বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে পরিসংখ্যানের ভাষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। অবকাঠামো সম্প্রসারণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো সূচকগুলো উর্ধ্বমুখী। কিন্তু এই দৃশ্যমান উন্নয়নের ভেতরে একটি নীরব ক্ষয় চলমান, আর তা হলো টেন্ডার দুর্নীতি। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং উন্নয়ন ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা অর্থনীতির ভিতকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে। দিন কয়েক আগে রাজধানীর আজিমপুরের গণপূর্ত প্রকল্পে পিপিআর ২০২৫ সংশোধনের পরও এলটিএম ও ওটিএম টেন্ডারে অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, তা আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে গড়ে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় অপচয় হয়, যার বড় অংশই ঘটে টেন্ডার পর্যায়ের কারসাজি, প্রতিযোগিতা সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে। একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায় সিপিটিইউ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ মূল্যায়নেও, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ই-জিপি চালুর পর দরপত্র জমার স্বচ্ছতা কিছুটা বাড়লেও কারিগরি মূল্যায়ন ও কাজ-পরবর্তী তদারকিতে দুর্নীতি প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। অথচ, সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় সবটাই কোনো না কোনোভাবে টেন্ডার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। সড়ক, সেতু, রেল, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, সরকারি ভবন-সব ক্ষেত্রেই টেন্ডার হলো রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের প্রধান দরজা। নীতিগতভাবে এই ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার কথা; সর্বনিম্ন দর নয়, বরং সর্বোত্তম মান ও দক্ষতার সমন্বয়ে ঠিকাদার নির্বাচিত হওয়ার কথা। বাস্তবে বহু ক্ষেত্রেই এই নীতি কার্যকর থাকে না। দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন অনেক সময় একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায় মাত্র, যেখানে প্রকৃত সিদ্ধান্ত আগেই নির্ধারিত থাকে।
একই ধরনের প্রকল্পে বাংলাদেশে ব্যয় প্রায়ই অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়-এ নিয়ে দেশীয় গবেষক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ নতুন নয়। অতিরিক্ত ব্যয় মানেই রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়। এই অর্থ যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষার মতো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হতো, তাহলে তার বহুগুণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া দ্বিতীয়ত বড় ক্ষতি হয় কাজের মানের ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের মাধ্যমে কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি মান বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দেয় না। ফলে দেখা যায়, সদ্য নির্মিত সড়ক এক-দুটি বর্ষা পার না হতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেতুতে ফাটল দেখা দেয়, সরকারি ভবন ব্যবহারের আগেই সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে। এতে রাষ্ট্রকে একই প্রকল্পে বারবার অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা আরও কমিয়ে দেয়। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘লাইফ-সাইকেল কস্ট’-এর ভয়াবহ বৃদ্ধি।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা ১৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, যার অর্থ এই যে, একই অর্থে কম অবকাঠামো, কম সেবা এবং কম সামাজিক সুফল। এতসব টেন্ডার দুর্নীতির প্রভাব এখানেই থামে না। এর সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংকটের একটি ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ নেয়। কাজ সম্পন্ন না করেই অর্থ তুলে নেওয়া হয়, পরে সেই ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়। ফলে টেন্ডার দুর্নীতি পরোক্ষভাবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ আস্থাহীনতাকে তীব্র করে তোলে। এ ছাড়া টেন্ডার দুর্নীতি বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ ধ্বংস করে। প্রকৃত দক্ষ ও পেশাদার ঠিকাদাররা ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা থেকে সরে যায়, কারণ তারা জানে যে দাম বা দক্ষতা নয়, বরং রাজনৈতিক সংযোগই এখানে মূল যোগ্যতা। এর ফলে একটি সীমিত ঠিকাদার গোষ্ঠী বারবার কাজ পায়, যা কার্টেলাইজেশনের জন্ম দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্যকর বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করে। তবে এই আলোচনায় সরকারের সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করা যাবে না।
বাংলাদেশ একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে একসঙ্গে বহু বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের চাপ রয়েছে। এই বিশাল প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল, স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠান এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কাঠামো সবসময় পর্যাপ্ত থাকে না। রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে ঠিকাদারি অর্থনীতি অনেক সময় ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখাকে কঠিন করে তোলে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রভাবশালী মহলের চাপ অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহিকে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা টেন্ডার দুর্নীতিকে অনিবার্য বা স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার যুক্তি হতে পারে না। কারণ এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সরকারের নিজস্ব উন্নয়ন লক্ষ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। উন্নয়ন তখন কেবল সংখ্যার সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকে, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দুর্বল হয়। তো এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নয়, কাঠামোগত সংস্কারই মূল চাবিকাঠি।
প্রথমত, টেন্ডার ব্যবস্থায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। ই-জিপি ব্যবস্থা একটি ভালো সূচনা হলেও এটিকে কেবল অনলাইন দরপত্র জমার প্লাটফর্ম হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ঠিকাদারের পূর্ববর্তী কাজের মান, সময়মতো প্রকল্প শেষ করার রেকর্ড এবং আর্থিক শৃঙ্খলা-এসব বিষয়কে বাধ্যতামূলকভাবে মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ও পেশাদার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে তৃতীয় পক্ষের মান যাচাই বাধ্যতামূলক করা হলে কাজের মান নিয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে।
তৃতীয়ত, প্রকল্প ব্যয় ও অগ্রগতির তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ, কতদিনে কাজ শেষ হওয়ার কথা, বাস্তবে কতদূর অগ্রগতি ইত্যাদি তথ্য নাগরিকদের জন্য সহজ ভাষায় উন্মুক্ত থাকলে সামাজিক জবাবদিহি তৈরি হয়, যা দুর্নীতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
চতুর্থত, টেন্ডার ব্যবস্থা ও ব্যাংকিং খাতের মধ্যে সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়া, কাজের অগ্রগতি এবং ঋণ পরিশোধ-এই তিনটির মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সবশেষে, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে প্রতীকী না রেখে সময়বদ্ধ ও কার্যকর করতে হবে। শাস্তির ভয় বাস্তব না হলে কোনো সংস্কারই টেকসই হয় না। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু উন্নয়নবিরোধিতা নয়; বরং উন্নয়নের নামেই চলতে থাকা এই নীরব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। টেন্ডার ব্যবস্থার এই ভেতরের ফাটল বন্ধ না করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাহ্যিকভাবে যত উজ্জ্বলই হোক, ভেতরে ভেতরে তা দুর্বলই থেকে যাবে।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ আরআই