বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কবি কাজী নজরুল ইসলাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো বাংলা সাহিত্যাকাশে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার চেতনায় ছিল দাসত্ব মুক্তির অঙ্গীকার ও ধনতন্ত্রের বিষাক্ত ক্লেদমুক্ত এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্নক্রোড়। আর তাই তো তার কবিতা, গান, প্রবন্ধে আমরা দেখতে পাই- যেখানে আঘাত করার দরকার, তিনি ঠিক সেখানেই আঘাত করেছেন।ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ বেনিয়া শাসকগোষ্ঠী তার বেশ কয়েকটি কবিতা ও প্রবন্ধের বই বাজেয়াপ্ত করেন। (১৯২২ সাল থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত কাজী নজরুল ইসলামের পাঁচটি বই বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১. বিষের বাঁশি (১৯২৪), ২. ভাঙার গান (১৯২৪) ৩. প্রলয় শিখা (১৯৩০), ৪. চন্দ্রবিন্দু (১৯৩১), ৫. যুগবাণী (প্রবন্ধগ্রন্থ, ১৯২২)।
‘অগ্নিবীণা’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এ গ্রন্থটিতে বিদ্রোহের যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সঞ্চারিত হয়েছে, তা যেন রক্ত ক্ষরিত এক কবির বিদ্রোহী সত্তায় জাগ্রত মনের নন্দিত উদ্ভাস। এখানে বলা যেতেই পারে- ‘অগ্নিবীণা’ শুধুমাত্র একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং এটি একটি জাতির আবেগ ইতিহাস। এটি কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নজরুলের আনুষ্ঠানিক কাব্যিক উচ্চারণ। এটি একদিকে যেমন পরাধীন জাতির মানসিক দাসত্ব উৎপাটনে এক মহান বিপ্লবের বলিষ্ঠ ইশতেহার, তেমনি অন্যদিকে ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন অঙ্গীকার।
‘অগ্নিবীণা’ ১৯২২ সালের ২৫ অক্টোবর
আর্য পাবলিশিং হাউস, ১৫/১৬ কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত) থেকে প্রকাশিত হয়। বইটির প্রচ্ছদের পরিকল্পনায় ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং এঁকেছিলেন বীরেশ্বর সেন। এ গ্রন্থে মোট বারোটি কবিতা সংকলিত হয়েছে। কবিতাগুলো হলো- আগমনী, আনোয়ার, বিদ্রোহী, প্রলয়োল্লাস, কামাল পাশা, ধূমকেতু, কোরবানি, রক্তাম্বরধারিণী মা, খেয়াপারের তরণী, মোহররম, রণ-ভেরী, শাত-ইল-আরব।

‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা, মানবতাবাদ, দেশপ্রেম এবং ঐতিহ্যচেতনার নান্দনিক প্রোজ্জ্বল এক অনন্য সমন্বয় ঘটেছে। গ্রন্থটির উৎসর্গে লেখা ছিল- ‘বাঙলার অগ্নিযুগের আদি পুরোহিত সাগ্নিক বীর শ্রী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ শ্রী শ্রী চরণারবিন্দেষু।’ এর নিচে লেখা ছিল- ‘তোমার অগ্নি পূজারি-হে-মহিমান্বিত শিষ্য কাজী নজরুল ইসলাম।’ অরবিন্দ ঘোষের ভ্রাতা বারীন্দ্রকুমার ঘোষ বাংলা তথা ভারতের বিপ্লববাদী আন্দোলনের অন্যতম নায়ক ছিলেন। বিপ্লববাদী কবি নজরুল তাই নিজেকে বারীন্দ্রকুমারের ‘হে মহিমান্বিত শিষ্য’ বলে উল্লেখ করে তাকেই তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন। বলার আর অপেক্ষা নেই যে, বারুদ ভর্তি শব্দে তরঙ্গায়িত প্রতিটি পংক্তির দীপ্তিমান এক সোনালী সূর্যের নাম ‘অগ্নিবীণা’। এ কথা অনস্বীকার্য যে, এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমেই মানুষের মুখে মুখে নজরুল হয়ে উঠেছিলেন এক মহান ‘বিদ্রোহী কবি’। আমরা জানি- একজন কবির দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর করে তার সমসাময়িক অবস্থা বা প্রেক্ষাপটের ওপর। কোনো সচেতন শিল্পী তার সময় ও সমাজকে কখনোই অস্বীকার করতে পারেন না। কবি কাজী নজরুল ইসলামও এর ব্যতিক্রম নন। কাজী নজরুল ইসলাম দেশের এমন এক সংকটময় মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন দেশের মানুষের মধ্যে এক মহান আবেগ ও প্রাণময়তায় মুক্তির সংগ্রামী স্লোগান আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল। ফলে এইসব দৃঢ়চেতা আন্দোলন সংগ্রামের প্রভাব পড়েছে তার কাব্যে। তিনি দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার নেশায় হয়ে উঠেছিলেন উন্মাদ। দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে হয়েছেন মহাবিদ্রোহী। সাহিত্যের কালজয়ী আবেদন এবং প্রবহমান প্রাসঙ্গিকতার বিচারে তিনি যুগোত্তীর্ণ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) পরবর্তীকালে সমগ্র পৃথিবীতে যখন অশান্তি, বিক্ষুব্ধ, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিকভাবে মানুষ হতাশায় বিপর্যস্ত, এমনই এক টানাপোড়নের সময়ে কবি নজরুল হয়ে ওঠলেন এক নতুন দিগন্তের অভিযাত্রী। