মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ক্ষমতায় না গেলে কি করবেন, সেটিও বলুন
মেহেদী হাসান নাঈম
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:০৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দুয়ারে কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬। ইতোমধ্যে বরাদ্দ হয়েছে নির্বাচনি প্রতীক। প্রার্থীরা শুরু করেছেন গণসংযোগ। যাচ্ছেন ভোটারদের দুয়ারে-দুয়ারে। নির্বাচনি এলাকার পাড়া-মহল্লা চষে বেরাচ্ছেন সংসদ সদস্য প্রার্থী ও তার কর্মী-সমর্থকরা। দিচ্ছেন নানা রকম প্রতিশ্রুতি আর উন্নয়নের আশ্বাস। 

নির্বাচন ঘিরে এবারে যে উৎসবমুখর পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা নিঃসন্দেহে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইতিবাচক। গণসংযোগ থেকে শুরু করে সভা-সেমিনার আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন আলোচনার হট কেক ‘ক্ষমতায় গেলে কোন দল কি করতে চায়’। 

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন তার নানামুখী পরিকল্পনা। তবে বিএনপি মাঠপর্যায়ের নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে। যদিও বিষয়টি কেউ স্পস্ট করতে পারেনি। কোথাও বলা হচ্ছে প্রতিমাসে চাল, ডাল, তেল, লবণ পাওয়া যাবে এই কার্ড দিয়ে। আবার কোথায় বলা হচ্ছে এই কার্ড এটিএম মেশিনে দিলে টাকা বের হয়ে আসবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১০ দল বলছে নির্বাচনে জয়ী হলে জুলাই সনদের আলোকে দেশ পরিচালনা করবে।
 
শত প্রতিশ্রুতির মাঝেও যেটি অনুপস্থিত তা হলো ক্ষমতায় না গেলে কিংবা নির্বাচনে বিজয়ী না হলে প্রার্থীরা কি করবে সেই কথা। নির্বাচন কি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য? অবশ্যই না। নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে একটি দল ক্ষমতায় যাবে। অন্যদল শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে সংসদের ভূমিকা রাখবে। এটিই তো হওয়া উচিত। প্রার্থীরা ক্ষমতায় গিয়ে কি করবে সেটি যেমন ভোটারদের বলা গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি প্রয়োজন ক্ষমতায় না গেলে কি করবে সেটিও বলা। সবার আগে বলা উচিত আমি আপনাদের দেওয়া রায় বা ভোটের ফলাফল মেনে নিব। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে নির্বাচনি ফলাফল মেনা নেওয়া সংস্কৃতির চর্চা হওয়া দরকার। প্রায়ই দেখা যায় যারাই পরাজিত হন তারাই ফলাফল বর্জন করেন। এটির মাধ্যমে সেই ভোটারদের অপমান করা হয়, যাদের দুয়ারে দুয়ারে আপনি ভোট চেয়ে বেরিয়েছেন। কেননা তাদের দেওয়া রায় আপনাকে পরাজিত করেছে। গণতন্ত্রে পরাজয়ের মর্যাদা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান গণতন্ত্রের ভিত্তি। ভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা মেনে নেওয়াই গণতান্ত্রিক আচরণ। পরাজয় মানতে অস্বীকৃতি জানানো মানে পরোক্ষভাবে বলা জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।

যারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তাদের প্রত্যেকেরই প্রধান লক্ষ্য থাকে জনগণের সেবা করা। যদি তাই হয় তাহলে প্রার্থীদের উচিত ভোটে পরাজিত হলেও জনগণের সেবায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন- এই আশ্বাস দেওয়া। একজন প্রার্থী যদি ক্ষমতায় না গেলে জনসেবা করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে বুঝতে হবে তার নির্বাচনের লক্ষ্য জনসেবা ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল শুধু ক্ষমতায় যাওয়া। হয়তো সবটা সম্ভব নয়, তবে ক্ষমতায় না গিয়েও কিন্তু মানুষের সেবা করা যায়। পাশে দাঁড়ানো যায়। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে ক্ষমতায় না গেলেও ভোটারেদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার অঙ্গীকার যদি কেউ করতে পারেন, তা সাধারণ ভোটারদের মাঝে ইতিবাচক ধারণার জন্ম দেবে। নির্বাচন-পরবর্তী আচরণই আসল চরিত্র। এখন ভোটাররা অনেক বেশি স্মার্ট। নির্বাচনের আগে সাদা পাঞ্জাবি আর টুপি পরার কৌশল বেশ পুরোনো। তাই ভোটের আগেই ধারণা দিতে হবে আপনি ভোটের পর কেমন আচরণ করবেন। 

