দুর্লভ দলিল।

আজ যখন ধর্মের পরিচয় মানুষের পরিচয়কে গ্রাস করতে চায়, তখন নজরুলের গান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।’ এটিকে শুধু কবিতার পঙক্তি হিসেবে দেখব? না। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের সহাবস্থানের সাংস্কৃতিক সংবিধান। যে সমাজ এই উচ্চারণ ভুলে যায়, সে সমাজ অবশেষে নিজেরই বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

নজরুলের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই-তিনি কোনো একটি মতবাদের কবি নন। তিনি মানুষের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে, প্রেমের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে। ফলে প্রতিটি সময়, যখন সভ্যতা নিজেকে হারাতে বসে, তখন নজরুল নতুন করে ফিরে আসেন। এ ফিরে আসা তার বইয়ের পাতা থেকে নয়, মানুষের বিবেকের গভীরতম কক্ষ থেকে।

কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ কবি বললে তার পরিচয় কী সম্পূর্ণ হয়? তা হয় না, থেকে যায় ত্রুটিপূর্ণ। তিনি এমন এক সৃষ্টিশীল শক্তি, যার সাহিত্যিক সত্তা ভাষা, ভূগোল ও ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বমানবতার পরিসরে প্রবেশ করেছে। পৃথিবীর যে কজন কবি মানুষের মুক্তিকে ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা নয়, সভ্যতার চূড়ান্ত নিয়তি হিসেবে দেখেছেন, নজরুল তাদেরই উত্তরাধিকার। তিনি তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, উপমহাদেশের ইতিহাস, ইসলামী ঐতিহ্য, ভারতীয় পুরাণ, লোকসংস্কৃতি এবং আধুনিক মানবতাবাদের এক বিরল সমন্বয়।

লর্ড বায়রন গ্রিসের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। তার কবিতায় বিদ্রোহ ব্যক্তিস্বাধীনতার দীপ্ত ঘোষণাপত্র। পার্সি বিশি শেলি লিখেছিলেন, ‘কবিরাই বিশ্বের অস্বীকৃত আইনপ্রণেতা।’ এই ধারণার সবচেয়ে জীবন্ত প্রমাণগুলোর একটি যেন নজরুল নিজেই। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার আইন লেখেননি, কিন্তু মানুষের বিবেকের আইন রচনা করেছেন। তার কবিতা আদালতের রায়ের কপি নয়; তবু অত্যাচারীর বিরুদ্ধে মানুষের অন্তর্লোকের রায় হয়ে আজও উচ্চারিত হয়, অনাগত দিনে উচ্চারিত হতে থাকবে,সন্দেহ নেই।

ফরাসি মনীষী ভিক্টর হুগো একবার লিখেছিলেন, “যেখানে চিন্তা থেমে যায়, সেখানেই অত্যাচার শুরু হয়।” নজরুল তার সমগ্র সাহিত্যজীবন দিয়ে এই সত্যেরই সাক্ষ্য বহন করেছেন। ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদকীয় থেকে শুরু করে তার রাজনৈতিক কবিতা, প্রবন্ধ কিংবা কারাবন্দি অবস্থায় লেখা রচনাগুলো-সবখানেই স্বাধীন চিন্তার পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর শোনা যায়। তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’কে আত্মপক্ষসমর্থনের বয়ান ও যুক্তি হিসেবে দেখা সমীচীন হবে না। এটি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের স্বাধীন আত্মার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা।

বিশ্বসাহিত্যে প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার প্রসঙ্গ এলে জালালউদ্দিন রুমির নাম অনিবার্যভাবে আসে। রুমির প্রেম মানুষকে ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যায়; বিভেদের দেয়াল ভেঙে আত্মার ঐক্যে পৌঁছাতে শেখায়। নজরুলও প্রেমকে বিভাজনের বিপরীতে স্থাপন করেছেন, কিন্তু তার প্রেম আরও সামাজিক, আরও সংগ্রামী। তার কাছে প্রেম শুধুই আত্মার মুক্তি নয়; মানুষের মুক্তিও। তাই তিনি যেমন হামদ-নাত লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন শ্যামাসংগীত; যেমন ইসলামী সংগীত রচনা করেছেন, তেমনি লিখেছেন কীর্তনধর্মী গান। বিশ্বসাহিত্যে ধর্মীয় বহুত্ববাদকে শিল্পের এমন স্বাভাবিক ঐক্যে রূপ দিতে পেরেছেন--এমন কবির সংখ্যা সত্যিই বিরল।

