শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬,
২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: বাংলাদেশ নয় হাসিনাকে প্রাধান্য দিচ্ছে ভারত      হামের থাবায় নতুন ভয়      চার মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নতুন সচিব নিয়োগ      পরিবর্তন হচ্ছে র‌্যাবের নাম      প্রথম শ্রেণিতে লটারি, অন্য সব শ্রেণিতে নেয়া হবে ভর্তি পরীক্ষা      ডেঙ্গু নিয়ে একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ৪৭১      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু      
জীবনানন্দ
‘স্মরণ’ রবীন্দ্র-কাব্যে মৃণালিনী
তপনকুমার দেবনাথ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১১ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

মৃণালিনীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহিত জীবনের বাসর শুরু হয়েছিল গানের মাধ্যমে‘আ মরি লাবণ্যময়ী, কে ও স্থির সৌদামিনী, পূণিমা-জোছনা দিয়ে এইটুকু মর্জিত বদনখানী’। বিয়ের তিন মাস পরে আবারও সংগীত‘হৃদয়কাননে ফুল ফোটাও আধো নয়নে সখী চাও চাও।’ 

তিনি বিয়েরও পূর্বে কারওয়ার সমুদ্রসৈকতে বসে কবি-কল্পনার বালিকারূপিণী সীমা ও সন্ন্যাসীরূপী অসীমের মিলন সাধনের মধ্যে তার জীবনের পূর্ণতার কথা প্রকাশ করে নিজের জীবননাট্যের ও কাব্যনাট্যের ভূমিকা রচনা করেছিলেন। কবির জীবন ও কাব্যের এটাই একমাত্র পালা। মিলন সাধনের পালা কবি ‘আত্মপরিচয়’-এ লিখেছেন, ‘তখন আমি নিজে ভাল করিয়া বুঝিয়াছিলাম কি না জানি না কিন্তু তাহাতে এই কথা ছিল যে, এই বিশ্বকে গ্রহণ করিয়া এই সংসারকে বিশ্বাস করিয়া, এই প্রত্যক্ষকে শ্রদ্ধা করিয়া আমরা যথার্থভাবে অনন্তকে উপলব্ধি করিতে পারি।’ 

করোয়ার থেকে ফিরে এসে সার্কুলার রোডে লিখলেন ‘ছবি ও গান’ কাব্যগ্রন্থটি। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতার মধ্যে রয়েছে সংসার অনভিজ্ঞ ‘বাতায়নবাসী’ কবির নবযৌবনের সুখ স্বপ্ন ও জাগ্রতস্বপ্নের মধ্যে অনাগত অচেনা রহস্যময়ী ‘কে’র প্রতি উচ্ছ্বাস ও আনন্দের কাহিনি, আর তারই সঙ্গে কবির ভালো লাগুক বা না লাগুক স্থায়ীভাবে রহস্যময় যৌবনের আবির্ভাব হল ‘রাহুর প্রেম’-এ। তাই কবি ‘জাগ্রত স্বপ্নে’ লিখলেন
কেহ কি আমারে চাহিবে না?
কাছে এসে গান গাহিবে না?
পিপাসিত প্রাণে চাহি মুখপানে
কবে না মধুর বাণী?
তবে শুধু শুধু কেন এ সাজানো,
কেন এ রতন-খানি?
রবীন্দ্রনাথ এই কবিতাটিতে এক গভীর একাকিত্ব, অপেক্ষা এবং উপেক্ষার বেদনা ফুটিয়ে তুলেছেন। বাহ্যিক রূপ, ধন-সম্পদ বা সাজগোজ যে মানুষের ভেতরের শূন্যতা ও ভালোবাসার তৃষ্ণা মেটাতে পারে না সেটিই এখানে প্রকাশ পেয়েছে। কেউ একজন পরম যত্নে কাছে আসবে, ভালোবাসার গান গাইবে, এই আকুলতাই এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। কবির এই দুটি গ্রন্থই কনে দেখার পরবর্তীকালের ও বিবাহপূর্ব কবির অন্তর কাহিনির বর্ণনা রয়েছে। তাই গ্রন্থ দুটিতে (প্রকৃতির প্রতিশোধ, ছবি ও গান) বিশেষ ভাবে ছবি ও গানে অনাগত ‘কে’র উদ্দেশ্যে বিবাহিত জীবনের পূর্বাভাষের ছবি একে কবি সুখস্বপ্ন ও জাগ্রতস্বপ্ন দেখেছেন।