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ যখন ভারতবর্ষ, স্বাধীনতার প্রত্যাশায় ব্যাকুল যখন জনগণ, ব্রিটিশ সরকারের দমন-পীড়নে অতিষ্ঠ যখন গোটা জাতি, তখন নজরুলের কণ্ঠে বিদ্রোহ আর ভাঙ্গনের আহ্বান বেজে উঠলো। তিনি প্রথাগত বৃত্ত ভেঙে বিপ্লবী চেতনায় সচকিত সত্য সুন্দরের আলোকিত স্পর্শে এক অভূতপূর্ব দ্যোতিত সত্তা নিয়ে প্রবেশ করলেন কবিতার নান্দনিক অঙ্গনে। তিনি একে একে লিখতে লাগলেন- বিদ্রোহী, আনোয়ার, কামাল পাশা, ধূমকেতু’র মতো প্রলয়ংকরী সব কবিতা। আর এসব কবিতা ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে গাঁটবদ্ধ হয়ে এক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হলো।
তিনি বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন-
‘বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!’
(বিদ্রোহী)
অর্থাৎ প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ হিমালয়ের চূড়াও যেন মানুষের আত্মশক্তির কাছে নতজানু।
এখানে কবি মানুষের এমন এক অপরিমেয় শক্তির কথা বলেছেন, যা দাসত্বপূর্ণ মানসিকতার বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ। বলা যেতেই পারে- এটি অন্যায়, অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অদম্য আত্মমর্যাদায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক অমর ইশতেহার। কবি বলতে চান- মানুষের ভেতর এমন এক শক্তি নিহিত আছে, যার সন্ধান একমাত্র মানুষকেই আবিষ্কার করতে হবে। আর সেই শক্তির সন্ধান যেদিন মানুষ পেয়ে যাবে, সেদিন থেকেই মানুষের প্রকৃত মুক্তি হবে। তাই তো কবিতাটির শেষ দিকে কবি নিজেকে ‘বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত’ রূপে অভিহিত করে বলেছেন- যতদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে অন্যায় অত্যাচার উৎপীড়ন থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তিনি শান্ত হবেন না।
চির নবীন ও চঞ্চল কবি নজরুল অকপটে যখন বলে ওঠেন-
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখীর ঝড়।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!’
(প্রলয়োল্লাস)
তখন যেন আগ্নেয়লাভার মতো এক মহাশক্তির নবজাগরণ ও বিপ্লবী চেতনার অনন্য ঘোষণা শুনতে পাই। এ যেন অন্যায় ও শোষণমূলক সমাজব্যবস্থার পুরোনো, জীর্ণ, কুসংস্কারকে ধ্বংস করে সত্যের সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে এক নতুন যুগের আগমনকে স্বাগত জানানোর ডাক। অর্থাৎ কবি নতুন সৃষ্টি, নতুন মানবসভ্যতা ও নতুন ন্যায়বোধের প্রতি গভীর আত্মবিশ্বাসে প্রলয়কে ভয় না পেয়ে বরং তাকে আনন্দের সঙ্গে আলোকিত নতুন কেতন উড়িয়ে বরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ কবি যেন এক যুগান্তকারী বৈপ্লবিক সম্ভাবনা লক্ষ্য করেছেন। তিনি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্রলয়ের মধ্যেই সৃষ্টির নতুন পথ তৈরি হয়।
কবি তার ‘রক্তাম্বর-ধারিণী মা’ কবিতায় যখন প্রবল প্রতাপে উচ্চারণ করেন-
‘টুটি টিপে মারো অত্যাচারে মা,
গল-হার হোক নীল ফাঁসি,
নয়নে তোমার ধূমকেতু-জ্বালা
উঠুক সরোষে উদ্ভাসি ॥’
তখন যেন কবি চন্ডী দেবীর মাতৃশক্তিকে কেবল করুণাময়ী রূপে নয়, বরং অন্যায়-সংহারিণী, অসুরনাশিনী, বিপ্লবী রুদ্ররূপিণী দেবী ও মুক্তির বার্তাবাহক হিসেবে কল্পনা করেছেন। মূলত দানব শক্তিকে বিনাশ করার মধ্য দিয়ে কবি ব্রিটিশ শাসনের অবসান কামনা করেছেন। অর্থাৎ কবি ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সুদৃঢ় চিত্তে প্রতিরোধ গড়ে তুলে ন্যায়ভিত্তিক নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় মা মাটি মানুষের প্রতি আহ্বান করেছেন।
কবি ‘আগমনী’ কবিতায় যখন বলেন-
‘একি রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন-
ঝন রণরণ রণ ঝনঝন!’
