বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঊর্মিমালা আর লোনাজলের আবহে ঘেরা এক মায়াবী ভূখণ্ড কুতুবদিয়া। একে কেবল চট্টগ্রামের এক সমুদ্রকন্যা বা পর্যটন নগরী বললে এর বিশালতাকে মাপা যায় না; এটি যেন অগাধ জলধির হৃদয়ে জেগে থাকা এক খণ্ড স্নিগ্ধ বাংলাদেশ। দ্বীপের চারপাশকে ঘিরে রাখা বঙ্গোপসাগরের অবাধ্য ঢেউ আর জোয়ার-ভাটার নিরন্তর খেলা এই জনপদকে দিয়েছে এক দুর্ভেদ্য গাম্ভীর্য। রাতের অন্ধকারে দ্বীপের পশ্চিম দিগন্ত যখন বিচিত্র বর্ণের আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, তখন দূর সাগরের বুক থেকে একে মনে হয় এক স্বপ্নিল বাতিঘর। আর দিনের আলোয় দেখা যায় অন্য এক কর্মমুখর জগত-বিশালাকার মাদার ভেসেলের রাজকীয় উপস্থিতি আর তার চারধারে ছোট ছোট সাম্পান ও ট্রলারের ব্যস্ত আনাগোনা। ট্রলারের ইঞ্জিনের সেই ছন্দময় শব্দ, মাছ ধরার জালের অবিরাম নিক্ষেপ, বরফ আর জ্বালানি সংগ্রহের তোড়জোড় এবং দিনশেষে রূপালি মাছকে শুঁটকিতে রূপান্তরের সেই চিরায়ত দৃশ্য এক অনন্য জীবনবোধের জন্ম দেয়। বিশেষ করে মাঝিমাল্লাদের সমবেত কণ্ঠে যখন ভেসে আসে ‘হেইয়া রে হেইয়া’ ধ্বনি-যার প্রতিটি ছন্দে মিশে থাকে আল্লাহ ও তার রাসূলের পবিত্র নাম-তখন সাগরের নোনা বাতাসও যেন তাসবিহ পাঠ করতে শুরু করে।
এই ভৌগোলিক মানচিত্রে দ্বীপের উত্তরে আনোয়ারা, পূর্বে বাঁশখালী ও পেকুয়া আর দক্ষিণে মহেশখালীর অবস্থান। ইতিহাসের পাতায় একদা এই সাগরপথ ধরে বণিকরা পাড়ি জমাত সুদূর রেঙ্গুনের পানে; আজ সেই বাণিজ্যপথের জৌলুস কালের গর্ভে বিলীন হলেও এই দ্বীপের এক অনন্য রূহানী জৌলুস বিশ্বজুড়ে ভাস্বর হয়ে আছে।
ঠিক যেমন গভীর সমুদ্রের প্রতিকূল স্রোতের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে অটল দাঁড়িয়ে আছে কুতুবদিয়া দ্বীপ, তেমনি এক আধ্যাত্মিক মহাসমুদ্রের বুকে ধ্রুবতারার মতো দাঁড়িয়ে আছেন হযরতুল আল্লামা শাহ্ আব্দুল মালেক মুহিউদ্দীন আজমী আল-কুতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি। দ্বীপের সেই লাল-নীল আলোকসজ্জার চেয়েও তার আধ্যাত্মিক পরশে আজ লক্ষ-কোটি মানুষের অন্তর আলোকিত হয়ে প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে। কুতুবদিয়ার সেই গভীর সমুদ্র যেমন অতল, তার ইলম ও মারিফতের সমুদ্রও ছিল তেমনি সীমাহীন। দ্বীপের সেই ট্রলারের মাঝিদের যেমন আল্লাহ ও রাসূলের নামই একমাত্র ভরসা, হুজুর কেবলার সান্নিধ্যে আসা লক্ষ্য মানুষের হৃদয়েও তিনি বুনে দিয়েছেন সেই একই জিকিরের বীজ।