বিবাহিত জীবনে মৃণালিনী ছিলেন কবিজীবনের এক শান্ত, নিঃশব্দ ও ছায়াময়ী সহচরী। তার মৃত্যুর পরেই কবির মনের সব জমে থাকা হাহাকার ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন। ৭ অগ্রহায়ণ ১৩০৯ তার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই [অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘ] রবীন্দ্রনাথ যে কবিতাগুলো রচনা করেন সেগুলো একত্র করে বিশ্বভারতী ১৩২১ সালে ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে, যা ‘৭ই অগ্রহায়ণ ১৩০৯’ নামে উৎসর্গিত। এতে মোট ২৭টি কবিতা আছে; এই কবিতাগুলো মৃণালিনীর প্রতি শোক ও স্মৃতিকাতরতারই বহিঃপ্রকাশ।
 
রবীন্দ্রনাথ অগ্রহায়ণ মাসে লিখেছেন নয়টি কবিতা। প্রথম কবিতা ‘আজি প্রভাতেও শ্রান্ত নয়নে/ রয়েছে কাতর ঘোর।/ দুখশয্যায় করি জাগরণ/ রজনী হয়েছে ভোর।’ এই পঙ্ক্তিগুলোতে মৃণালিনীর প্রয়াণের পরদিন প্রভাতের চিত্র ফুটে উঠেছে; একইসঙ্গে স্ত্রীর আকস্মিক বিয়োগে কবির শোকগ্রস্ত মন ও বাইরের উজ্জ্বল প্রকৃতির এক চরম অসঙ্গতির প্রকাশ। তাই কবি বাইরের আনন্দ ও সৌন্দর্য থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন থাকতে চেয়েছেন।

দ্বিতীয় কবিতাটি সহধর্মিণীর বিয়োগব্যথা থেকে সৃষ্ট ‘সে যখন বেঁচে ছিল গো তখন/ যা দিয়েছে বারবার/ তার প্রতিদান দিব যে এখন/ সে সময় নাহি আর।’ এতে পত্নীর প্রতি কবির তীব্র অনুশোচনা, শূন্যতাবোধ এবং ভালোবাসার আধ্যাত্মিক সমর্পণের এক অসামান্য নিদর্শন পাই। 

‘প্রতিক্ষা’ [৩] কবিতাটিতে মৃণালিনীর মৃত্যুজনিত চরম শোককে কবি এখানে আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে রূপ দিয়েছেন, যেখানে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং অনন্তের পথে এক নতুন যাত্রা। ‘শেষ কথা’য় [৪] রবীন্দ্রনাথ প্রিয়তমা স্ত্রী মৃণালিনীর আকস্মিক ও নিঃশব্দ প্রয়াণের পর কবির হৃদয়ের গভীর শূন্যতা এবং একাকিত্বের বেদনা ফুটে উঠেছে। এ শোকগাথায়, কবি প্রিয়জনের অকাল মৃত্যুর হাহাকার এবং পরে পরপারে এক চিরন্তন মিলনের আকুল আকাক্সক্ষাকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।

‘প্রার্থনা’ [৫] কবিতায় ‘আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই।’ পার্থিব ঘরের ক্ষুদ্র পরিসরে প্রিয়তমাকে হারানোর গভীর শূন্যতা এবং ঈশ্বরের অসীম বিশ্বময় সৃষ্টিলোকের মাঝে সেই হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে খুঁজে পাওয়ার এক পরম আধ্যাত্মিক আর্তি দেখতে পাই। 

