প্রচন্ড দাবদাহ। কয়েক দিন ধরে লোডশেডিং ও ব্যাপক, ঠিক মতো বিদ্যুৎ থাকে না। দুপুরে ভাত খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে আছেন শরীফ মাস্টার, একটু ঘুম ভাব। সেই মুহূর্তে বিদ্যুৎ চলে যায়, খুব বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে ওঠে বাইরে বের হন। বাড়ির বাইরে বেশ বড় উঠান। কোণে বড় একটি বটগাছ। গ্রামীণ রাস্তাটি উঠানের মাঝ দিয়ে চলে গেছে হাটখোলার দিকে-কয়েক বছর হলো রাস্তাটি পাকা হয়েছে। গরমের সময় কত মানুষ এই গাছটির নিচে বসে বিশ্রাম নেন, শীতল হয়।
শরীফ মাস্টার গাছটির নিচে বসেন। এক পাশে দুটি কুকুর কি আরামে ঘুমাচ্ছে- শরীফ সাহেব চেয়ারে বসে গাছটির দিকে গভীরভাবে তাকান। বাবার কাছে শুনেছেন যেদিন তার জন্ম হয় বাবা খুশি হয়ে স্মৃতিস্বরূপ এই বট গাছটি রোপন করেন। গাছটি কি তরতাজা হয়ে চারিদিকে বিস্তৃত হচ্ছে- তার ছায়া দিনে দিনে গভীর হচ্ছে। আর তিনি অসুস্থ, দিনে-দিনে শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে, কয়েক মাস আগে স্ট্রোক করেছেন। শেফালী বেগম পান নিয়ে আসেন। এক মাত্র কন্যা মুসকান বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে বাংলা নিয়ে পড়ছে। টুকটাক কবিতা লেখালেখি করে। এই অস্বস্তিকর গরমে একজন লোক মটর সাইকেল নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ান। সালাম দেন।
কে আপনি?
আমি আব্দুল।
পেশায় একজন ঘটক। গ্রাম বনগাঁও।
বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। শুনলাম আপনার একটি মেয়ে আছে?
হ্যাঁ আছে।
আব্দুল হাসতে হাসতে বলেন, বিয়ে-শাদীর চিন্তাভাবনা আছে কিনা-
পাত্র অপছন্দ করতে পারবেন না স্যার। একেবারে প্রথম শ্রেণির! অর্থ-সম্পদ, শিক্ষা, চেহারা সব সাইটেই সুন্দর! আপনার মেয়ের সাথে খুব মানাবে।
আপনি আমার মেয়েকে দেখেছেন? দেখেছি তো বটে-
আমরা ঘটক মানুষ, রাস্তা-ঘাটে সুন্দর মেয়ের দিকে একটু-আধটু তাকাই, তবে অসৎ উদ্দেশ্যে না স্যার। ঘটকালি তো-ঘটকদের একটি ব্যবসা।
একসময় যা ছিল সময় তা সব শেষ হয়ে গেছে, খানদানি পরিবার-
এখন কাজ করতে লজ্জা হয় তাই এই পথ ধরেছি, বেশ ইনকাম-
শরীফ মাস্টার একটু ইতোস্তত হয়ে জিজ্ঞেস করেন- বেশ ইনকাম বলতে? স্যার বুঝলেন না।
আপনার মেয়ে বিয়ে দিলে আপনি তো অবশ্যই কিছু দিবেন, অপর পক্ষে ছেলে পক্ষ কিছু দিবেন। আমার তো একটা কন্ডিশন অবশ্যই থাকবে।
একটা বিয়ে দিতে পারলে মাসের খরচ হয়ে যায়।
যাক সে সব কথা।
ছেলে কি করে বংশ আদি জায়গা-সম্পত্তি কেমন? এখন মূল জায়গায় এসেছেন? সব পিতা-মাতার এই একটি প্রশ্ন?
একেবারে একশ এ- একশ স্যার। বাবা সাবেক চেয়ারম্যান, একমাত্র পুত্র পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। টাকা-সম্পদ বলতে হবে না, বড় ব্যবসায়ী, ভাটার ব্যবসা করে, শহরে দুটি বাসা ভাড়া দেওয়া আছে;
ছেলেপক্ষ আমার মেয়েকে বিয়ে করবে তো?
