উনিশ শতকের ফরাসি সাহিত্যে এমন কিছু নাম আছে, যাদের লেখা সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রতিটি প্রজন্মের কাছে নতুন করে ফিরে আসে। আলেকজান্ডার ডুমা তেমনই একজন লেখক, যার নাম উচ্চারণ করলেই মনে ভেসে ওঠে দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স-এর তরবারির ঝনঝনানি কিংবা দ্য কাউন্ট অব মন্টে ক্রিস্টো’র প্রতিশোধস্পৃহ নায়ক এদমন্দ দাঁতেসের মুখ। কিন্তু ডুমার সাহিত্যকীর্তি নিয়ে যত সহজে পাঠকসমাজ মুগ্ধ হয়েছে, সাহিত্য সমালোচকদের কাছে তার মূল্যায়ন ততা সরল হয়নি। জনপ্রিয়তা আর সাহিত্যিক গুরুত্বের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব উনিশ শতকের ইউরোপীয় সাহিত্যে বারবার দেখা দিয়েছে, ডুমা যেন তারই এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
১৮০২ সালে ফ্রান্সের ভিলার-কতরে শহরে জন্ম নেওয়া ডুমার রক্তে মিশেছিল এক বিরল ইতিহাস। তার দাদা ছিলেন নরম্যান্ডির এক অভিজাত, আর দাদি মারি-সেসেৎ ডুমা ছিলেন হাইতির এক ক্রেওল নারী, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। ডুমার বাবা টমাস-আলেকজান্ডার ডুমা নেপোলিয়নের বাহিনীতে জেনারেলের পদে উঠেছিলেন, ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসে সেই সময়কার সর্বোচ্চ পদাধিকারী আফ্রিকান বংশোদ্ভূত সেনানায়ক হিসেবে। বাবার অকালমৃত্যুর পর দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা ডুমা তরুণ বয়সে প্যারিসে পাড়ি জমান, অনেকটা তারই সৃষ্ট চরিত্র দার্তাইনিয়ার মতো, ভাগ্য অন্বেষণে। মিশ্র বর্ণপরিচয় সারাজীবন তাকে তাড়া করেছিল; নিজের বংশপরিচয় নিয়ে কটাক্ষের জবাবে তিনি একবার বলেছিলেন যে তার বাবা ছিলেন মিশ্র বর্ণের, দাদা কৃষ্ণাঙ্গ, আর প্রপিতামহ ছিলেন এক বানর- অর্থাৎ তার বংশপরিচয় যেখানে শুরু, শ্রোতার বংশপরিচয় সেখানেই শেষ। এই তীক্ষ্ণ রসিকতার আড়ালে যে আত্মমর্যাদাবোধ লুকিয়ে ছিল, তা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যের নায়কদের চরিত্রেও ফিরে এসেছে বারবার- প্রান্তিক, অপমানিত, অথচ শেষ পর্যন্ত ন্যায়ের পক্ষে বিজয়ী।
ডুমার সাহিত্যজীবনের সূচনা নাট্যকার হিসেবে। ১৮২৯ সালে মঞ্চস্থ তার নাটক অঁরি ত্রোয়া এ সা কূর ফরাসি রোমান্টিক নাট্যধারার প্রথম বড় সাফল্য, যা ভিক্তর হুগোর বিখ্যাত এর্নানি নাটকেরও আগে মঞ্চে এসেছিল। সেই সময় ডুমা আর হুগো একসঙ্গে ফরাসি নাট্যচর্চায় নতুন এক ধারা নিয়ে আসেন, যেখানে ফরাসি ক্লাসিক্যাল ঘরানার কঠোর নিয়মকানুন ভেঙে শেক্সপিয়রীয় ঢঙে ট্র্যাজেডি, কমেডি আর কাব্যিক গদ্যকে একই আঙিনায় মিলিয়ে দেওয়া হয়। দুজনেই ছিলেন সমবয়সী, দুজনেরই বাবা নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর জেনারেল, আর দুজনেই কুড়ির কোঠায় খ্যাতি অর্জন করেন। এই সাদৃশ্য এবং সমসাময়িকতা তাদের মধ্যে একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বন্ধুত্ব- দুটোই তৈরি করেছিল, যা ফরাসি সাহিত্যের ইতিহাসে সুবিদিত।