‘আহ্বান’ [৬] কবিতায় ‘ঘরে যবে ছিলে মোরে ডেকেছিলে ঘরে/ তোমার করুণাপূর্ণ সুধাকণ্ঠস্বরে।’Ñপ্রণয়নীর অকাল প্রয়াণের ব্যক্তিগত দুঃখকে কবি এখানে এক মহৎ আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে রূপ দিয়েছেন। মৃত্যু এখানে প্রিয়জনকে কেড়ে নেয়নি, বরং তাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়ে কবির চেতনাকে বৃহত্তর সত্যের দিকে আহ্বান করেছেন। 

‘পরিচয়’ [৭] কবিতাটিতে বাহ্যিক রূপের বিনাশ ঘটলেও ভালোবাসার মানুষটি যে আত্মার গভীরে এক অবিনশ্বর ও নতুন পরিচয়ে চিরকাল রয়ে যায়, কবিতাটিতে সেই পরম সত্যটিই প্রকাশিত হয়েছে। 

‘মিলন’ [৮] কবিতায় মৃণালিনীর অকালপ্রয়াণজনিত শোককে কবি এই কবিতায় এক পরম আধ্যাত্মিক শান্তিতে রূপান্তর করেছেন, যেখানে মৃত্যু মিলনকে কেড়ে নেয়নি, বরং তাকে চিরন্তন ও সম্পূর্ণতা দান করেছে।

‘সার্থকতা’ [১৩] কবিতায় কবি আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘চির বিদায়ের আভা দিয়া/ রাঙায়ে গিয়াছ মোর হিয়া,/ এঁকে গেছ সব ভাবনায়/ সূর্যাস্তের বরনচাতুরী।’ মৃত্যুর অমোঘ আঘাত কীভাবে প্রিয়জনের পবিত্র পরশে মধুময় হয়ে উঠেছে এবং জীবন ও মরণকে এক অভিন্ন কল্যাণময় বন্ধনে বেঁধে দিয়েছে, তারই এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক উপলব্ধি কবিতাটিতে প্রস্ফুটিত হয়েছে। 

পৌষ মাসে কবি লিখেছেন মোট সতেরোটি কবিতা। পার্থিব জগতের ভালোবাসার ক্ষুদ্র স্মৃতিগুলো কালের নিয়মে হারিয়ে যায় না। প্রিয়তমার ভালোবাসা যেমন সামান্য কিছু চিঠিতে দেখা যায় ‘দেখিলাম খানকয় পুরাতন চিঠি/ স্নেহমুগ্ধ জীবনের চিহ্ন দু-চারিটি/ স্মৃতির খেলেনা ক’টি বহু যত্নভরে/ গোপনে সঞ্চয় করি রেখেছিলে ঘরে।’ আর এই স্মৃতিটিকে কেন্দ্র করেই ‘সঞ্চয়’ [১৪] কবিতার জন্ম। প্রসঙ্গত, মৃণালিনী মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ তার ড্রয়ায় থেকে মোট ৩৬টি চিঠি উদ্ধার করেন। এই চিঠিগুলো ছিল পত্নীকে লেখা তার চিঠি। আর এটিই হয়ে ওঠে ‘চিঠিপত্র’-এ রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক মৃণালিনীকে দেওয়া চিঠির সম্ভার।

‘রচনা’ [১৫] কবিতায় ‘এ সংসারে একদিন নববধূবেশে/ তুমি যে আমার পাশে দাঁড়াইলে এসে,/ রাখিলে আমার হাতে পম্পমান হাত/ সে কি অদৃষ্টের খেলা, সে কি অকস্মাৎ?’ দাম্পত্যজীবন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং তা অনাদিকাল থেকে নির্ধারিত একটি যৌথ শিল্পকর্ম; এবং স্ত্রীর অকালপ্রয়াণে অর্ধসমাপ্ত থেকে যাওয়া সেই জীবন-রচনাকে সম্পূর্ণ করার এক পরম আকুলতা দেখতে পাই এখানে। অর্থাৎ দাম্পত্যের স্মৃতিকে কবি এখানে একটি পবিত্র কাব্যের মতো বিবেচনা করেছেন। 

পরেই লিখেছেন ‘সন্ধান’ [১৬] কবিতাটি। মৃণালিনীর মৃত্যুতে তার জীবনের আনন্দ, সুখ ও না-বলা সাধগুলো হারিয়ে যায়নি, বরং প্রকৃতির আলো, হাওয়া, মেঘ ও নিস্তব্ধতার মাঝে শাশ্বত রূপ ধারণ করেছে কবি তারই এক পরম অনুভূতিশীল ‘সন্ধান’ করেছেন কবিতাটিতে। 

