শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি, কার্যকর হবে যেভাবে      বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জঙ্গল থেকে কুবি শিক্ষিকার নিখোঁজ ছেলের লাশ উদ্ধার      ঢাকায় নিরাপত্তা জোরদার, ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫১৫      বাঘা সীমান্তে বিএসএফের হাতে আটক ৫ বাংলাদেশিকে ফেরত আনল বিজিবি      তিন সন্তানকে বিষপান করিয়ে বাবারও বিষপান, ৩ শিশুর মৃত্যু      বিএনপি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করছে : নাহিদ ইসলাম      এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে : ডা. শফিকুর রহমান      
জীবনানন্দ
দূরদেশের মৃত্যুর সংবাদ
ভূচুং ডি সোনম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

জলপ্রপাতের নিচে পাথরে বসে যখন পুর্টা গ্যাল চিঠিটা পড়তে শুরু করল, সে অবচেতনেই বুঝে গিয়েছিল যে কোনো একটা বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে—চিঠির শব্দগুলোকে তার বোন কীভাবে সাজিয়েছে, কেবল সেটাই তাকে বলে দিচ্ছিল ওই আঘাতের তীব্রতা ঠিক কতটা। জলপ্রপাতের পানি অবিরাম পাথরে আছড়ে পড়ছিল, আর বাতাসের টানে উড়ে আসা ছোট ছোট ফোঁটাগুলো নুড়িপাথরে পড়ে শুকিয়ে যাচ্ছিল। লেজ দুলিয়ে একটা কালো-ঠোঁটের ম্যাগপাই পাখি পাশ দিয়ে উড়ে গেল। রোদের ঝিলিক এসে পড়ল জলপ্রপাতে, তৈরি হলো একটা ছোট্ট রামধনু। সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। ঠিক আধঘণ্টা পর সে চিঠিটা ভাঁজ করল, আর তার সঙ্গে ভাঁজ করে ফেলল তার ভায়রাভাইয়ের স্মৃতিও।

জলপ্রপাতের কাছে বসে সে মৃত্যু নিয়ে বইয়ে যা পড়েছে আর মুরুব্বিদের মুখে যা শুনেছে, সেই টুকরো টুকরো কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করল। মৃত্যু হলো একটা ধাপ, রূপের একটা পরিবর্তন কিংবা সহজ কথায় একটা নতুন সাক্ষাৎ। প্রথাগত দেবতারা নাকি তাদের তেজ কমে যাওয়া, ফুলের মালা শুকিয়ে যাওয়া, শরীরে দুর্গন্ধ ছড়ানো এবং অতিরিক্ত ঘামের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ বুঝতে পারেন। আমাদের না আছে এমন কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ, আর না আমরা জীবনের মতো আসন্ন মৃত্যুর সূক্ষ্ম ইঙ্গিতগুলো টের পাই। কোনো মারাত্মক রোগ বাঁধলেই কেবল আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই। তবে মৃত্যুর খবর জানানোর জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন হয় না। এটি একটি স্বাধীন সত্তা, যা কেবল আমাদের কর্মের কাছেই দায়বদ্ধ।

জলপ্রপাতের শব্দ এবং নুড়িপাথরে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে শুকিয়ে যাওয়ার শব্দ তার স্মৃতিগুলোকে আরও শাণিত করে তুলল। সে জীবনের শেষ পর্যায়—প্রাণের অবসান নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে লাগল।

মৃত্যুর সময়ে পাঁচটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়। পৃথিবী উপাদানের জলে বিলীন হওয়া মানে গতিরোধ হওয়া এবং চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা। জল উপাদানের আগুনে বিলীন হওয়া মানে শরীরের তরল শুকিয়ে যাওয়া এবং শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলা। সঙ্গীতের সুরকে বিদায়। আগুন উপাদানের বাতাসে বিলীন হওয়া মানে শারীরিক উষ্ণতা এবং ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলা, এবং অবশেষে বাতাস উপাদানের চেতনায় বিলীন হওয়া মানে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা ও স্পর্শশক্তি হারিয়ে ফেলা। অভ্যন্তরীণ শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার সময় থেকেই আমরা বার্ধোতে (মৃত্যুর পরবর্তী অন্তর্বর্তী অবস্থা) পা রাখি। মৃত্যু কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া।