এই কারণেই নজরুলকে কেবল মুসলিম জাগরণের কবি কিংবা কেবল বিদ্রোহের কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ করা তার প্রতি অবিচার। তিনি এমন এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন নির্মাণ করেছেন, যার এক প্রান্তে মক্কা, অন্য প্রান্তে বৃন্দাবন; একদিকে কারবালার বেদনা, অন্যদিকে কুরুক্ষেত্রের ধর্মসংকট; একদিকে আজান, অন্যদিকে শঙ্খধ্বনি। তার কাছে এগুলো কোনো সংঘর্ষের প্রতীক নয়, বরং মানুষের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য।

আমেরিকার কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান সাধারণ মানুষকে কবিতার কেন্দ্রে এনেছিলেন। নজরুলও অভিজাত সমাজের নয়, পথশিশু, শ্রমিক, কৃষক, মজুর, ক্ষুধার্ত, নিপীড়িত মানুষের ভাষাকে সাহিত্যিক মর্যাদা দিয়েছেন। তার ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় তিনি ঘোষণা করেন “গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” এই উচ্চারণ বাংলা সাহিত্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বমানবতার অন্যতম শক্তিশালী নৈতিক ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ এখানে সাম্য কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক সত্যের অমোঘ প্রকাশ।

লাতিন আমেরিকার পাবলো নেরুদা নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে কবিতাকে প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন। আফ্রিকান-আমেরিকান কবি ল্যাংস্টন হিউজ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মানুষের মর্যাদার পক্ষে লিখেছিলেন। তাদের মতো নজরুলও সাহিত্যকে ক্ষমতার অলংকার করেননি; করেছেন প্রতিবাদের শিখা। তবে তার স্বাতন্ত্র্য হলো, প্রতিবাদের পাশাপাশি তিনি মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার প্রদীপও জ্বালাতে চেয়েছেন। তাই তার সাহিত্য কখনো ঘৃণার রাজনীতি শেখায় নি; শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা এবং মানুষের প্রতি অগাধ মমত্ব।

আজকের পৃথিবী আবারও যুদ্ধ, ধর্মীয় উগ্রবাদ, উদ্বাস্তু সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর একাকিত্বে আক্রান্ত। ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপ, ইরানের ওপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অনৈতিক ও বর্বরোচিত আগ্রাসন, ইউক্রেনের যুদ্ধ, আফ্রিকার দুর্ভিক্ষ, এশিয়ার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ অন্ধকারের প্রবল বিস্তার কিংবা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘৃণার রাজনীতি-সবকিছু যেন আমাদের নতুন করে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: মানুষ কি সত্যিই সভ্য হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা আবারও নজরুলের কাছে ফিরে আসি। কারণ তিনি আমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে বলছেন-সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় শক্তিতে নয়, মানবতায়; ধর্মে নয়, ন্যায়ে; প্রতিশোধে নয়, প্রেমে।

এই কারণেই নজরুল কেবল অতীতের স্মারক নন। তিনি ভবিষ্যতেরও কবি। তার সাহিত্য যত বেশি পাঠ করা হবে, পৃথিবী তত বেশি বুঝতে পারবে-বাংলা ভাষা কেবল রবীন্দ্রনাথকে নয়, মানবমুক্তির আরেক মহত্তম কণ্ঠস্বরকেও পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে।

একটি সভ্যতার প্রকৃত সংকট তখনই শুরু হয়, যখন সে তার কবিদের কেবল স্মরণ করে, কিন্তু তাদের চিন্তা, সৃষ্টি ও দর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। আমরা নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছি, তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করি, তার গান গাই, কবিতা আবৃত্তি করি; কিন্তু তার মানবতাবাদ, সাম্যচেতনা, ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আপসহীন নৈতিক সাহসকে জীবনের অংশ করতে পেরেছি-এই প্রশ্নের উত্তর তো সহজে দেওয়া যাবে না। যে সমাজে ধর্মের নামে মানুষকে হত্যা করা হয়, মতের ভিন্নতার কারণে মানুষকে অপমান করা হয়, দুর্বল মানুষের অধিকার পদদলিত হয় এবং ক্ষমতা ন্যায়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, সেখানে নজরুলকে কেবল স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়; তাকে পুনরাবিষ্কার করাও অপরিহার্য।