কবিগুরু লিখেছেন ‘হে লক্ষ্মী, তোমার আজি নাই অন্তঃপুর’। মৃণালিনীর মৃত্যুর শোককে কবি এখানে দেবত্বে রূপ দিয়েছেন। ঘরোয়া সাধারণ এক নারী কীভাবে মৃত্যুর পর জাগতিক বন্ধনমুক্ত হয়ে কবির চেতনায় অসীম জ্ঞান, শিল্প ও মঙ্গলের এক শাশ্বত দেবীপ্রতিমা হয়ে উঠলেন, ‘লক্ষ্মী-সরস্বতী’ [৯] কবিতায় তারই রূপ প্রকাশিত হয়েছে।

জীবিতাবস্থায় চিরলজ্জাবতী ও অন্তর্মুখী মৃণালিনীর মনের অব্যক্ত কথাগুলো জানার অপূর্ণতা এবং মৃত্যুর পরপারে ভাষা ও দেহের বন্ধনমুক্ত সেই আত্মার কাছ থেকে তার অন্তরের গভীরতম অনুভূতির কথা শোনার এক আকুল প্রার্থনা জানিয়ে ‘কথা’য় [১০] লিখেছেন ‘তোমার সকল কথা বল নাই, পার নি বলিতে’। অর্থাৎ চিরকালের লাজুক ও অবদমিত বাঙালি বধূর না-বলা বেদনাকে কবি এখানে স্বীকার করেছেন।

মৃত্যুর মাধ্যমে পার্থিব সংসারের চেনা বাঁধন ছিন্ন হলেও, পরপারের অবিনশ্বর আনন্দলোকে প্রিয়তমার সাথে এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক নতুন দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আকুতি দেখতে পাই ‘নব পরিণয়’ [১১] কবিতায়। এর পরেই ‘পূর্ণতা’ [১২]-এর মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন পার্থিব জগত থেকে যা কিছু হারিয়ে যায়, তা আসলে ঈশ্বরের অসীম সৃষ্টিলোকে গিয়ে এক নতুন ও স্থায়ী পূর্ণতা লাভ করে। মৃত্যু এখানে শোকের কারণ নয়, বরং আত্মার পরম বিকাশ ও চিরন্তন সার্থকতার প্রতীক।

‘অশোক’ [১৭] কবিতায় দেখতে পাই মৃত্যুর চরম আঘাতের পর ব্যক্তিগত শোক কীভাবে এক শাশ্বত ও বাধাহীন আধ্যাত্মিক মিলনে রূপান্তরিত হয় এবং প্রয়াত প্রিয়তমা কবির আপন জীবনে কীভাবে অবিনশ্বর হয়ে বেঁচে আছেন, তারই এক পরম উপলব্ধি ‘মৃত্যু-মাঝে আপনারে করিয়া হরণ/ আমার জীবনে তুমি ধরেছ জীবন/ আমার নয়নে তুমি পেতেছ আলোক / এই কথা মনে জানি নাই মোর শোক।’

‘জীবনলক্ষ্মী’ [১৮] কবিতায় কবি বুঝাতে চেয়েছেন তার স্ত্রী মৃণালিনীর অকালমৃত্যু তাদের সম্পর্ককে ধ্বংস করেনি, বরং তাকে এক পরম পবিত্রতায় রূপান্তর করেছে। অর্থাৎ ‘সংসার সাজায়ে তুমি আছিলে রমণী’ একদিন সাধারণ এক গৃহিণী হিসেবে কবির ঘর সাজাতেন, তিনি আজ অন্তরের সমস্ত জীর্ণতা ও অলসতা দূর করে তাকে ঈশ্বরের চরণে পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের জন্য প্রস্তুত করছেন।