মনে রাখতে হবে ক্ষমতায় না গিয়েও দেশ ও দশের জন্য কল্যাণকর কাজ করা যায়। যে দল ক্ষমতায় থাকবে তারা সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে তা নয়। ঠিক এই জায়গাতেই বড় দায়িত্ব আছে বিরোধী দলের। গঠনমূলক সমালোচনা ও যুক্তির পর পাল্টা যুক্তি দিয়ে ক্ষমাতাশীন দলকে বাধ্য করতে হবে যেন জনকল্যাণমূখী আইন প্রণয়ন করে। বিরোধী দলকে ইতিবাচক সমালোচকের ভূমিকায় কাজ করতে হবে। 

দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার অন্যতম কারণ ছিল শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব। হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার বিএনপি-জামায়াতকে চরম নির্যাতনের মাধ্যমে নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বিরোধী দলের চেয়ারে বসিয়েছিল হুকুমের গোলাম মৃতপ্রায় জাতীয় পার্টিকে। ফলে সমালোচনা তো দূরের করা ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতাও ছিল না। মজার ব্যাপার হলো গত ৪ বছর যাবত পত্রিকায় কলাম লিখি। তবে চব্বিশের জুলাইয়ের আগে রাজনীতি নিয়ে ২ লাইন লিখতেও অনিশ্চয়তায় ভুগতে হয়েছে। ঠিক এই জায়গাতে যারা ক্ষমতায় যাবেন না তাদেরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে।  

একজন প্রার্থীর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তার সংসদীয় এলাকার মানুষের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার অবকাঠামোগত উন্নতি সাধন। নির্বাচনে পরাজিত হওয়া মানে ওই এলাকার অধিকাংশ মানুষ তার প্রতি আস্থাশীল নন। কিন্তু যারা আস্থা রেখে ভোট দিয়েছে তাদের আস্থার প্রতিদান কি দিতে হবে না? অবশ্যই দিতে হবে। এর উৎকৃষ্ট উপায় হলো নিজের পরিকল্পনাগুলো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সঙ্গে শেয়ার করে সহযোগিতা করা। ফলে সংঘাত ও হানাহানির বিপরীতে সমাজে বিরাজ করবে শান্তি ও সমৃদ্ধি। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এসে এমন রাজনৈতিক পরিবেশ প্রত্যাশা করাটা কি তরুণ ভোটার হিসেবে আমাদের ভুল? 

বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় বাজেট প্রণয়নে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। শুধু রাজনৈতিক কারণে ‘না’ বলা নয়। করতে হবে বিকল্প বাজেট ও নীতির প্রস্তাব। সরকার ভুল করলে সমালোচনার পাশাপাশি ভালো করলে সমর্থন করতে হবে। সেই সঙ্গে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য। খুঁজে বের করতে হবে কেন জনগণ ভোট দেয়নি। করতে হবে আত্মসমালোচনা। পরাজয়ের কারণ শনাক্ত করা ও নিজ দলের ভেতরে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে ঘড়িতে ঘণ্টার কাটা সব সময় উপরে থাকে না। সময়ের ব্যবধানে তা নিচে নেমে আসে। ঠিক তেমনি আজ ক্ষমতায় না গেলেও আগামীকাল আসতে পারে সেই কাক্সিক্ষত ক্ষমতা। নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতির প্রস্তুতি। ক্ষমতা হারানোকে পরাজয় নয়, শিক্ষা হিসেবে দেখা উচিত। ক্ষমতা ছাড়াও রাজনীতি হয়, এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্ষমতার বাইরেও নেতৃত্ব সম্ভব, এই উদাহরণ তৈরি করতে হবে। 

শেষ করতে চাই কিছু প্রত্যাশার কথা বলে। নির্বাচন পরবর্তী দেশের পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সকলের চেষ্টা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। ক্ষমতায় যেতে না পারলে রাষ্ট্র অচল করার রাজনীতি কিংবা জ্বালাও-পোড়াও, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করা কর্মসূচি কোনোটিই কাম্য নয়।  বিদেশি শক্তির কাছে রাষ্ট্রবিরোধী নালিশের রাজনীতি থেকে সরে আসা ও কূটনৈতিক বিষয়ে দায়িত্বশীল বক্তব্য আমরা প্রত্যাশা করতেই পারি। 

দিনশেষে দেশের অভ্যন্তরের ইস্যু যখন বিদেশি শক্তির কাছে নালিশ হিসেবে উপস্থাপিত হয় তখন মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় আমার আপনার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের। সম্মান নষ্ট হয় লাল সবুজের পতাকার। যেখানে মিশে আছে লাখো শহীদের রক্ত। মনে রাখতে হবে ক্ষমতার আগে জনতা। সবার আগে বাংলাদেশ। আসুন একসঙ্গে বাংলাদেশকে গড়ে তুলি। 

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close