শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের বিল সংসদে      রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলো মিয়ানমার      বেনজীরের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলে ফের চিঠি      আসিফ মাহমুদের দেয়া সব নিয়োগ-পদোন্নতির নথি তলব দুদকের      আগস্টে মব সহিংসতায় নিহত ২৮, নদী-খাল-জঙ্গলে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৮৭      সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ, উদ্ধার ১৩ হাজার ৬৭৯       ডেঙ্গুতে আরও চার মৃত্যু, নতুন রোগী ১২৫২      
জীবনানন্দ
হৃদয়ের রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়ে আসে কবিতা
কামরুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১১ এএম

জীবনানন্দ-উত্তর বাংলা কবিতায় যারা জীবনানন্দের প্রভাব কাটিয়ে আলাদা সুর ও স্বরে কবিতা লিখেছেন, তাদের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, শামসুর রাহমান, শঙ্খ ঘোষ, আলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত, আল মাহমুদ এবং উৎপল কুমার বসুর নাম করা যেতে পারে। অনেকেই যখন জীবনানন্দের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন, সে সময়ে এই কবিরা জীবনানন্দ-চর্চা করেছেন এবং নিজ নিজ প্রতিভার প্রাখর্যে নতুন নতুন পথের সন্ধান করেছেন ও নিজস্ব কাব্যভাষাও তৈরি করেছেন—তাদের কবিতা আলাদাভাবে চেনা যায়। 

তবে এদের মধ্যে উৎপল কুমার বসু একটি পৃথক রাস্তায় হেঁটেছেন। তাকে জীবনানন্দ-উত্তর বাংলা কবিতার প্রধানতম স্বর বললে বোধ করি তাতে কোনো অত্যুক্তি হবে না। পঞ্চাশের কবিদের মধ্যে তিনি আজও বহুল পঠিত; আজকে যারা কবিতা লিখছেন, তারা উৎপল কুমার বসুর কবিতা-জগৎ ঘুরে এসেছেন এবং এখনো তাঁর কাছে ফিরে যাচ্ছেন বারবার। ফলে, তরুণ কবিদের কাছে আজকে তিনি বেশি প্রাসঙ্গিক, সঙ্গত কারণেই।

তার কবিতায় দেখা যায় দূর সময়ের ইঙ্গিত এবং জীবনানন্দের ইতিহাস-চেতনার উত্তরাধিকার। তিনি যে একক কাব্যসত্তায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিলেন, তা তাঁর স্বতন্ত্র কবি-পরিচয়কে চিহ্নিত করে। তিনি পাঠকদের বোঝার জগত থেকে অনেক দূর দিয়ে হাঁটেন কিংবা অগ্রসর চিন্তার প্রক্ষেপণে তা হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য। তিনি আধুনিক-উত্তর সময়ের কবিতা নির্মাণে শব্দ-বাক্য-ছন্দ নিয়ে একধরনের নিরীক্ষা চালিয়ে গেছেন ক্রমাগত। দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে আধুনিক শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-দর্শনমণ্ডিত জগতের আলোছায়ায় উর্বর তাঁর মস্তিষ্ক থেকে যে শব্দ, যে চিত্রকল্প এবং যে নতুন বাণীর সম্পাত ঘটেছে, তা আপাত কুয়াশায় আচ্ছন্ন, অথচ আভাময়। জয় গোস্বামী বলছেন:

‘এই কবি তার সময় থেকে এগিয়ে রয়েছেন। দূরে আমরা দেখতে পাচ্ছি তার উড়ন্ত রূপোলী কেশরেখা। এই মুহূর্তে উৎপলের কবিতার তুল্য সংকেত-শক্তি, দূরগামী অর্থক্ষেপণ, বহুস্তর অনুষঙ্গ প্রয়োগ বাংলা কবিতায় আর নেই। আমরা পাঠকরা কেবল তাকে সবিনয়ে অনুসরণ করতে পারি।’ (দেশ, ফেব্রুয়ারি ২০০৫)।