‘সন্ধ্যাদীপ’ [২৩] কবিতায় কবি জীবনের সব কীর্তি ও কর্মব্যস্ততাকে ‘শুষ্ক বোঝা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে হৃদয়ের একান্তে প্রেমের প্রদীপ জ্বেলে রাখার মধ্যদিয়ে পরম শান্তি খোঁজার আকুতি জানিয়ে লিখেছেন ‘জ্বালো ওগো জ্বালো সন্ধ্যাদীপ জ্বালো হৃদয়ের এক প্রান্তে ওইটুকু আলো স্বহস্তে জ্বালায়ে রাখো।’

‘প্রেম’ [২১] কবিতায় দেখতে পাই কবি যেন প্রিয়তমার প্রেম ও তার স্মৃতির সোনার আলো মৃত্যুর অন্ধকার পটেও এক মায়াবী স্বপ্নের মতো জেগে থাকে। শেষ পর্যন্ত, এই প্রেমই কবিকে এক অনিমেষ আকর্ষণে পরম মৃত্যুর দিকে অর্থাৎ এক বৃহত্তর আধ্যাত্মিক মিলনের দিকে নিয়ে যায়।

পত্নী বিয়োগের গভীর শোককে গোধূলির স্নিগ্ধতার সঙ্গে মিলিয়ে কবি-জীবনের ক্লান্তি ও মলিনতাকে আচ্ছন্ন করার এক শান্ত আকুতির প্রকাশ দেখতে পাই ‘গোধূলী’ [২৪] কবিতায়। এতে জাগতিক অতৃপ্তি ও ক্ষোভকে ভুলে, বিষাদকে এক উদার উপলব্ধিতে রূপান্তর করে পরম শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার আত্মনিবেদন প্রকাশ পেয়েছে।

‘বসন্ত’ [১৯] কবিতায় মৃণালিনীর মৃত্যুর পর তার ফিরে না-আসা এবং অতীতে কাটানো মুহূর্তগুলোর প্রতি কবির এক তীব্র হাহাকার ফুটে উঠেছে। অতীতে বসন্তের মিলন-মুহূর্তগুলোকে অবহেলা করায়, এখন প্রিয়তমার চিরবিদায়ের পর সেই বসন্তই কবির হৃদয়ে অনুশোচনা ও শূন্যতা তৈরি করেছে। এর পরেই ‘উৎসব’ [২০] কবিতায় কবি হৃদয়ের গভীর শূন্যতা ও বেদনার মাঝে প্রকৃতির আনন্দকে বরণ করে নেওয়ার আকুলতা প্রকাশ করে তাকে আহ্বান করে লিখেছেন ‘এসো, বসন্ত, এসো আজ তুমি আমারও দুয়ারে এসো’। এই কবিতায় মূলত শোকাতুর হৃদয়ের এক পরম আত্মসমর্পণ, যেখানে কবি তার ব্যক্তিগত বেদনাকে প্রকৃতির চিরন্তন উৎসবের আলোয় রূপান্তরিত করতে চেয়েছেন।

পত্নীর মৃত্যু-শোকের তীব্র অনুভূতি কাটিয়ে আত্মিক জাগরণ এবং মৃত্যুকে পেরিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে কবির আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রস্তুতি ফুটে উঠেছে ‘জাগরণ’ [২৫] কবিতায়। এখানে কবি ব্যক্তিগত কান্নাকাতরতা থেকে মুক্ত হয়ে বৈরাগ্য ও রুদ্র সুন্দরের উপলব্ধিতে পৌঁছান।

‘পূজা’ [২৬] কবিতার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো প্রয়াত স্ত্রীর ইহজাগতিক জীবন ও কর্তব্যের অবসান এবং কবির অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে তার স্মৃতির চিরন্তন আসন প্রতিষ্ঠা। সহধর্মিণী মৃত্যুর পর তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত এই কবিতায় প্রেম, ভক্তি ও এক গভীর আধ্যাত্মিক রূপান্তর ফুটে উঠেছে।