তার জ্ঞানের শেকড় চয়িত হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত দ্বীনি মারকাজসমূহ থেকে। উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী দারুল উলুম দেওবন্দ, ঐতিহ্যের ধারক চট্টগ্রাম দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা এবং প্রখ্যাত ওলী-আল্লাহ সৈয়দ হাফেজ মুনিরুদ্দীন নুরুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহির রূহানী ফয়েজ ও ইলমের নির্যাসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য ‘কুতুব’। সাগরের মাঝিরা যেমন দিকভ্রান্ত হলে আকাশের নক্ষত্র দেখে পথ খুঁজে পায়, তেমনি পথহারা মানুষের জন্য তিনি ছিলেন এক জীবন্ত বাতিঘর। আজ কুতুবদিয়ার মাটির চেয়েও তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও আধ্যাত্মিক জ্যোতিতে এই জনপদ ধন্য হয়ে আছে। প্রকৃতি আর এই মহামনীষীর রূহানী সুষমা মিলে কুতুবদিয়া আজ কেবল একটি দ্বীপ নয়, বরং এক অবিনাশী আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু।
মানুষের জীবন পরিক্রমা এক চিরন্তন বিস্ময়। একটি ক্ষুদ্র শিশু যেমন শৈশবের হামাগুড়ি পেরিয়ে একদিন টগবগে যৌবনে পদার্পণ করে এবং সেই যৌবনের কর্মতৎপরতাই তার সার্থকতা বা ব্যর্থতার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়; তেমনি একজন জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী ‘আলিফ-বা-তা’র পাঠ থেকে শুরু করে দীর্ঘ সাধনার কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়েই প্রকৃত আলেমের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। তবে যাদেরকে মহান রব্বুল আলামিন ‘ইলমে লাদুন্নী’ বা ঐশী প্রজ্ঞার বিশেষ নূরে ধন্য করেন, তাদের পথচলা হয় স্বতন্ত্র ও জ্যোতির্ময়। ইলম ও দরস, মারকায আর মুখলিস শিক্ষকের সামান্য সান্নিধ্য পেলেই তাদের হৃদয়ের রুদ্ধ দুয়ারগুলো খোদাবদত্তভাবে উন্মোচিত হতে থাকে-আমাদের প্রিয় বাবাজান কেবলা ছিলেন তেমনই এক আলোকপ্রাপ্ত মহামনীষী।
সেই যুগে সুদূর চট্টগ্রাম থেকে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের সেই দুর্গম সফর আজকের মতো মসৃণ ছিল না। সমকালীন সময়ে অনেক অভিযাত্রী ইলম অন্বেষণের কণ্টকাকীর্ণ পথে পা বাড়িয়েও মাঝপথে বৈষয়িক উন্নতি বা উপার্জনের মোহে পড়ে জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন; ফলে নিজ ভূখণ্ডে ফিরে তারা আর ‘বাহরুল উলুম’ বা জ্ঞানের সমুদ্র হতে পারেননি। কিন্তু বাবাজান কেবলা ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি সমস্ত জাগতিক মোহকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ইলমে দ্বীনের সেই শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় নিয়ে বিজয়ী বেশে এই বাংলায় ফিরে এসেছিলেন। তার সেই অগাধ পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানের গভীরতাকে পরিমাপ করার সাধ্য বা ধৃষ্টতা আমার নেই, আমি কেবল পারি তার চরণে বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে।
স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি দীর্ঘকাল শিক্ষকতা ও ওয়ায-নসিহতের মাধ্যমে রূহানী বিপ্লবের সূচনা করেন। চট্টগ্রাম দারুল উলুমে অধ্যয়নকালেই তিনি আধ্যাত্মিকতার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করতে কামেল পীরের দস্ত মোবারকে বায়াত গ্রহণ করেন। তারই পবিত্র স্পর্শে ও দিক-নির্দেশনায় আজ লক্ষ লক্ষ পথহারা মানুষ নবুওয়াতের সেই হেদায়েতের নূর লাভ করে সিরাতুল মুস্তাকিমের নিরাপদ আশ্রয়ে ঠাঁই পেয়েছেন।
