মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ক্ষতি আদতে বাংলাদেশের, আইসিসির কিছুই হবে না
উপল বড়ুয়া
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:২৭ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এমন ‘চরম’ পর্যায়ে পৌঁছাবে সেটি কি কেউ ভেবেছিল! না ভাবলেও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তো বটে, ক্রিকেটীয় সম্পর্কও এখন তলানিতে। সবকিছু এমন পর্যায়ে ঠেকেছে, নিরাপত্তা ইস্যুতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে পর্যন্ত যাচ্ছে না বাংলাদেশ।

এ নিয়ে কম জলঘোলা তো হলো না। ঘোলা জলে যাদের মাছ শিকার করার অভ্যাস তারা অবশ্য সেটা করে নিয়েছে। মাঝখানে ক্ষতি হলো ক্রিকেটের, ক্রিকেটীয় সংস্কৃতির। ইংরেজদের ‘ভদ্রলোকের খেলা’ বলে ক্রিকেট নিয়ে যে গর্ব তা উপমহাদেশে এসে হয়ে গেল রাজনীতির কলকাঠি নাড়ার ঘুঁটি।

ক্রিকেট এখন ২২ গজে সীমাবদ্ধ নেই আর। হয়ে উঠেছে রাজপথের ইস্যুও। তেমন আরেকটি অধ্যায়ের সাক্ষী হলো কোটি ক্রিকেট ভক্ত। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নেয়।

এরপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) আলটিমেটাম দিয়েও সেই সিদ্ধান্ত থেকে বাংলাদেশকে বিচ্যুত করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের একাধিক বৈঠক ও চিঠির পর চিঠি দেওয়ার পরও বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে না। তার পরিবর্তে আইসিসি র‌্যাঙ্কিয়ের ভিত্তিতে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ করে দিয়েছে স্কটল্যান্ডকে।

১৯৯৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ দিয়ে বিশ্বমঞ্চে পদার্পণ বাংলাদেশের। এরপর থেকে প্রতিটি আইসিসি টুর্নামেন্টেই খেলেছে, শুধু ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ছাড়া। এমনকি ছেলেদের হোক বা মেয়েদের, বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও চেনা মুখ বাংলাদেশ। কিন্তু আইসিসির ‘কথার বাইরে’ গিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে ভবিষ্যতে কতটুকু প্রভাব ধরে রাখতে পারে বিসিবি, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশের লড়াইটা ছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) বিরুদ্ধে। কিন্তু নিজেদের আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ‘কূটনৈতিক ব্যর্থতায়’ বোর্ডের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় আইসিসি। আর সেটিই কাল হলো বাংলাদেশের। অবশ্য আইসিসিকে যে বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করে, সেটি বললে অত্যুক্তি হবে না।

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলায় অনেক লাভক্ষতির হিসাব কষছেন অনেকে। দেশের ক্রিকেট যে আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়বে সেটি নিশ্চিত। আর জিতে গেছে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয়তাবাদ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলায় কী কী ক্ষতি হতে পারে সেসব একটু পয়েন্ট আকারে দেখা যাক-

বিসিবির আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে আইসিসি থেকে। বিশ্বকাপে না যাওয়া মানে সেই আয় থেকে বঞ্চিত হওয়া। অংশগ্রহণের কোটি কোটি টাকা তো যাবেই, উল্টো ২৪ কোটি টাকার বিশাল জরিমানার বোঝাও চাপতে পারে কাঁধে।

আইসিসির আইন ভাঙার অপরাধে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিয়ে শুরু হতে পারে টানাটানি। এমনকি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো চরম ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

মাঠের লড়াইয়ে না থাকলে র‌্যাঙ্কিয়েও পিছিয়ে যাবে বাংলাদেশ। যে কারণে ২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সুযোগ পেতে খেলতে হবে বাছাইপর্ব। এমনকি ওমান বা উগান্ডার মতো অখ্যাত দলগুলোর সঙ্গে বাছাইপর্ব খেলেই বাংলাদেশকে ফিরতে হতে পারে মূল মঞ্চে। এবার লিটন দাসরা সুযোগ পেয়েছিল গত বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে।