কবিতার টেক্সট একটি নান্দনিক ভর্টেক্সের মতো। এখানে সহজ-সরল ভাষ্যের মধ্যেও রয়েছে জটিলতা, বৈপরীত্য, নির্মাণ-বিনির্মাণ কিংবা ঔদ্ধত্যে উৎরে যাওয়া ঔজ্জ্বল্য, সময়ের নানা চিহ্ন-সংকেত, দুর্ভেদ্য খড়কুটো, অনিঃশেষ অভিলাষ—এই সব। তবে যে কথা ভাবতে হবে, তা হলো, বিশাল ঐতিহ্যস্রোতের বিচিত্র বর্ণবিভায় কে কতটা স্বতন্ত্র ও প্রোজ্জ্বল, তা দিয়েই তাকে ধরে রাখবে কাল-মহাকাল। তবে কবিতার ঐতিহ্যবিচ্যুতি কবিতাকে পঙ্গু করে রাখে। উদ্দেশ্যহীন, স্বপ্নহীন শব্দপ্রপাতই যে কবিতা—সে হীন প্রচেষ্টায় যারা অভিনব প্লাস্টিক কবিতা নির্মাণে ব্যয় করছেন সময়, তাঁদের তাকাতে বলি আন্দালুসিয়ান যুবক লোরকার দিকে। কবিতা রচিত হয় ভাষায় আর কবিকে লড়াই করে যেতে হয় তার একটি নিজস্ব ভাষা তৈরির জন্য, সারা জীবন।

ক্যারিবীয় কবি ডেরেক ওয়ালকট কবিতা লেখাকে প্রার্থনার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কবি শঙ্খ ঘোষ শোনা যায়, অনেকটা অজু করেই কবিতা লিখতে বসতেন। আবার কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ড্রাংক অবস্থায়ও কবিতা লিখেছেন এবং আমাদের আজিজ মার্কেটের একালের বেশকিছু কবি, শোনা যায়, নেশার ঘোরে কবিতা লিখতে পছন্দ করেন। কে কীভাবে কবিতা লিখবেন, এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। তবে একথা মানতেই হবে যে, কবিতা লেখার কাজটি নিতান্তই একটি পবিত্র ভোকেশন এবং শ্রমসাধ্য ব্যাপার। শঙ্খ ঘোষের ‘ছন্দের বারান্দা’ থেকে জানা যায়, জীবনানন্দ দাশ একটি কবিতাকে কত কাটাকুটি করতেন। যা হোক, হয়ে ওঠার জন্য কবিতা কবিকে যে স্বস্তি দেয় না, পুনঃপুনঃ পাঠে তা কবির বুঝতে অসুবিধা হয় না।

কবিতা নিয়ে নানা জনের নানান মতামত রয়েছে। আমরা কার মতামত মানব, কারটা মানব না, সেটি ব্যক্তিগত বিষয় হলেও, সবারই মতামতের বিষয়ে ধারণা থাকা প্রয়োজন। চেশোয়াব মিউশ বলেছেন, ‘কাকে বলে কবিতা, যদি তা না বাঁচায় দেশ কিংবা মানুষ।’ কবিতা অবশ্যই নাড়া দেবে রাষ্ট্রকে কিংবা বিশ্ববিবেককে কিংবা স্বৈরাচারকে। দেশ ও মানুষের পক্ষে কথা বলার কারণে কবিরা যুগে যুগেই স্বৈরশাসক কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের কাছে শত্রু হয়ে উঠেছেন এবং পৃথিবীর অনেক মহৎ কবিকেই জীবন দিতে হয়েছে কবিতায় সত্যকথনের দায়ে। লোরকাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল সত্য উচ্চারণের জন্য। আমেরিকান বিট কবিদের অন্যতম অ্যালেন গিনসবার্গ, যিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় লিখেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যেসোর রোড’, পছন্দ করতেন না তন্দ্রাচ্ছন্ন, ভ্যাজভ্যাজে, গুটিসুটি মার্কা কবিতা। তিনি চাইতেন ডানাখোলা কবিতা, যে কবিতার ডানার ঝাপটায় ভেঙে যাবে সমাজ বা রাষ্ট্রের ম্যাজম্যাজে ভাব। তার মানে এই নয় যে, তিনি পৃথিবীর অন্যসব মহত্তম কবির অন্যরকম কবিতা পছন্দ করতেন না। এটি ছিল তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ।