ভাঁজ করা চিঠিটা মুঠোয় চেপে ধরে সে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মৃত্যুর কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল, অথচ তার বাহুতে হেঁটে যাওয়া একটা পিঁপড়াকে দেখে তার নিজেকে অনেক বড় মনে হলো। জীবন হলো একরাশ বৈপরীত্যের সমাহার। সবকিছুর শেষ হয় মৃত্যুতে, যা আবার অন্য এক যাত্রার শুরু। সে ভাঁজ করা চিঠিটা পকেটে রেখে একটা মসৃণ পাথরের ওপর হেলান দিয়ে বসল। পরিষ্কার নীল আকাশের বিশালতা তার মনে করিয়ে দিল অন্য এক মৃত্যুর কথা।

সেটা ছিল এক রোমাঞ্চকর গরমের দিন, ঠিক দশ বছর আগের কথা, যেদিন আরেকটি চিঠি এসে পৌঁছেছিল। একটা মোটা বাদামি খাম, যা স্বচ্ছ পলিথিনে মোড়ানো ছিল। তার ফুফু—যিনি এক সন্ন্যাসিনীর জীবন যাপন করছিলেন—তিনি আগেই খামটি খুলে ফেলেছিলেন। খামটির গায়ে দুর্ভাগ্যের কোনো ছাপ ছিল না, কারণ ভারী খামটি খোলার সমস্ত ধাক্কা, বিষণ্নতা আর উৎকণ্ঠা তিনি নিজেই সামলে নিয়েছিলেন। সাজানো শব্দগুলোর মধ্য দিয়ে চোখ বুলানোর সময় বিপর্যয় তার মুখাবয়বে ভিড় জমাল।

যখন তিনি তার বাবার মৃত্যুর খবরটি শোনালেন, পুর্টার গালের ওপর দিয়ে অজস্র কান্নার ধারা গড়িয়ে পড়ল। সেই কান্না যেমন তীব্র দুঃখের ছিল না, তেমনি ছিল না তার ফুফুর বিবরণীর কোনো মারপ্যাঁচ। চোখের জলের এই প্লাবনের কারণ ছিল তার বাবার তারুণ্য—তিনি ছিলেন মাত্র বিয়াল্লিশ বছর বয়সী একজন মানুষ, একটা পরিবারের কর্তা, পাঁচ সন্তানের জনক। পৃথিবীর সমস্ত দোষত্রুটিতে জর্জরিত একজন সাধারণ মানুষ। তবুও তার মুখে কোনো বলিরেখা ছিল না এবং কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি যে তার এই চূড়ান্ত সাক্ষাৎ এত তাড়াতাড়ি চলে আসবে। ঘড়ির কাঁটা যেন দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে গেল।

তার ফুফু বাবার স্মৃতিচারণা করে আরও কিছু কথা যোগ করলেন। তিনি বাবাকে ছোটবেলা থেকেই চেনেন এবং তাকে খুব ভালোবাসতেন। মাথার মুণ্ডিত সন্ন্যাসিনীসুলভ মাথাটা নাড়তে নাড়তে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘তার বদলে তুই আমাকে নিয়ে গেলি না কেন?’ মৃত্যুকে বদল করা যায় না, আবার এর সঙ্গে কোনো জাদু বা ছলচাতুরীও করা চলে না। মৃত্যু অত্যন্ত নির্মম ও সত্য। সময় ফুরোলেই কেবল সে জানান দেয়।

বোর্ডিং স্কুলের হোস্টেলে ফিরে সে চিঠিটা তার বাক্সে লুকিয়ে রাখল। স্কুলের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা তাকে বাধ্য করেছিল বাবার স্মৃতিগুলোকে মনের দূর কোণে নির্বাসিত করতে। তবে স্মৃতিরা মরে না। তারা সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকে। উপযুক্ত সময়ে তারা ঠিক ফিরে এসে আমাদের দুর্বল হৃদয়ে আঘাত হানে।

পরবর্তী বছরগুলোতে চিঠিটির ঠিকানা বারবার বদলাল। প্রথমে সেটি স্থান পেল একটা প্লাস্টিকের ফোল্ডারে, যেখানে খবরের কাগজের কাটিং রাখা হতো; এরপর একটা চামড়ার ব্রিফকেসে এবং একসময় সেটি জায়গা পেল একটা ছবির অ্যালবামে। স্কুল ছাড়ার মাত্র কয়েক দিন আগে, সে ব্যবহার করা খাতা, ফুটবল তারকা, সিনেমার অভিনেতা ও স্বল্পবসনা মডেলদের ছবির সঙ্গে ওই চিঠিটাও পুড়িয়ে ফেলল। আগুনে কাগজগুলো মচমচ করে পুড়ে গেল এবং নীল ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল। উত্তাপে যখন শব্দগুলো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল, তখন চিঠিতে থাকা তার বোনের বিয়ের অন্যান্য খবরগুলোও কালো ছাইয়ে মিলিয়ে গেল। মৃত্যু অন্য সমস্ত কিছুকে গ্রাস করে নেয়।