১৮৪০-এর দশকে ডুমা ক্রমশ ধারাবাহিক উপন্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা সেকালের সংবাদপত্রে ফ্যেতো বা কিস্তিতে কিস্তিতে প্রকাশিত হতো। এই সময়েই ইতিহাসবিদ ও কাহিনি-বিন্যাসে দক্ষ ওগ্যুস্ত মাকে’র সঙ্গে তার সহযোগিতা শুরু হয়, যার পরিকল্পনা ও গবেষণা দ্য কাউন্ট অব মন্টে ক্রিস্টো এবং দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স-এর মতো উপন্যাসের কাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সহলেখকত্ব নিয়ে পরবর্তীকালে অনেক সমালোচনা হয়েছে- কেউ কেউ বলেছেন ডুমা আসলে একটি সাহিত্য-কারখানার মালিক ছিলেন, যেখানে ভুতুড়ে লেখকদের শ্রমে তার নামের তলায় বইয়ের পর বই বেরিয়েছে। এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অমূলক নয়, কিন্তু এটাও সত্য যে চূড়ান্ত রূপ, সংলাপের প্রাণবন্ততা আর কাহিনির গতিময়তা ডুমার নিজস্ব প্রতিভারই স্বাক্ষর বহন করে, যা তার সহলেখকদের রচনায় সচরাচর অনুপস্থিত ছিল।
ডুমার প্রতি সমকালীন সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের প্রতিক্রিয়া ছিল বহুমুখী। ভিক্তর হুগো নিজেই ডুমার নাট্যপ্রতিভার প্রশংসা করে লিখেছিলেন যে, যদি কোনো সৃষ্টিশীল মস্তিষ্ক আখ্যানধর্মী উপন্যাস বা পত্রোপন্যাসের বদলে এক ধরনের নাট্যরূপী রোমান্স রচনা করত, যেখানে বাস্তব জীবনের ঘটনাপ্রবাহের মতোই দৃশ্যের পর দৃশ্য উন্মোচিত হতো, তবে তা-ই হতো এক দীর্ঘ নাটক, যার বর্ণনাই হতো তার মঞ্চসজ্জা ও পোশাক। হুগোর মতে ডুমা এই আদর্শকে হুগোর নিজের চেয়েও ব্যাপকভাবে বাস্তবায়িত করতে পেরেছিলেন। ১৮৭০ সালে ডুমার মৃত্যুর পর হুগো আরও একধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেন যে আলেকজান্ডার ডুমার নাম কেবল ফরাসি নয়, তা ইউরোপীয়, এমনকি ইউরোপীয়ও নয়, তা সর্বজনীন। এই মূল্যায়ন নিছক বন্ধুত্বসুলভ ভদ্রতা ছিল না; ডুমার রচনা যে ভাষা ও সীমানার প্রাচীর ভেঙে এক বৈশ্বিক পাঠকসমাজ তৈরি করেছিল, হুগো তা স্পষ্ট উপলব্ধি করেছিলেন।
তবে সব সমালোচকই ডুমাকে এত উঁচু আসনে বসাননি। উনিশ শতকের ফরাসি সাহিত্য-বিতর্কে সিরিয়াস সাহিত্য বনাম জনপ্রিয় ফ্যেতো উপন্যাসের যে বিভাজন তৈরি হয়েছিল, ডুমা তার কেন্দ্রেই ছিলেন। অনেক সমালোচকের চোখে তার রচনা ছিল নিছক বিনোদনমূলক, রাজনৈতিক বা দার্শনিক গভীরতাবর্জিত, আর সহলেখকনির্ভরতার কারণে তা প্রকৃত সাহিত্যমর্যাদা পাওয়ার যোগ্য নয় বলেও মনে করা হতো। হুগোর সঙ্গে তুলনা করে বলা হতো, হুগোর প্রভাব ছিল সমগ্র শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত ও গভীর, আর ডুমা থেকে গেলেন একজন মহান বিনোদনদাতা হিসেবেই। ইংরেজ প্রাবন্ধিক অ্যান্ড্রু ল্যাং অবশ্য এই সরলীকৃত মূল্যায়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার লেটার্স টু ডেড অথর্স গ্রন্থে ডুমার রচনায় এক ধরনের বিচক্ষণ নৈতিক সংযমের কথা উল্লেখ করেন- রোমাঞ্চ আর দুঃসাহসিকতার মোড়কে ডুমা কখনো নিম্নরুচির প্রলোভনে পা দেননি, যা তাকে নিছক সস্তা জনরঞ্জক লেখকের কাতার থেকে আলাদা করে।
ডুমার জীবন ও রচনার সঙ্গে জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্নটিও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। তার মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল তাকে প্যারিসের প্যানথেয়নে সমাহিত করা হয়নি, যেখানে হুগো নিজে শায়িত ছিলেন প্রায় দেড়শ বছর ধরে। ২০০২ সালে তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট জাক শিরাক নির্দেশ দেন ডুমার দেহাবশেষ ভিলার-কতরের পারিবারিক সমাধি থেকে তুলে প্যানথেয়নে স্থানান্তরের, আর ২০০৪ সালে এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তা সম্পন্ন হয়। শিরাক তার ভাষণে স্বীকার করেন যে বর্ণবিদ্বেষের কারণে ডুমার প্রাপ্য সম্মান বহু বছর বিলম্বিত হয়েছিল, আর এই স্থানান্তর সেই ঐতিহাসিক অন্যায়ের একটি প্রতীকী সংশোধন।
