শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের বিল সংসদে      রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলো মিয়ানমার      বেনজীরের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলে ফের চিঠি      আসিফ মাহমুদের দেয়া সব নিয়োগ-পদোন্নতির নথি তলব দুদকের      আগস্টে মব সহিংসতায় নিহত ২৮, নদী-খাল-জঙ্গলে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৮৭      সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ, উদ্ধার ১৩ হাজার ৬৭৯       ডেঙ্গুতে আরও চার মৃত্যু, নতুন রোগী ১২৫২      
জীবনানন্দ
অভিযাত্রিক তারেক মাসুদ
বিধান রিবেরু
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ২:৪০ পিএম আপডেট: ১৫.০৮.২০২৬ ৯:৪০ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ঘড়িখানা
অন্ধ মানুষটির হাতে
বন্ধ হয়ে গেলো
-আব্বাস কিয়ারোস্তামি

তারেক মাসুদের প্রিয় পরিচালক ছিলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। এটি নতুন খবর নয় যে কিয়ারোস্তামি শুধু নির্মাতাই ছিলেন না, কবিও ছিলেন। কিয়ারোস্তামির এই কবিতা কুহেলিকাময় মনে হতে পারে, কিন্তু এ কবিতা জীবনের দার্শনিক দিককে উন্মোচিত করে, যদিও কথাগুলো বানিয়ে বলা। অন্ধ মানুষই বা কোথায় পেলেন কিয়ারোস্তামি, আর ঘড়িটি যে বন্ধ হয়ে গেছে, সেই তথ্যই বা কে দিলো তাকে? বানিয়ে বলা কথার আরেক নাম মিথ্যা। কিয়ারোস্তামি মনে করতেন, ছায়াছবি এক মিথ্যার শিকল, যার মাধ্যমে আমরা একটি বড় সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাই।

কিয়ারোস্তামির এই কথাকে জারিত করে তারেক মাসুদ বলতেন, “ছবি বানানো হলো একটা কুৎসিত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আমরা বৃহৎ সৌন্দর্যের কাছে যেতে চাই। সত্য ও সৌন্দর্যের পথে যাত্রা সব সময়ই ছলনাময়।” তারেক মাসুদের কাছে সত্য সুন্দর, আর সেখানে তিনি পৌঁছুতে চান চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে। সেখানে ছলনা থাকে, যেমন থাকে কবিতায়। অন্ধ মানুষের আসলে ঘড়ি রেখে লাভ কি? শুধু টিকটিক শব্দ ছাড়া ঘড়িটিরই বা আর কি দেয়ার ক্ষমতা আছে দৃষ্টিহীন মানুষটিকে? তারপরও মানুষটি ঘড়ি রাখে নিজের কাছে, সেই ঘড়িটি একসময় বন্ধও হয়ে যায়। তবে যতদিন ঘড়িটি সচল থাকে ততদিন অন্তত বাইরের স্পন্দন, দুনিয়ার দৃশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষটিকে হয়তো সম্পর্কিত রাখে আলোকময় জগতের সাথে। ঘড়িটি যেন মালিককে অনুসরণ করেই অচল হয়ে পড়ে। হয় তো সময়দানকারী বস্তুটি বুঝতে পেরেছিল শুধু শুধু সময় উৎপাদন বৃথা, বিশেষ করে যখন তার মালিকের কাছে রাত আর দিন সমান। এখানে স্পষ্টতই সাবজেক্ট আর অবজেক্টের সম্পর্ক বিরাজমান। তারেক মাসুদ যেটাকে বলেন দ্রষ্টা ও বিষয়।

তারেক মাসুদ উবাচ, “দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর করে কীভাবে বিষয়কে দেখা হচ্ছে তার ওপর, নাকি কখনো কখনো দ্রষ্টার ওপর বিষয়েরও একটা পরিবর্তনক্ষম সক্রিয় প্রভাব থাকে? শিল্পকর্ম মানুষকে, বিশেষ করে শিল্পীকে জীবনের কাছাকাছি নিয়ে আসে।” বিষয় প্রভাবিত করে বলেই বিষয়ী নিজের ভেতরে ও বাইরে অনুসন্ধানে ব্রতী হয়। অন্যের ভেতর দিয়ে নিজেকে জানার ইচ্ছা তার প্রবল হয়। বিশেষ করে শিল্পীর। তাই তো আব্বাস কিয়ারোস্তামি আপন বিষয়েরই ঘনিষ্ঠ হন না, নিজের কাছেও যান, নতুন করে জানার চেষ্টা করেন। এটাই শিল্পীর সাধনা। 

তারেক মাসুদ ছিলেন স্বাধীন শিল্পী। কোন কারখানায় নাম লেখাননি তিনি, শেষোব্দি নিজের ছবি নিজেই ফেরি করে দেখিয়েছেন জনগণকে। বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ ও শৈশব তারেক মাসুদকে প্রভাবিত করেছে অনেকখানি। কাজেই যতটা তিনি ‘মুক্তির গান’ বা ‘মাটির ময়না’ নির্মাণ করেছেন, ঠিক ততটাই এই শিল্পকর্মগুলো তারেক মাসুদকে বিনির্মাণ করেছে। ‘ক্লোজ আপ’ (ফারসিতে ‘নামেয়ে নাজদিক’, বাংলায় ‘কাছ থেকে দেখা’) নিয়ে কিয়ারোস্তামি যেমনটা বলেন, “ছবিটি আমি বানাইনি, ছবিটিই আমাকে নির্মাণ করেছে”। 