আগামী বছর ঘরের মাঠে এশিয়া কাপ হওয়ার কথা। কিন্তু ভারত যদি বাংলাদেশে আসতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে সেই টুর্নামেন্ট মুখ থুবড়ে পড়বে। শূন্য গ্যালারি আর হাহাকার ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এমনও শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশকে সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানও যদি বিশ্বকাপ বর্জন করে তবে এশিয়া কাপের ভবিষ্যৎ পড়ে যাবে শঙ্কার মুখে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের থেকে স্পন্সররা মুখ ফিরিয়ে নেবে। আইসিসি থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাওনা প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে যেতে পারে। একসময় বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্পন্সরশিপ পেতে উঠেপড়ে লাগা কোম্পানিগুলো মুখ ফিরিয়ে নিলে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে বিশ্বের পঞ্চম ধনী বোর্ডকে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কূটনীতিতে বাংলাদেশ হয়ে পড়বে একদম বন্ধুহীন। বড় দলগুলো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে অনীহা দেখাবে। এমনকি ভারত তো বটে, তিন মোড়লের অন্য দুই বন্ধু অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডও নিরাপত্তার অজুহাতে এদেশে সিরিজ বা টুর্নামেন্ট খেলতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।

আইসিসির বিরোধিতা করায় হয়তো আগামী এফটিফিতে (ভবিষ্যৎ সূচি) সিরিজ কমে যেতে পারে বাংলাদেশের। এমনকি সেই প্রভাব পড়তে পারে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলেও।

ভারতের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ছাপ শুধু ক্রিকেটে নয়, ছাপ পড়তে পারে ফুটবলের পাশাপাশি আরও অন্যান্য ডিসিপ্লিনেও। এমনকি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বিভিন্ন টুর্নামেন্ট বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে পারে।

আইপিএলের সঙ্গে চুক্তি থাকা ক্রিকেটাররা বিপিএল খেলতে অনীহা দেখাতে পারে। আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর অনেক মালিকের আরও বিভিন্ন লিগের দল আছে। তাদের খেলোয়াড়দের এদেশে আসতে মানা করে দিতে পারে। এমনিতে তারকাবিহীন বিপিএলের মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

ক্রিকেট তো বটে, খেলাধুলা মূলত দেশের সঙ্গে দেশের, জাতিতে জাতিতে সম্পর্ক উন্নয়নের বড় মাধ্যম। এই কারণেই তো অলিম্পিক, এই কারণেই সাফ। কিন্তু ক্রীড়াজগতে এখন নিশ্বাস ফেলছে বিষাক্ত রাজনীতি। সেই রাজনীতির বলি হচ্ছেন খেলোয়াড়েরা। 

বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললে তার ছাপ জনজীবনেও পড়বে। সেটি অর্থনীতির চেয়েও অধিকতর। শিশুরা কাদের দেখে মাঠে যাবে? বাংলাদেশের তরুণ প্রতিভারা কোথায় নিজেদের প্রমাণ করবে? মাঠে না যাওয়া শিশুরা শারীরিক তো বটে, মানসিকভাবেও পিছিয়ে থাকে।

আইসিসি যেভাবে বিশ্বব্যাপী ক্রিকেট সম্প্রসারণ নীতিতে এগোচ্ছে, সেখানে তারা বাংলাদেশের পরিবর্তে তুলে নিয়ে আসতে পারে নেপাল ও আফগানিস্তানকে। হয়তো বিনিয়োগটা সেখানেই বেশি করবে। আর আর্থিক সাহায্য কমে গেলে বা বোর্ডে সরকারি হস্তক্ষেপ পড়লে জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ার মতো হয়তো একদিন দুর্দাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে বাংলাদেশের ক্রিকেট। আইসিসির কিছুই হবে না। কিংবা বিসিসিআইয়ের। ক্ষতি শুধু বিসিবির।

তবে বিশ্ব ক্রিকেটকে বাংলাদেশ যে সাহস দেখাল, সেটিরও দরকার আছে। অন্তত যদি আইসিসিতে ভারতের অন্যায় প্রভাব কিছুটা কমে!

লেখক : কবি ও ক্রীড়া বিশ্লেষক

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাংলাদেশ   আইসিসি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close