রবীন্দ্রনাথ মাঘ মাসে একটি কবিতা লিখেছেনমাত্র, যা ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থের দ্বৈতরহস্য [২২]। এখানে প্রেমের এক চিরন্তন দার্শনিক দ্বন্দ্ব দেখতে পাই; যেখানে মানুষের দেহ এবং হৃদয়ের চাওয়া সবসময় একবিন্দুতে মিলতে পারে না। মৃণালিনীর মৃত্যুর পর স্মৃতির পটভূমিতে দাঁড়িয়ে কবি মানুষের প্রেমের এই জটিল মনস্তত্ত্ব ও রহস্যকে কবিতায় রূপ দিয়ে লিখেছেন ‘হে রমণী, ক্ষণকাল আসি মোর পাশে/ চিত্ত ভরি দিলে সেই রহস্য আভাসে।’ অর্থাৎ দৃশ্যমান জগতের বাইরেও হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে প্রেম এক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য দ্বৈতরহস্য হিসেবে রয়ে যায়।

‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা ‘সম্ভোগ’। এই কবিতায় কবি প্রয়াত পত্নীর প্রতি ভালোবাসার আধ্যাত্মিক রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। এতে মৃত্যুশোক কাটিয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে চেতনা-স্তরে একাত্ম হওয়ার গভীর অনুভূতি ও প্রকৃতির মাধ্যমে প্রিয়ার উপস্থিতি প্রকাশ পেয়েছে।

মৃণালিনী দেবী গুরুতর অসুস্থ হলে পড়ে তার সুচিকিৎসার জন্য শান্তিনিকেতন থেকে ২৭ ভাদ্র ১৩০৯ [১২ সেপ্টেম্বর ১৯০২] মহর্ষিভবনে আনা হয়। তখন রোগশয্যায় শায়িত স্ত্রীর পাশে কবি দিন-রাত জেগে বসে থাকতেন আর তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করতেন। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা যখন ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন কবি এক গভীর শূন্যতা ও অসহায়ত্ব অনুভব করেন। তিনি বুঝতে পারলেন ঘরের দরজায় ‘মৃত্যু’ এসে অত্যন্ত নীরবে, অলক্ষ্যে দাঁড়িয়েছে। এ মানসিক অবস্থা থেকেই কবি হয়তো লিখেছেন ‘মরণ’ কবিতা
অত চুপি চুপি কেন কথা কও 
ওগো মরণ, হে মোর মরণ।
অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও,
ওগো একি প্রণয়েরি ধরণ?’১
‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘স্ত্রীর মৃত্যুর পর শোকাশ্রু কাব্যধারায় উছলিয়া উঠিল। যে-কাব্যপ্রেরণা ক্ষীণ স্রোতে বহিতেছিল, বিচ্ছেদের বেদনায় ক্ষণকালের জন্য তাহা বন্যার ন্যায় দুকুলপ্লাবী হইল, কিন্তু কর্তব্যের দৃঢ় বন্ধন কোথাও শিথিল হইল না; অত্যন্ত সংযত সংহত ভাবে তাহা বহিয়া গেল। কয়েকটি সনেটের মধ্যে ‘স্মরণ’ করিলেন কবিজায়াকে।’২

সবশেষে ‘স্মরণ’ হল রবীন্দ্রনাথের এমন একটি কাব্যগ্রন্থ, যেখানে তার সহধর্মিণী মৃণালিনীকে হারানোর ব্যক্তিগত কান্না বৈশ্বিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমের শান্ত ও উদাত্ত উপলব্ধিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি রবীন্দ্র-সাহিত্য তথা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এটি কেবল প্রিয়জন হারানোর বিলাপ নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত শোক কীভাবে বিশ্বজনীন অধ্যাত্ম-চেতনায় এবং এক গভীর দার্শনিক শান্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে, তার এক অনন্য দলিল।

প্রাবন্ধিক ও গবেষক

গ্রন্থ সহায় :
মরণ, বঙ্গদর্শন, ভাদ্র ১৩০৯। উৎসর্গ : ৪৫, রবীন্দ্র-রচনাবলী [দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭১] বিশ্বভারতী, চৈত্র ১৩৪৮
রবীন্দ্রজীবনী [দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৯]প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। বিশ্বভারতী, শ্রাবণ ১৪২৬
স্মরণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ্বভারতী, শ্রাবণ ১৪২৬

কেকে/ এমএম


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close