তার আধ্যাত্মিক মকবুলিয়াতের এক জীবন্ত কারামত হয়ে আজও টিকে আছে তার মেহমানখানা। যেখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকেট লাগে না, লাগে না কোনো বিত্ত-বৈভবের পরিচয়; সেখানে আছে কেবল অকৃত্রিম ভালোবাসা আর অবারিত মেহমানদারিতা। কোথা থেকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের রসদ আসে, তা হয়তো কেবল আরশের মালিকই ভালো জানেন; তবে এটিই যে তার দরবারের মহান কবুলিয়াতের এক জাজ্বল্যমান আলামত, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
তার আধ্যাত্মিক প্রভাব ও শান ছিল বিস্ময়কর এক রূহানী রাজত্ব। কত প্রতাপশালী বিত্তবান আর কত দাপুটে ক্ষমতাধর-যাদের চোখের ভ্রুকুটিতে একসময় প্রকম্পিত হতো এই বাংলা-তারাও এই মহাপুরুষের পবিত্র চৌকাঠে এসে মস্তক অবনত করতেন। তার একটি মাত্র প্রশান্ত দৃষ্টি কিংবা একটি নিভৃত বচনে ক্ষমতার দম্ভ ধূলিসাৎ হয়ে যেত, আর পাষাণ অহংকারী হৃদয়ে নেমে আসত বিনয়ের সুশীতল কোমলতা। আবার জ্ঞানের জগতে কত প্রাজ্ঞ পণ্ডিত ও আলেম, যারা নিজ পাণ্ডিত্যের বাহাদুরি নিয়ে আসতেন, দেখা যেত সূক্ষ্ম অহংকারের কারণে তাদের হিকমতের দুয়ারে এক দুর্ভেদ্য ‘হিজাব’ বা পর্দা পড়ে যেত; তারা হৃদয়ের শূন্যতা আর কপালে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফিরে যেতেন। অথচ সেই একই দরবারে সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ যখন সশ্রদ্ধচিত্তে সমবেত হতেন, তখন হুজুর কেবলার রূহানী পরশে তাদের ইলম ও মাকাম আরও বুলন্দ এবং জ্যোতির্ময় হতো।
তিনি ছিলেন রবের এমন এক প্রিয় ও মকবুল বান্দা, যার আরজি ও দোয়ার বরকতে অসংখ্য পথভ্রষ্ট ও পাপী খোদার দরবারে ক্ষমার শীতল ছায়া খুঁজে পেয়েছে। কত হতভাগ্যের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তার উসিলায় পরম সৌভাগ্যে রূপান্তরিত হয়েছে, আবার কত অবাধ্য দাম্ভিকের কপালে যে তিনি লাঞ্ছনার চিহ্ন এঁকে দিয়েছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এই সবটুকুই ছিল মূলত মহান মালিকের অপার করুণা ও দয়ার ফসল। কারণ তিনি বিলীন হয়েছিলেন মাবুদের প্রেমে, আর মহান মাবুদও তাঁকে বরণ করে নিয়েছিলেন নিজের ‘খলীল’ বা পরম বন্ধু হিসেবে।
আমার এই নশ্বর জীবনে আজ কেবল একটিই অপূর্ণ আক্ষেপ আর তামান্না রয়ে গেল-যদি একটি মুহূর্তের জন্য হলেও, নয়নের একটি পলকের তরে হলেও তাঁকে সশরীরে একটু দেখতে পারতাম! যদি তার সেই নূরানী চেহারার নূরে নিজের দুচোখ ধন্য করতে পারতাম, তবে এই জীবন সার্থকতা আর পরম সৌভাগ্যের পূর্ণতায় কানায় কানায় ভরে উঠত। জাগতিক সকল আড়ম্বর ও মোহমুক্ত এই বিশ্ববিখ্যাত সুফি স্কলার ও উচ্চমাকামের ওলী-আল্লাহর প্রতিটি কর্ম, দর্শন ও স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা ও বিনম্র শ্রদ্ধা।
কেকে/ আরআই