‘মুক্তির কথা’ তৈরির পর কিয়ারোস্তামির কথার তলানি স্পর্শ করতে পারেন তারেক মাসুদ। তিনি বলেন, “মুক্তির কথা বানানোর আগ পর্যন্ত আব্বাসের কথার প্রকৃত অর্থ আমি বুঝিনি। প্রত্যন্ত গ্রামের দর্শকদের মধ্যে আমাদের আগের ছবি মুক্তির গান প্রদর্শনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মুক্তির কথা প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি করি। মুক্তির কথা তৈরি করতে গিয়ে আমরা আবিষ্কার করলাম, প্রদর্শিত ছবির পাত্র-পাত্রীদের সঙ্গে দর্শকেরা তাদের জায়গা বদল করেছে।”

এই জায়গা বদল বা পরিবর্তন ও প্রত্যাবর্তনের আবর্তের মধ্য দিয়েই শিল্পীর নিজেকে চিহ্নিত করতে হয়। শিল্পীকে বিষয়কে আত্মস্থ করতে হয়, এরপর বিষয় হয়ে ওঠে তার মতো, তার মতো করেই বিষয় অনূদিত হয়, ভাষান্তরিত হয়। অন্ধ মানুষটির ঘড়িটি যেমন, মানুষটি অন্ধ বলেই হয় তো ঘড়িটি বন্ধ হয়ে যায়। দুজনের কাছেই রাত-দিন হয়ে ওঠে সমার্থক। মানুষটি তারেক মাসুদ বলেই হয় তো নিরন্তর এক ছুটে চলার চিত্র আমরা পাই, তাঁর চলচ্চিত্রকর্মে। অথবা তাঁর চলচ্চিত্রকর্ম হয়ে ওঠে অন্তর্যাত্রা বা বহির্যাত্রা। তিনি বলেন, “আমার কাছে ছবি বানানো হলো চূড়ান্ত রকমের বাহ্যিক একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ও অন্তর্মুখী এক যাত্রা।” 

আব্বাস কিয়ারোস্তামির জীবন ও চলচ্চিত্রও কিন্তু তাই। এক অন্তহীন যাত্রার রূপ তাঁর ছবিতে দৃশ্যমান। ‘টেস্ট অব চেরি’, ‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’, ‘হোয়ের ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম’, ‘সার্টিফায়েড কপি’, ‘লাইক সামওয়ান ইন লাভ’ ইত্যাদি ছবিতে অভিযাত্রী ও তাদের পরিবর্তিত সত্তার দেখা পাওয়া যায়। তারেক মাসুদও তেমনই এক অভিযান শুরু করেছিলেন, যেখানে তিনি অনুসন্ধান করেছিলেন শেকড়ের। এজন্য তিনি বেছে নেন মুক্তিযুদ্ধ ও শৈশবকে। একদিকে তিনি জাতীয়তাবোধের ভেতর নিজের পরিচয়কে খুঁজতে চান, অন্যদিকে, পরিবর্তনশীল সমাজের ভেতর নিজের বেড়ে ওঠাকে ফিরে দেখতে চান। তারেক মাসুদের যাত্রা তাই মূলত দ্বিমুখী। তিনি দুই পথেই হেঁটেছেন, যতটা পেরেছেন। 

কিয়ারোস্তামির যে কবিতাটি শুরুতে রয়েছে, সেই হাইকুটি নেয়া হয়েছে ‘হাওয়ার সঙ্গে হাঁটা’ বই থেকে। বইটি তারেক মাসুদেরও পড়া ছিল। একবার সাহিত্যকর্মের দিকে তাকিয়ে, আরেকবার চলচ্চিত্রকর্মের দিকে তাকিয়ে তারেক মাসুদ কিয়ারোস্তামি সম্পর্কে বলছেন, “তার চলচ্চিত্রকার-জীবনের দিকে একটু সূক্ষ্মভাবে তাকালে বোঝা যায়, তিনি বরং সিনেমাকে সঙ্গী করে হাওয়ার বিরুদ্ধেই হাঁটেন সবসময়!”

তারেক মাসুদের দিকে সূক্ষ্মভাবে তাকানোর প্রয়োজন নেই, স্থূল দৃষ্টিতেও ধরা পড়ে তার সাধনার ধরন। তিনিও হেঁটেছিলেন হাওয়ার বিপরীতে এবং আমৃত্যু অব্যাহত রেখেছিলেন নিজেকে ও জাতিকে জানার প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রকে অনেকটা নিঃসঙ্গ করে অভিযাত্রিক শিল্পী হিসেবেই বিদায় নেন তিনি। তারেক মাসুদের বিদায় যেন সেই অন্ধ মানুষের দশা, আর স্বাধীন চলচ্চিত্রের নিঃসঙ্গতা যেন বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়িটি। একে সচল করে তুলতে হবে।
 
দোহাই

১. তারেক মাসুদ, অন্তর্যাত্রা, বহির্যাত্রা: সিনেমা যখন সহযাত্রী, চলচ্চিত্রযাত্রা, (২০১২), ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।
২. আব্বাস কিয়ারোস্তামি, ওয়াকিং উইথ উইন্ড, (ফারসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন আহমেদ কারিমি-হাক্কাক ও মাইকেল বিয়ার্ড), (২০০১),সিঙ্গাপুর: ইউরোশিয়া প্রেস।

কেকে/এলএ



মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close