আপনি যা বললেন আমার তো তাদের মতো অবস্থা না, আমি পেশায় একজন বেসরকারি স্বল্প বেতনের শিক্ষক, সম্পদ বলতে কয়েক বিঘে জমি।
ও আপনাকে চিন্তা করতে হবে না স্যার। আপনার মেয়ে যা সুন্দর! হয়ে যাবে।
সুন্দর! কিভাবে দেখলেন? তা দেখেছি- ছেলের পক্ষ থেকে পজিটিভ পেয়েছি, সেই জন্য এত পথ কষ্ট করে এসেছি। ডিমান্ডের বিষয়ে আপনি যা খুশি দিবেন সেটাই হবে, তবে-
স্যার? আমার বিষয়টা ভালো করে দেখবেন। শরীফ সাহেব বেশ খুশি হন, ছেলে পক্ষের ঠিকানা নেন। দুপুরে ভাত খাওয়ার জন্য জোর করলে আব্দুল খাওয়ার চেয়ে টাকার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন।
স্যার পেট্রোলের যে দাম সবই তো বুঝতে পারছেন। পান খাওয়া কালো দাঁতগুলো মেলে একটা হাসি দেন। টাকা না দিলে লোকটি মন খারাপ করে চলে যাবেন, বাড়ি থেকে পাঁচশত টাকার একটি নোট নিয়ে আসেন। টাকাটা নিয়ে, খুশিতে বলেন-
বিষয়টি ছেলের পক্ষ থেকে অকে আছে ,
আপনি খোঁজখবর নিয়ে জানাবেন। আপনি ওকে করলে, ফাইনাল ডেট হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্।
শরীফ সাহেব খোঁজখবর নেন।
ছেলের বাবা বাড়িতে আসেন দিন তারিখ ঠিক করে ফেলেন।
চেয়ারম্যান সাহেব মেয়েকে দেখতে চান। শরিফ সাহেব বলেন মেয়ে আমার হোস্টেলে আছে-
ও আচ্ছা সমস্যা নেই-
ছেলে যেহেতু দেখেছে, আলহামদুলিল্লাহ্ বলে ফেলি বেয়াই।
শেফালী বেগম রাতে মেয়েকে মোবাইল করে বলেন দ্রুত বাড়িতে আসো, আজকেই যেতে হবে মা?
হ্যাঁ-
একটা বিষয় আছে-
কি হয়েছে? বাবার কি কোন সমস্যা? ভালো না, স্ট্রোকের মানুষ কখন কি হয়-
আগামীকাল অবশ্যই বাড়ি আসবে, মুসকান বাড়ি ফিরে-
মা মুসকানকে সব ঘটনা খুলে বলেন। মুসকানের ভেতরটা ভেঙে পড়ে বের হয়ে আসতে থাকে লুটিয়ে পড়ে, লোক চক্ষুর ভয়ে মা কাউকে না ডেকে হাত পায়ে তেল মালিশ করে, বুকে জড়িয়ে নিয়ে বুঝাতে থাকে বাবার দিকটা ভেবে দেখো, দুঃখ পেলে চিরদিনের জন্য বাবাকে হারাবি, না করিস না- তুমি তো সব জানো মা- আমাকে না পেলে আবির মরে যাবে মা। মুসকান কাঁদতে থাকে। আর একটা বছর অপেক্ষা করো মা, আর একবার আমাকে সময় দাও- এ বছরে জাপানে শেষ হবে আবিরের পিএইচডি।
সে এসে তোকে তো বিয়ে নাও করতে পারে বর্তমান ছেলেদের বিশ্বাস করা কঠিন।
মুসকান আবির কে মেসেজ দেয়।
তাড়াতাড়ি ফিরে এসো-
কোন একটা ব্যবস্থা কর। বাবা আমাকে না জানিয়ে বিয়ের ডেট করে ফেলেছে। বেশ কয়েক মাস ধরে আবির মুসকানকে অবহেলা করা শুরু করেছে। মুসকানকে আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে না। ম্যাসেজ দিলে উত্তর দেয় না, ফোন ধরে না। আজ অনেকবার কল দিয়েছে কল ধরেনি। অনেক পরে ম্যাসেজের উত্তর পেয়েছে, ভালোবাসার মানুষের কাছে অবহেলা
পেলে অবহেলার চেয়ে বড় কিছু আর আঘাত নেই- মুসকান
সারারাত ঘুমোতে পারেনি। আবির-মেসেজের উত্তরে বলেছে-
বেশ তো ভালো করেছে, বিয়েটা করে ফেলো, আমার পক্ষে এখন বিয়ে করা সম্ভব না। ভীষণ ব্যস্ত আছি- প্লিজ আমাকে বিরক্ত করিও না- মুসকান আজ শক্ত হয়ে গেছে, যে চোখ দিয়ে সারারাত অশ্রু ঝরেছে, সে চোখ এখন ঠনঠনে শুকনো পাথর! মুসকান সকালে মাকে ডেকে বলে, তোমরা বিয়ের আয়োজন করো আমি রাজি।
বাড়িজুড়ে বিয়ের আয়োজন। কাছের দূরের মেহমানের আগমন ঘটেছে, প্যান্ডেল বিয়ের সাজসজ্জা, হলুদ বাটা, রান্নাবান্না বাড়িজুড়ে সবার মধ্যে আনন্দ! মানুষের ভিতরের চাপা কান্নার আওয়াজ ভিতরে থাকে। অন্তরের প্রদাহ পৃথিবীর কোনো চিকিৎসা দিয়ে ভালো হয় না। মুসকানের ভিতর বয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি ঝড়! আর উৎসারিত হচ্ছে আবিরের প্রতি প্রবল ঘৃণা।
কেকে/ এমএস