(আগমনী)
তখন এটিকে যুদ্ধের আহ্বান বলে মনে হলেও মূলত এটি দীর্ঘদিনের অন্যায়, শোষণ, ভীরুতা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সংকেত। এই সংকেত জাতিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে চায়।
কবিতাটি ‘আগমনী’ হওয়ায় এখানে দেবী দুর্গার আগমনও নিহিত রয়েছে। ব্রিটিশদের শাসন-শোষণ অবসানের জন্য দেবী দুর্গার শক্তিতে জাগ্রত হয়ে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্য কবি এ কবিতায় সুর তুলেছেন। অর্থাৎ নজরুলের দুর্গা কেবল পূজার প্রতিমা নন, তিনি অত্যাচার-সংহারিণী শক্তির প্রতীক। তাই রণবাদ্যের ধ্বনি দেবীর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যায় ও অসুরশক্তির পতনের পূর্বাভাস বহন করে। এই দুটি চরণে নজরুল যুদ্ধকে কেবল অস্ত্রের সংঘর্ষ হিসেবে দেখেননি, তিনি এটিকে নৈতিক সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে যুদ্ধ মানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং মানবমুক্তির জন্য লড়াই করা। রণবাদ্যের ধ্বনি তাই ধ্বংসের নয়, বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য দ্রোহের নৈর্ব্যত্তিক চেতনার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত মানুষের অবিনাশী এক মহাশক্তির জাগরণী প্রতীক।
কবি তার বিপ্লবী চিন্তার হিরন্ময় ঘোষণায় যখন বলেন-
‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল-ধূমকেতু।’
(ধূমকেতু)
এখানে কবি ‘ধূমকেতু’কে কেবল একটি মহাজাগতিক বস্তু হিসেবে দেখেননি, বরং ইতিহাসের গতিকে পরিবর্তনকারী বিপ্লবী শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বলা যেতেই পারে- এটা যেন গণমানুষের যুগে যুগে আবির্ভূত হওয়া বিদ্রোহী চেতনা, মুক্তির শক্তি এবং পরিবর্তনের অনিবার্য ইতিহাস। অর্থাৎ এ কবিতায় কবি এক হিরণ¥ময় বিপ্লবী শক্তিতে উদ্ভাসিত হতে চায়। তার এই শক্তি অত্যাচারী ও পাপীর জন্য ধ্বংসের বার্তা নিয়ে আসবে। আর তাই তো কবি ‘মহাকাল-ধূমকেতু’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ভারতবাসীর চিত্তে বিপ্লবের উন্মাদনা সঞ্চারে অনন্য হয়ে উঠেছেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, কবি নজরুল ছিলেন সত্য ও নির্ভীক চিত্তের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি সৃষ্টির আলোয় নতুন দিনের আগমনী বার্তা নিয়ে এসেছিলেন।
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য্য’
অর্থাৎ তিনি যেমন উদার-কোমল, তেমনি প্রলয়ংকর। তার সমগ্র ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে যেন এ কথাটিই বারবার ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছে।
তিনি কবিতাকে স্থাপন করেছেন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন বাস্তবতার জটিল আবর্তে। আর তাই তো আমরা বলতেই পারি- তার কবিতা হয়ে উঠেছে সামাজিক দায়িত্ব পালনের শাণিত হাতিয়ার। নতুন সূর্যের আলোয় বিশ্বজয়ের এক মহান মহাকাব্য।
কেকে/সাশ