শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের বিল সংসদে      রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলো মিয়ানমার      বেনজীরের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলে ফের চিঠি      আসিফ মাহমুদের দেয়া সব নিয়োগ-পদোন্নতির নথি তলব দুদকের      আগস্টে মব সহিংসতায় নিহত ২৮, নদী-খাল-জঙ্গলে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৮৭      সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ, উদ্ধার ১৩ হাজার ৬৭৯       ডেঙ্গুতে আরও চার মৃত্যু, নতুন রোগী ১২৫২      
জীবনানন্দ
মাটি খাওয়া
মেন্দা রেওয়া
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৪ এএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

ভারতে কাটানো জীবনের কথা মনে করলে প্রথম যে স্মৃতিটি আমার মানসপটে ভেসে ওঠে, তা হলো আমার মাটি খাওয়ার ঘটনাটি। এটি চুরি করে, সীমান্ত পেরিয়ে, লুকিয়ে আনা হয়েছিল এমন এক দেশ থেকে যা আমি কখনো চোখে দেখিনি—অথচ যার সঙ্গে কোনোভাবে আমি সবসময় যুক্ত ছিলাম।

আমাকে প্রায়ই এমন সব পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া হতো যা বেশ মহৎ এবং ঐতিহাসিক বলে মনে হতো, যদিও সেগুলোর গুরুত্ব তখন আমি সবসময় পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারতাম না। তেমনই এক মুহূর্ত এসেছিল যখন আমাকে ভারতের ধর্মশালায় (যেটি আমার নিজের শহর) তিব্বতি সংস্কৃতি ও ইতিহাসসংক্রান্ত একটি জাদুঘর গোপনে বা ব্যক্তিগতভাবে ঘুরে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেটি ছিল এক আনুষ্ঠানিক আয়োজন; আমার মনে আছে, আমি আমার সংগ্রহে থাকা সবচেয়ে সুন্দর রেশমি ব্রোকেডের চুপা (তিব্বতি ঐতিহ্যবাহী পোশাক) পরেছিলাম এবং তার সঙ্গে মিলিয়ে একটি সিল্কের কমলা রঙের ওনচু (ভেতরের জামা) পরেছিলাম। আমার পরা প্রতিটি অলঙ্কারই ছিল ঝলমলে—এমন অলঙ্কার যা নির্বাসনে থেকেও বিশ্ববাসীকে আমাদের সংস্কৃতির সমৃদ্ধির কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি।

বাবা আর আমি যখন জাদুঘরের মধ্যদিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, নয় বছর বয়সি শিশুর যা ধৈর্য থাকে, সেটুকু দিয়ে আমি ট্যুর গাইডের কথা শুনছিলাম। কিন্তু আমার পা দুটো থামার আগেই মনটা অন্যদিকে হারিয়ে গেল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি নিজের মতো ঘুরে ঘুরে প্রদর্শনীগুলো দেখতে শুরু করলাম। জীবন্ত রূপ দেওয়া যে কঙ্কাল বা মূর্তিগুলোতে প্রাণবন্ত সিল্কের পোশাক পরানো ছিল এবং যাদের গলায় ভারী প্রবালের পুঁতির মালা ঝুলছিল, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি এক ধরনের শিশুলভ অহংকার অনুভব করলাম। তাদের দেখে মনে মনে নিজের পোশাকের সঙ্গে তুলনা করলাম এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, রাজকীয় পোশাক পরে আমাকে তাদের চেয়েও বেশি জমকালো লাগছে। আমি জামার হাতা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালাম, এমব্রয়ডারি করা কলারের ওপর হাত বোলালাম এবং এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে মনে করতে দিলাম যে—আমাকে ঘিরে থাকা এই যে ইতিহাস, তার সঙ্গে আমি সত্যিই মানানসই।

একটি প্রায় খালি ঘরের ঠিক মাঝখানে, একটি কাচের বাক্স বা ডিসপ্লে কেসের নিচে একটা ছোট সাদা স্তম্ভ দাঁড়িয়ে ছিল। আর সেই স্তম্ভের ওপর রাখা ছিল কিছুটা মাটি।

প্রথম দর্শনে আমার মনে হয়েছিল এটি নিশ্চয়ই কোনো ভুল। সূক্ষ্ম নকশা করা দেয়ালচিত্র, বুদ্ধের সোনালি মূর্তি এবং তিব্বতি ধর্মগ্রন্থের সুদৃশ্য পুঁথিগুলোর মধ্যে এই মাটি কেমন যেন বেমানান লাগছিল। কিন্তু কাচের ওপরের লেবেলটি আমাকে অন্য কথা বলল। এ মাটি গুরুত্বপূর্ণ। এ মাটির একটি ইতিহাস আছে।

আমি আরও কাছে এগিয়ে গেলাম এবং নিচে লেখা লেবেলটির দিকে চোখ সরু করে তাকালাম। লেখা ছিল : লিথাং।

নামটি আমার জানা; লিথাং ছিল আমার দাদার জন্মস্থান। পর্বত আর সীমান্ত পেরিয়ে সবকিছু ফেলে আসার আগে তিব্বতে এটিই ছিল আমার পরিবারের শেষ চেনা ঠিকানা; ফেলে আসার তালিকায় শুধু রয়ে গিয়েছিল তাদের স্মৃতিগুলো। আমার দাদা একসময় ওই মাটিতে হেঁটেছিলেন। আর আজ, অসম্ভব হলেও সত্যি, সেই মাটিরই একটি অংশ আমার সামনে রাখা।