তার গাল দুটো ভেজা ছিল। হয়তো জলপ্রপাতের কোনো বিপথগামী ফোঁটাই তার মুখে এসে পড়েছিল। নীল আকাশ, তীব্র বেগে বয়ে চলা জলপ্রপাত, মৃত্যুর খবর এবং বাবার স্মৃতিগুলো যেন আগুনে ঘি ঢালল। সেই আগুন তাকে তার স্মৃতিভাণ্ডারের অতল গহ্বর থেকে মৃত্যুর আরও একটি খবর টেনে বের করতে প্ররোচিত করল।

শীতকালের এক দিনে, ঠিক কুড়ি বছর আগে, সে জানতে পেরেছিল যে তার দাদামশাই মারা গেছেন। ব্যাপারটা ছিল অদ্ভুত, প্রায় অলৌকিক। তখন তার বয়স দশ বছর। কমিকস আর গুলতি যার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল, সেই কচি বয়সের দুনিয়ায় মৃত্যু ছিল তার কল্পনার বাইরে।

সে প্রায়ই তার দাদামশাইকে নিয়ে স্বপ্ন দেখত—শ্বেতশুভ্র চুলের এক লম্বাটে বিশাল মানুষ, যিনি কখনো তাকে হুকুমের সুরে ভরিয়ে দিতেন, আবার কখনো গল্প শুনিয়ে আদর করতেন। তার স্বপ্নগুলো প্রায়ই শেষ হতো ঘুম ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এবং সে একটা পরিচিত মানুষের গলার স্বর খুঁজতে শুরু করত। অন্ধকার কখনো কথা বলে না। সেটা তার রাতগুলোকে আরও দীর্ঘ করে তুলত।

ক্লাসে থাকার সময় পুর্টা গ্যাল দাদামশাইকেই সময়ের মাপকাঠি হিসেবে ধরে নিত; সে ভাবত মানুষটা পাহাড়, নদী আর গাছের চেয়েও পুরোনো। একটা শিশু কীভাবে জানবে যে সময় এক অন্তহীন মায়া? এর বিশালতা ও বহমানতা নদীগুলোকে শুকিয়ে দেয় এবং পাহাড়গুলোকে ক্ষয়ে ছোট করে দেয়। এই সময়টাই তার বিশালদেহী দাদামশাইকে একদিন ক্ষয় করে দিয়েছিল।

তার ফুফু তাকে জানালেন যে তার দাদামশাই মারা গেছেন। দুর্ভাগ্যের কথাগুলো যখন কোনো মোড়ক ছাড়া সরাসরি বলা হয়, তখন সেগুলোকে কিছুটা হালকা মনে হয়। কিন্তু লিখিত শব্দ সবকিছুকে যেন আরও গম্ভীর করে তোলে। শিশুর মনে কোনো জেদ বা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে—এই ভয়ে ফুফু যথাসম্ভব স্বাভাবিকভাবে কথাগুলো বলেছিলেন। আসলে তার কোনো ভয়ের প্রয়োজনই ছিল না। কারণ সে তো তার দাদামশাইকে তার স্বপ্নের মধ্যেই দেখত।

দাদামশাইয়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই সে সবকিছুকে এক নতুন আলোয়, এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং এক নতুন সময়সীমায় দেখতে শিখেছিল। পুরোনো দেয়ালটা ভেঙে পড়েছিল এবং তার খণ্ডিত স্মৃতির আবর্জনা থেকে সে নতুন একটা ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তার হেলান দেওয়ার জন্য একটা নতুন দেয়ালের প্রয়োজন ছিল।



ভূচুং ডি সোনম একজন প্রখ্যাত তিব্বতি লেখক, কবি, সম্পাদক ও অনুবাদক। তিনি সমসাময়িক তিব্বতি সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তার ইয়াক হর্নস এবং সংস অব দ্য অ্যারো তার বিখ্যাত বই।

অনুবাদ: ফরহাদ নাইয়া


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  ভূচুং ডি সোনম   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close