নজরুলের সাহিত্যকে যদি একটি শব্দে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে সেই শব্দটি হবে-মুক্তি। কিন্তু তার মুক্তি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার নয়; মানুষের অন্তরের মুক্তি, বিবেকের মুক্তি, কুসংস্কার থেকে মুক্তি, সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্তি, দারিদ্র্য ও শোষণ থেকে মুক্তি। এই কারণেই তার রচনায় একই সঙ্গে বিদ্রোহ ও ভক্তি, প্রেম ও প্রতিবাদ, ইসলাম ও শাক্তভাবনা, কৃষ্ণ ও কারবলা, শিব ও মুহাম্মদ (সা.)-সবকিছু সংঘর্ষে নয়, এক গভীর মানবিক ঐক্যে মিলিত হয়েছে।
এই মানবিক ঐক্যই তাকে বিশ্বসাহিত্যে স্বতন্ত্র করে। 

লর্ড বায়রন স্বাধীনতার কবি, পার্সি বিশি শেলি কল্পনার বিপ্লবী, ভিক্টর হুগো ন্যায়বিচারের সাহিত্যিক, জালালউদ্দিন রুমি প্রেমের মরমি, ওয়াল্ট হুইটম্যান গণমানুষের কণ্ঠ, পাবলো নেরুদা নিপীড়িতের কবি--কিন্তু নজরুলের মধ্যে এই সব ধারার এক বিরল সংলাপ ঘটে। তিনি কোনো এক ধারার প্রতিনিধি নন; তিনি বহুস্বরের সমন্বয়। তাই তাকে কেবল তুলনা দিয়ে বিচার করলে তার মহত্ত্বের একটি অংশই ধরা পড়ে; তার প্রকৃত স্বরূপ ধরা পড়ে তার স্বাতন্ত্র্যে।

আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ অভিযান কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতি মানুষের জীবনকে বদলে দিলেও মানুষের মৌলিক সংকট বদলায়নি। যুদ্ধ এখনো আছে, ক্ষুধা এখনো আছে, বর্ণবাদ এখনো আছে, ধর্মীয় উগ্রবাদ এখনো আছে, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘ মিছিল এখনো আছে। সভ্যতার বাহ্যিক উন্নতির আড়ালে মানুষের হৃদয়ে যে অন্ধকার, সেই অন্ধকার ভেদ করার জন্যই নজরুল প্রয়োজন। কারণ তিনি মানুষকে ভয় নয়, সাহস সঞ্চয় করতে শিখিয়েছেন; ঘৃণা নয়, ভালোবাসা শিখিয়েছেন; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বোধ শিখিয়েছেন।

নজরুলের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি। তিনি কোনো ধর্মকে ছোট করেননি, কোনো বিশ্বাসকে অবমাননা করেননি; বরং সব বিশ্বাসের অন্তর্নিহিত মানবিক সত্যকে খুঁজেছেন। এই কারণেই তার সাহিত্য আজকের পৃথিবীতে আন্তঃধর্মীয় সংলাপেরও এক মূল্যবান ভিত্তি হতে পারে। যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ধর্ম পরিচয়ের অস্ত্রে পরিণত হয়, তখন নজরুল ধর্মকে মানুষের নৈতিক উৎকর্ষের ভাষায় ফিরিয়ে আনেন।

নজরুলের জীবন ছিল অসমাপ্ত সম্ভাবনার এক বেদনাময় ইতিহাস। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সেই তার সৃষ্টিশীল জীবন কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। শেক্সপিয়ার, দান্তে, গ্যেটে, রুমি, বায়রন, নেরুদা কিংবা হুইটম্যানকে যেমন বিশ্বমানবতার উত্তরাধিকার হিসেবে পাঠ করা হয়, তেমনি নজরুলকেও নতুন অনুবাদ, নতুন গবেষণা এবং নতুন ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কারণ তার সাহিত্য কেবল বাংলার নয়; তার মানবতাবাদ সমগ্র পৃথিবীর। সেই কারণেই তাকে এভাবে চিহ্নিত করা সহজ-সমকাল নয়,প্রতিটি কালই নজরুলের কাল। তার অগ্নিবীণা এখনো নীরব হয়নি; মানুষের মুক্তির স্বপ্ন যতদিন জীবিত থাকবে, ততদিন তার তারে অনিবার্যভাবেই ধ্বনিত হবে বিদ্রোহ, সাম্য, প্রেম ও মানবতার চিরন্তন সংগীত।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close