হয়তো সেটা ছিল কৌতূহল। কিংবা হয়তো আরও গভীর কিছু—এমন এক আবেগ যার ভাষা তখনো আমার জানা ছিল না। আমি খেয়াল করলাম, কাচের বাক্সের বাইরে মেঝেতে সামান্য কিছুটা মাটি পড়ে আছে। কোনো কিছু না ভেবে—বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে—আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম, আঙুলে করে এক চিমটি মাটি তুলে নিয়ে সোজা মুখে পুরে দিলাম।

হ্যাঁ, এটিকে হয়তো নয় বছরের একটি বাচ্চার হুট করে ফেলা বোকামি সিদ্ধান্তও বলা যেতে পারে। তবে আমি এটাকে আমার ‘অন্তর্দৃষ্টি’ বা ‘মনের ডাক’ বলতেই পছন্দ করি।

বৌদ্ধ ধর্ম শেখায় যে, আপনি যদি খুঁজে নিতে পারেন তবে প্রতিটি জিনিসেরই গভীর অর্থ আছে। এটি শেখায় যে মানুষের মন অত্যন্ত শক্তিশালী, এবং বিশ্বাসই বাস্তবকে রূপ দিতে পারে। তাই আমি সেই সাধারণ মুহূর্তটিকে একটি অসাধারণ অর্থে পূর্ণ করার অনুমতি নিজেকে দিয়েছি। 

আমি বিশ্বাস করতে চাই যে, সেই মুহূর্তে আমি কেবল মাটি খাচ্ছিলাম না—আমি আমার ‘নিজ দেশ’-এর স্বাদ নিচ্ছিলাম। যে দেশে আমি কখনো পা রাখিনি, যে দেশটিকে আমি জন্ম নেওয়ার আগেই আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যে মাটিতে আমার পূর্বপুরুষেরা হেঁটেছিলেন, কেবল নিজের মতো করেই সেটিরই একটি অংশকে আমি আমার সত্তার ভেতর ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম।

সেই মাটি পর্বত, নদী আর সীমান্ত পেরিয়ে তিব্বত থেকে নেপাল হয়ে ভারতে পাচার করে আনা হয়েছিল। এটি এমন এক যাত্রা করেছিল যা করার ক্ষমতা আমার ছিল না। তিব্বতের নির্বাসিত সরকারে আমার বাবার পদের কারণে, তিব্বতের মাটিতে আমার কোনোদিন পা রাখার সম্ভাবনা বলতে গেলে শূন্য। বন্ধুদের সঙ্গে কখনো কখনো আমি এটা নিয়ে ঠাট্টা করি, ‘আমি তিব্বত গিয়েছি—গুগল আর্থে। এর চেয়ে বেশি কাছে যাওয়ার অনুমতি আমার নেই।’ তারা হাসে, হাসিতে তাদের চোখের কোণ কুঁচকে যায়, আর আমিও তাদের সাথে হাসি। তবে এটি এমন এক ধরনের রসিকতা, যা মানুষ কেবল নিজেকে সামলে রাখার জন্য বা গলা যেন ধরে না আসে সেজন্য করে থাকে।

এমন কোনো জায়গার অভাব তীব্রভাবে অনুভব করা খুব কষ্টের, যেখানে আপনি কখনো যানইনি। নিজের হাড়ের গভীরে এমন এক হাহাকার বয়ে নিয়ে বেড়ানো—অথচ সেই ব্যাকুলতার যে অস্তিত্ব আছে, তার সপক্ষে প্রমাণ করার মতো বাস্তব কিছুই আপনার কাছে নেই। কোনো শৈশবের স্মৃতি নেই, কোনো ছবি নেই, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম, দেশে থাকতে...’ বলে বলার মতো কোনো গল্পও নেই। কেবল একটি অনুভূতি। কেবল এমন এক দেশের প্রতি টান, যা আমার কাছে বিদ্যমান শুধু ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু শুধু ব্যাকুলতাই যথেষ্ট নয়।

আমি ভারতে থাকি, আমেরিকাতে থাকি কিংবা বিশ্বের অন্য যে কোনো প্রান্তেই থাকি না কেন, আমার দায়িত্ব অপরিবর্তিতই থেকে যায়। একজন তিব্বতি হিসেবে আমি নির্বাসনের বোঝা বয়ে বেড়াই। একজন বৌদ্ধ হিসেবে আমাকে শেখানো হয়েছে যে, যাতনাকে দয়া বা করুণা দিয়ে মোকাবিলা করতে হয়। আর একজন মানুষ হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, কাউকেই তার জন্মভূমি, সংস্কৃতি বা নিজস্ব পরিচয় থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।

সেই মাটি শুধু সাধারণ কোনো মাটি ছিল না—ওটি ছিল একটি প্রমাণ। প্রমাণ যে তিব্বত রাজনীতি, নির্যাতন এবং নির্বাসনের ঊর্ধ্বে গিয়েও টিকে আছে। প্রমাণ যে, আমাদের কাছ থেকে যতই কেড়ে নেওয়া হোক না কেন, কোনো না কোনো অংশ সবসময় রয়েই যাবে। আর তাই, আমি সবসময় লড়াই করে যাব। কথার মাধ্যমে হোক, কাজের মাধ্যমে হোক কিংবা আমার সাধ্যে থাকা যে কোনো উপায়ে হোক—আমি তিব্বতের জন্য লড়াই করব। কারণ আমাকে লড়াই করতেই হবে, কারণ এটাই আমার কর্তব্য। কারণ এটাই আমার আসল পরিচয়।

অনুবাদ : ফরহাদ নাইয়া

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close