ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ‘অনিয়মে ভরপুর’ ২৫ বছরের চুক্তি বাংলাদেশের বড় ‘আর্থিক বোঝার’ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, একইসঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় সামিট গ্রুপ জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ দানব’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে বিশেষ আইনে সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়টি হলো, ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম যখন ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট ছিল, তখন আদানির সঙ্গে ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে চুক্তি করা হয়। দাম নির্ধারণে এক অদ্ভূত সূচক দেওয়া আছে বিশেষ এ চুক্তিতে। এতে আদানিকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর আদানি বাড়তি নিচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার (৫-৬ হাজার কোটি টাকা)। ২৫ বছর চুক্তির মেয়াদে এক হাজার কোটি ডলার বাড়তি নিয়ে যাবে আদানি। ফলে এ খাতের সংস্কার এবং অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিচার ও জবাবদিহির আওতায় আনার জোরালো দাবি সামনে এলেও কর্যত তা ফলপ্রসু হয়নি, এখনো একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ঘিরে নতুন করে সিন্ডিকেট তৎপর হওয়ার আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
সরকার অন্যান্য উৎস থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কিনেছে, আদানির ক্ষেত্রে তার চেয়ে প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট বেশি দেওয়া হয়েছে। আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল প্রতি ইউনিট ৮.৬১ সেন্টে, যা শর্তের মারপ্যাঁচে ২০২৫ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪.৮৭ সেন্টে। এর ফলে বছরে অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার আদানিকে দিতে হচ্ছে, যা চুক্তি বহাল থাকলে ২৫ বছর ধরে পরিশোধ করতে হবে। এ চুক্তি এত অসম যে এর লাভটা নিজের, ঝুঁকিটা সমাজের। এতে ২০ থেকে ২৫ বছরের মতো ভাড়া নিশ্চিত করা হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার দেবে, ডলারের দাম বাড়লে সরকার দেবে, বিদ্যুৎ ব্যবহার না হলেও সরকার ভাড়া দেবে। এ চুক্তিগুলো জাতীয় স্বার্থের চেয়ে একটি সীমিত গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। দুই থেকে চার বছর কষ্ট করলে অভিশাপ থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব। আর এভাবে চলতে থাকলে দেশের মানুষের জন্য তা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে এবং এ পরিস্থিতিতে পিডিবির টিকে থাকতে হলেও ৮৬ শতাংশ দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু এ পরিমাণ দাম বাড়ালে শিল্প বাঁচবে না, মানুষ বিদ্যুতের দাম দিতে গিয়ে হিমসিম খাবে।
কমিটির মতে, ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ-সক্ষমতা কোনো কাজে লাগছে না। প্রতি বছর অলস সক্ষমতার পেছনে কেন্দ্রভাড়া দিতে হচ্ছে ৯০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত। এর বাইরেও অস্বাভাবিক দামে বিদ্যুৎ কিনছে সরকার। ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্রে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম। গ্যাসচালিত কেন্দ্রে ৪৫ শতাংশ বেশি। সৌরবিদ্যুৎ খাতে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি। এগুলো বাজারের দাম নয়, চুক্তির ফল। গত সরকারের সময় জরুরি আইনের আড়ালের চুক্তিপ্রক্রিয়া রাষ্ট্র দখলের রূপ নেয় ও স্বার্থান্বেষীর পক্ষে ঝুঁকে পড়ে। ফলে এ অসম অর্থনৈতিক শোষণের হাত থেকে দেশের শিল্প ও সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত করা চুক্তিগুলো সংস্কার ও ক্ষেত্রবিশেষ বাতিল করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কৌশলগত একটি খাত। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় সরাসরি যুক্ত। এখানে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ থাকলে তার বিশাল বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন চুক্তিগুলো বাতিল ও সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।
কেকে/ আরআই