মাস্কেটিয়ারদের সেই বিখ্যাত শপথবাক্য- সবাই একজনের জন্য, একজন সবার জন্য- আঁকা নীল মখমলের কাপড়ে মোড়া কফিন যখন প্যানথেয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন হাজারো ভক্ত হাতে দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স আর দ্য ম্যান ইন দি আয়রন মাস্ক নিয়ে সেই মিছিলে শামিল হয়েছিলেন। শিরাক সেদিন বলেছিলেন যে ডুমার সঙ্গে যেন প্যানথেয়নে প্রবেশ করছে ফরাসিদের শৈশব, লুকিয়ে পড়া বইয়ের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো, আবেগ, উদ্দীপনা, দুঃসাহস আর সেই বিশেষ প্রাণবন্ত সাহসিকতা, যাকে ফরাসিতে বলা হয় পঁনাশ। সাম্প্রতিক কালে টম রাইসের জীবনীগ্রন্থ দ্য ব্ল্যাক কাউন্ট, যা ডুমার বাবা টমাস-আলেকজান্ডারের অসামান্য জীবন নিয়ে রচিত, নতুন করে আলোচনায় এনেছে কীভাবে পিতার সংগ্রাম আর অপমানের ইতিহাস পুত্রের সাহিত্যকল্পনায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে- বিশেষত মন্টে ক্রিস্টোর প্রতিশোধ-আখ্যানে, যেখানে অন্যায়ের শিকার এক মানুষ ধৈর্য আর কৌশলে নিজের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করে।
ডুমার সাহিত্যিক প্রভাব ফরাসি সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বসাহিত্যে গভীরভাবে বিস্তৃত হয়েছে। তার উপন্যাস পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে, আর দুঃসাহসিক অভিযান-উপন্যাসের যে আধুনিক আঙ্গিক আজ আমরা চিনি- রুদ্ধশ্বাস কাহিনি-বিন্যাস, নাটকীয় দ্বন্দ্ব, ঐতিহাসিক পটভূমিতে কাল্পনিক নায়ক- তার ভিত্তি অনেকাংশে ডুমার হাতেই গড়ে উঠেছে। পরবর্তীকালের গোয়েন্দা কাহিনি থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক রোমাঞ্চ-উপন্যাস পর্যন্ত বহু ধারার লেখক তার কাছে ঋণী। চলচ্চিত্র ও নাটকে তার কাহিনির অসংখ্য রূপান্তর আজও দর্শকপ্রিয়তা ধরে রেখেছে, যা প্রমাণ করে তার গল্প বলার কৌশলতা কালোত্তীর্ণ।
আজকের দৃষ্টিতে ফিরে তাকালে ডুমাকে নিয়ে সাহিত্য সমালোচনার যে দ্বন্দ্ব উনিশ শতকে শুরু হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি মেটেনি। তিনি কি নিছক এক দক্ষ কাহিনিকার, নাকি গভীরতর অর্থে সাহিত্যিক প্রতিভা- এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে সাহিত্যের সংজ্ঞা কতা প্রসারিত করে দেখা হচ্ছে তার ওপর।
তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, জনপ্রিয়তা আর সাহিত্যিক গুরুত্ব যে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একই সৃষ্টিতে সহাবস্থান করতে পারে, ডুমার জীবন ও রচনা তারই একটি স্থায়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এক প্রান্তিক পরিচয় থেকে উঠে আসা এক লেখক, যিনি নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রামকে রূপান্তরিত করেছিলেন এমন সব চরিত্রে, যারা আজও পৃথিবীজুড়ে অগণিত পাঠকের কল্পনায় তরবারি হাতে বেঁচে আছে।
কেকে/ এমএস