কবিতার থাকতে হবে গতি ও দৃষ্টি। কবিতা জাতীয়ভাবে লেখা হলেও তার মৌলিক কিছু গুণের কারণে তা আন্তর্জাতিক হয়ে যায়। আবার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও কবিতা লিখিত হতে পারে এবং সেক্ষেত্রে অবশ্য কবিকে কসমোপলিটান বোধের অধিকারী হতে হয়। তবে কোনো দেশ বা জাতি যখন বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে খোলামেলা হয়ে যায়, তখন সেই দেশ বা জাতির কবিতা বা শিল্প আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া পায় আপনাআপনিই। শিল্প যেকোনোভাবেই জীবনের জয়গান, মুক্তি-অন্বেষী; তা যতই হতাশা ও কষ্টবোধ থেকে, দ্রোহ-নান্তি কিংবা অমঙ্গলবোধ বা অসুস্থ-বিকার মানসিকতাপ্রসূত হোক না কেন।

আমরা আগেই বলেছি, সংস্কৃতি বা শিল্প কোনো ভূগোলে আটকে থাকে না, এটা কারও ব্যক্তিগত সম্পদও নয়। গতিশীল সংস্কৃতি, শিল্প বা কবিতা পুরো মানবজাতিরই সম্পদ। তাই পৃথিবীর দূরতম প্রান্তের একজন কবিও এই বাংলাদেশের একজন কবিকে আলোড়িত করতে পারেন, তার দৃষ্টির মায়োপিক জরাগ্রস্ততা দূর করতে পারেন। দিতে পারেন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা এক স্বর্গীয় অবলোকন, যা থেকে নতুন সৃষ্টির পথও খুলে যেতে পারে। এক্ষেত্রে আমেরিকান কবি ফিলিপ লেভিনের প্রথম লোরকা পাঠের অভিজ্ঞতার ব্যাপারটি ভাবা যেতে পারে। একদিন তিনি লোরকাকে শুধু ‘জিপসি পোয়েমস’-এর কবি কিংবা কিছু সুন্দর, চমকপ্রদ কবিতার লেখক হিসেবে মনে করতেন, যার গুরুত্ব তাঁর কাছে সামান্যই ছিল। অনুপ্রেরণা যে কোনো জায়গা থেকেই আসতে পারে, যে কোনো প্রান্তের কবিতা বা শিল্প খুলে দিতে পারে দৃষ্টির জড়তা এবং নিয়ে যেতে পারে বিশ্বজগতের সেই উন্মুক্ত প্রান্তরে, যেখান থেকে দেখা যেতে পারে বিশ্বমানবের মহামিলনের চিরন্তন সাঁকোটি।

এই সত্যকে মেনে নিয়েও বলতে হয়, কবিতা কখনো কখনো হাতিয়ার হয়ে যায়; হয়তো তখন তার কবিতামূল্য অনেকখানিই কমে যায়, তথাপি তার তাৎক্ষণিক মূল্যেই তাকে কাছে টেনে নিতে হয়। নজরুল, সুকান্ত কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনেক কবিতার ক্ষেত্রেই এ কথা খাটে। এমনকি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে বাংলাদেশের অনেক কবিই গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে অনেক কবিতাই লিখেছেন। সেগুলোকে শিল্পতাত্ত্বিকরা যেভাবেই দেখুন না কেন, এসব কবিতার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। এসবের মধ্যেও রয়েছে ‘the form of salvation’। মিরোশ্লাভ হোলুব যখন বলেন, ‘কবিতাই শৃঙ্খলা সৃষ্টির শেষ চেষ্টা, বিশৃঙ্খলা যখন অসহনীয়’, তখন কবিতার এক অন্যরকম গুরুত্বের কথা আমাদের মনে আসে।

পিকাসো বলেছিলেন, ‘I do not seek, I find.’ এ কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ইতালি কবিতার প্রধান স্থপতি কবি মন্তেলের কথায়: ‘I do not go in search of poetry. I wait for poetry to visit me.’ আসলে কবিতা কখনো জোর করে লেখা যায় না, কবিতার জন্য কবিকে অপেক্ষা করতে হয় এক বিশেষ মুহূর্তের জন্য এবং সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসার আগে যারা জোর করে কবিতা লিখতে বসেন, তারা মূলত প্রকৃত কবিতার সাক্ষাৎ পান না। কবিতা তাই কবির বিশেষ মুহূর্তের আবেগের শিল্পিত ফসল; এই ফসল ঘরে আনার জন্য কবিকে কাটাতে হয় অজস্র বিনিদ্র-রজনী জীবন ও জগতের এক নির্জন প্রান্তে। হৃদয়ের রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়ে আসে কবিতা।

জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন—

‘কবিতা মুখ্যত লোকশিক্ষা নয়; কিংবা লোকশিক্ষাকে রসে মণ্ডিত করে পরিবেশন—না, তাও নয়; কবিতার সেরকম কোনো উদ্দেশ্য নেই। শ্রেষ্ঠ কবিতার ভিতর একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় এই যে মানুষের তথাকথিত সমাজকে বা সভ্যতাকেই শুধু নয়, এমনকি সমস্ত অমানবীয় সৃষ্টিকেও যেন তা ভাঙছে—এবং নতুন করে গড়তে চাচ্ছে; এবং এই সৃজন যেন সমস্ত অসংগতির জট খসিয়ে কোনো সুসীম আনন্দের দিকে।’

চর্যাপদ থেকে আজ অবধি কত শত কবিতা লেখা হয়েছে, সে হিসাব আমাদের কাছে গৌণ, এ কারণে যে, কালপরম্পরায় কবিতার ইতিহাস জাগরূক সত্যের চর্চিত সমন্বয় মাত্র—যাকে আমরা অসংখ্য চিহ্ন ও সময়ব্যাপ্তির সূত্রগুলোয় খুঁজে পাই। ফলে একটি কাল-পরিচয়ের মধ্যে কবিতারও একধরনের পরিচয় আভাসিত হয় এবং বোধের জানালায় সেগুলোর চেহারা উদ্ভাসিত হলে আমরা কেবল কিছু মুখস্থ সূত্র কিংবা উপরিতলের ছায়াকে ঘিরে কাগজ ব্যয় করে একটি আলোচনা কিংবা ডিসকোর্স তৈরি করি। এই নির্মাণ আবার বিনির্মিত হয়ে ফিরে আসে, এতে শিল্প কিংবা কবিতার কতটুকু পাওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে আমার কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। তবু আমরা লিখি, লিখছি—কখনো অনুরুদ্ধ হয়ে, কখনো স্ব-প্রণোদনায় এবং এইভাবে অজস্র লেখার মধ্যে ভেসে উঠছে কবিতার রহস্যাবলি নানা ধরনের বিশ্বাসের রঙ মেখে। সেই রঙগুলো কখনো চোখ ধাঁধানো, কখনো বিনম্র ভাবের উন্নাসিকতায় আচ্ছন্ন, আবার কখনো কৌশলী বিচ্ছিন্ন চেতনায় অন্বিষ্ট। তবে একথা মানতেই হয় যে, হয়ে ওঠার পথে কবিতার জাত বিচার বড়ই কঠিন কাজ এবং প্রকৃত কবিতা চেনার বিষয়ও কোনো বিশেষ কালখণ্ডের কোনো ব্যাপার নয়।

কেকে/এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close